নৈকট্য লাভের আশায় আকুতি

Print

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান অবধি ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়াখ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুমদখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে তুরাগ নদীর তীরে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় । এতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশ্বের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫টি দেশের তাবলিগি দ্বীনদার মুসলমান জামাতসহ ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক মুসল্লি আন্তর্জাতিক ইসলামি মহাসম্মেলন বা বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে সেই বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে লিখেছেন- জিয়া উল ইসলাম

বিশ্ব ইজতেমার ইতিকথা

তাবলীগ’ অনুসারীদের একটি বৃহত্তম সমাবেশ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। তাবলীগ আরবি শব্দ, বালাগ শব্দ থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোকে তাবলীগ বলে। তাবলীগ আদর্শ যিনি পৌঁছেন, তাকে মুবাল্লিগ বলে। ইজতেমার ইতিহাস তালাশ করলে জানা যায়, বাংলাদেশে ইজতেমা অনুষ্ঠানের প্রায় ৩/৪ যুগ পূর্বে ভারতের সাহরানপুর এলাকায় এ মহতী কাজের গোড়াপত্তন ঘটে। বর্তমান ধারায় এ তাবলীগী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা ইলিয়াস (রহ)। ১৯২০ সালে তিনি প্রচলিত তাবলীগ আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এ কর্মপ্রয়াসকে তখন বলতেন ‘ইসালে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক পাঠ। প্রথমত তিনি টেস্ট কেস হিসেবে ভারতের সাহারানপুর ও মেওয়াত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি ৬টি বিশেষ গুণ অর্জনের মেহনত করেন জনসাধারণ্যে। সেই ছটি বিশেষগুণ হলো : কালেমা, নামাজ, এলেম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন (মুসলমানদের সেবা) সহীহ্ নিয়ত ও তাবলীগ। অন্য একটি গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, ইলয়াস (রহ) প্রথম বর্তমান ধারার এ তাবলীগকে নাম দেন ‘তাহরীকুস সালাত’ বা নামাজের আন্দোলন বলে। কথিত আছে, ইলিয়াস (রহ.) প্রথম যখন মানুষের কাছে ধর্মীয় প্রচার শুরু করেন, তখন তেমন কোনো সাড়া মিলেনি। তাই তিনি অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি আশপাশের দিনমজুর, শ্রমিক-কৃষকদের ডেকে এনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রেখে দু’ বেলা খাবার দিতেন এবং তাদেরকে নামাজ শিক্ষা দিতেন, নামাজের সুরা শিখাতেন, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ বর্ণনা করতেন। অবশেষে বিদায় বেলা তাদের প্রত্যেককে মজুরি তথা পারিশ্রমিক দিয়ে দিতেন। এ পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলো। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তার নামাজের আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হয়ে পড়লো। জনগণ নিজেরাই নিজ অর্থ ব্যয় করে ইলিয়াস (রহ)-এর পদাঙ্ক অনুকরণ করে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে থাকেন। যখন বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের প্রচেষ্টা শুরু হয়, তখন এর নাম ছিলো শুধুই ইজতেমা। যা অনুষ্ঠিত হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। ১৯৬৪ সালে কাকরাইলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের ইজতেমা শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকে ধীরে ধীরে এগুতে এগুতেই আজকের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। যে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে বিশ্বের প্রায় একশটি রাষ্ট্রের তাবলীগ প্রতিনিধিরা। শিল্পনগরী টঙ্গীতে ইজতেমাকে স্থানান্তরিত করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর সে বছর থেকেই তাবলীগ জামাতের এই মহাসম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ নামে খ্যাতি অর্জন করে। মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহত্ সম্মিলন হজে যেমন বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের মুসলমানদের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ঐক্যেও প্রেরণার অভাবনীয় নজির দেখা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমায়ও দেখা যায় মুসলিম ঐক্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। এর ফলে পুণ্যভূমি মক্কা-মদিনার পর তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা পরিচিতি লাভ করে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিলনকেন্দ্র হিসেবে।

বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী। বর্তমানে দু’ পর্বে ছয়দিন। কিন্তু টঙ্গীতে এর আমেজ থাকে প্রায় মাসখানেক। আর এ ইজতেমার প্রস্তুতি তো তিন/চার মাস আগ থেকেই শুরু হয়ে যায়। সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত তাবলীগ আন্দোলনকে বিশ্বের সবচে’ বড় ইসলামী আন্দোলন বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশের কোটি কোটি মুসলমান এ আন্দোলনের সময় বিনিয়োগ করে থাকেন। যতটুকু জানা যায়, ইজতেমা নিয়ন্ত্রণকারী তাবলীগ জামাতের কোনো সংবিধান নেই। অলিখিত সংবিধানও নেই। লিখিত আইন, বিধিবিধান ও উপবিধি কিছুই নেই। তারপরও এ আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল আন্দোলন। তাবলীগ জামাতের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। এটিকে বলা হয় মজলিসে শুরা।
এ কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ২১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও বহু ব্যক্তি এ কমিটির মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাবলীগে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি অবদান রেখেছেন, তারাই এ কমিটির আলোচনায় কথাবার্তা বলেন। তবে কে কতো বেশি অবদান রেখেছেন, তা’ নির্ধারণেরও মাপকাঠি নেই। তাবলীগ আন্দোলনে ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কোনো প্রতিযোগিতা নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। নেতৃত্বের কোন্দল নেই। যিনি একবার কেন্দ্রীয় শুরায় আমির নির্বাচিত হন, তিনি আমৃত্যু সে পদ অলঙ্কৃত করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কোনো আন্দোলন নেই, ষড়যন্ত্র নেই। তাবলীগ অনুসারীরা তাদের আমিরকে সম্বোধন করেন ‘হজরতজী’ বলে। ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত কাকরাইল মসজিদ বাংলাদেশ তাবলীগ জমাতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা হেড কোয়ার্টার। বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে টঙ্গীতে দু’ মাইল লম্বা যে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়, তার জন্যে কোনো চাঁদা অনুদান কারো কাছ থেকে চাওয়া হয় না। স্বেচ্ছাসেবীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ সম্মিলনের ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। তাবলীগে অংশগ্রহণকারী প্রকৌশলীগণ প্যান্ডেলের একটি নকশা তৈরি করে দেন। বিভিন্ন কল-কারখানা, মিল-ফ্যাক্টরি থেকে আসা লোকজন রড, সিআই সিট, সামিয়ানার চট ইত্যাদি নিয়ে আসেন। কে কী জিনিস নিয়ে আসে, তা’ যার হিসেব তারাই রাখেন। ইজতেমা শেষ হওয়ার পর তারা স্ব স্ব জিনিসপত্র খুলে নিয়ে যান। ভারতের সাহারানপুর অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় তাবলীগী আন্দোলনের যে বীজ অঙ্কুরিত হয়, তা’ পত্র-পল্লবে ছড়িয়ে আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করেছে। বিশ্বের এমন কোনো দেশ হয়তো পাওয়া যাবে না, যেখানে মানুষ আছে অথচ তাবলীগ আন্দোলনের কাজ নেই। ভারতবর্ষের মুসলমানদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে তাবলীগ জামাতের শুভ সূচনা হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পার্শ্বস্থ এক নীরব অঞ্চল মেওয়াত। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্ম-কর্মহীন নামমাত্র মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার মর্ম শিক্ষা দান এবং গোমরাহীর কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। মেওয়াতীদের মাঝে আরব জাহেলিয়াতের ছড়াছড়ি অনুভব করে মাওলানা ইলিয়াস (রহ) সংস্কারের উদ্যোগ নেন এবং তাদের নৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ হন। সেখানকার শিশু কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্যে সেখানে তিনি কয়েকটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা ইলিয়াস (রহ) অনুধাবন করেন যে, সমাজের বৃহত্তর অংশে ইসলামের সমাজের মৌলিক বিশ্বাস দৃঢ়করণ ও তার বাস্তব অনুশীলন না হলে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দ্বীন না আসলে কিছুই হতে পারে না। ১৩৪৫ হিজরীতে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে তিনি তাবলীগী ‘গাশ্ত’ শুরু করেন। জনসাধারণের মাঝে দাওয়াত দিতে লাগলেন কালেমা ও নামাজের। লোকজনকে তাবলীগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন। মেওয়াতে কয়েক বছর এ পদ্ধতিতেই কাজ অব্যাহত ছিলো। ১৩৫২ হিজরীতে তৃতীয় হজ পালেনের পর ইলয়াস (রহ) বুঝতে পারলেন যে, গরীব মেওয়াতী কৃষকের পক্ষে দ্বীন শেখার সময় বের করা কষ্টকর। তাই একমাত্র উপায় হিসেবে তাদের ছোট ছোট জামাত আকারে ইলমী ও দ্বীনি মারকাজগুলোতে গিয়ে সময় কাটানোর জন্যে উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে শুরু করলেন। সেই ধর্মীয় মজলিসে ওলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি তাদের প্রাত্যহিক জীবনের নিয়ম-নীতি বাতলে দেয়া হতো। মাওলানা ইলিয়াস (রহ)-এর জীবদ্দশাতেই বার্ষিক ইজতেমা অনুষ্ঠানের কাজ শুরু হয়। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও উপমহাদেশের বাইরে নানা দেশে তাবলীগের কাজ বিস্তৃত করার উদ্যোগ মাওলানা ইলিয়াস (রহ) নিজেই গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে উপমহাদেশের বড় বড় শহরে তাবলীগের জামাত সফর শুরু করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাবলীগ জামাতের কাজ সম্প্রসারিত হলেও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ আন্দোলন সবচে’ বেশি শক্তিশালী।

বাংলাদেশে তাবলীগ জামাত সৃষ্টি করেছে নিবেদিতপ্রাণ বিপুলসংখ্যক প্রচারক মুবাল্লিগ। যার ফলে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন- বিশ্ব ইজতেমা। যা’ আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারি প্রভাব সৃষ্টি করে চলছে। বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উত্সাহ-উদ্দীপনা ও আবেগ তৈরি করে। আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। বিশেষ করে তিনদিনব্যাপী (উভয় পর্বে) ইজতেমার শেষ দিনের মোনাজাতে অংশ নেয়ার জন্যে যেভাবে মানুষ পাগলের মতো ছুটে যায়, তা’ সত্যিই যে একটি প্রচন্ড ইসলামী আবেগ ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ তা’ অস্বীকার করার জো নেই। এতে কেউ শরীক হতে না পারলে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। বিশ্ব ইজতেমার শেষ দিন কার্যত টঙ্গীকেন্দ্রিক জাতীয় উত্সবে পরিণত হয়। এর প্রভাব এতোটুকু গড়ায় যে, দেশের প্রেসিডেন্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ কমপক্ষে একবার সেখানে বিশেষত মুনাজাতের দিন হাজিরা দিতে যান। বিশ্ব ইজতেমার ব্যাপারে মিডিয়াগুলোও নিস্পৃহ থাকতে পারে না। দেশের গণমাধ্যমগুলো যে পন্থীই হোক না কেন, তাদের পক্ষে ইজতেমাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ইজতেমার খবরাখবর বিশেষ করে আখেরী মুনাজাত অনুষ্ঠানটি দেশের প্রধান খবর হিসেবে সবাইকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করতে হয়।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, টঙ্গীর তুরাগ যেন মিশে আছে দেশের প্রধান খবর হিসেবে সবাইকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করতে হয়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, টঙ্গীর তুরাগ যেন মিশে আছে যমুনা, সিন্ধু, নীল, দজলা, ফোরাত, মিসিসিপি আর আমাজানের সাথে। টঙ্গীর ইসলামী জাগরণের স্রোতধারা একাত্ম করে নেয় বিশ্ব মুসলিমকে। লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে একাত্ম করে নেয় নিরন্তর দাওয়াতী প্রচেষ্টার তাবলীগী মাধ্যমে। মোটকথা, বিশ্ব ইজতেমা আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে প্রভাব সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের ধর্মীয় ইমেজের ক্ষেত্রে বিশ্ব ইজতেমা ও তাবলীগ আন্দোলন ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলছে। বিশ্বব্যাপী ইসলামী চর্চা ও জাগরণ সৃষ্টিতে বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমা অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে।

জেনে নেই তুরাগ নদী সম্পর্কে

বাংলাদেশের ঢাকা ও গাজীপুর জেলার একটি নদীর নাম তুরাগ । নদীটির দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৮২ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো কর্তৃক তুরাগ নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ২৫। এটি ঢাকা শহরের সীমানা দিয়ে বয়ে যাওয়া ৪টি নদীর মধ্যে ১টি। এই নদীর গভীরতা ১৩.৫ মিটার। নদী অববাহিকার আয়তন ১ হাজার ২১ বর্গ কিমি। সারা বছরই এর প্রবাহ থাকে। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পানিপ্রবাহ কম থাকে। তখন মিরপুরে পরিমাপ ১২৪ ঘনমিটার/সেকেন্ড এবং গভীরতা হয় ৪.৫ মিটার। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে আগষ্টে এই প্রবাহ বেড়ে ১১৩৬ ঘনমিটার/সেকেন্ডে দাঁড়ায়। তুরাগ নদের নিম্নাংশে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে
তুরাগ নামের নদীটি গাজীপুর জেলাধীন কালিয়াকৈর উপজেলার প্রবহমান বংশী নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করে ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার বিরুলিয়া ইউনিয়নে এসে দুটি ধারায় বিভাজিত হয়েছে। এর একটি শাখা সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়নে বংশী নদীতে এবং মূল শাখাটি আমিনবাজার ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে পতিত হয়েছে। তুরাগ বংশী নদীর শাখা। সে হিসেবে এটি কালিয়াকৈর, জয়দেবপুর, মির্জাপুর, গাজীপুর, সাভার, মিরপুর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় বুড়িগঙ্গায় মিলিত হয়েছে। তুরাগ নদ সর্পিলভাবে প্রবেশ করে প্রথমে কিছুটা পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে তারপর বুড়িগঙ্গায় পড়েছে। টঙ্গীখাল তুরাগ নদে মিলিত হয়েছে মিরপুরের উত্তরে। তুরাগের ছোট একটি শাখা কালিয়াকৈরের কাছ থেকে উৎপন্ন হয়ে কড্ডা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণে টঙ্গী খালে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে এই শাখাকেও তুরাগ নদ বলে। সারা বছরই নদটি নৌকা চলাচলের উপযোগী। গ্রীষ্মে ক্ষীণকায় হয়ে পড়লেও তুরাগ একটি সক্রিয় নদ। যমুনা নদীর অবক্ষেপ প্রায় সুদূর টঙ্গী খাল পর্যন্ত তুরাগের উপত্যকা জুড়ে রয়েছে। ১৯৫০ সালের আসাম ভূমিকম্পের পর এমন ঘটেছে। এই নদীতীরে মির্জাপুর, কাশিমপুর, ধীতপুর, বিরুলিয়া, উয়ালিয়া, বনগাঁ প্রভৃতি স্থান অবস্থিত।
ঢাকার নদীমাতৃক বৈশিষ্ট্য দেখে বলা যায়, তুরাগে প্রচুর মাছ ছিল কিন্তু বর্তমানে তীর্ব পানি দূষণে ভুগছে। যখন নদীকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে, অধিকাংশ কারখানা পরিবেশ আইনের খুব সামান্য অংশই মেনে চলতে চেষ্টা করেছে এবং পানির দৃশ্যমান রং পাল্টে গিয়ে নোংরা হয়েছে। প্রতিবছর এই তুরাগ নদীর তীরে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা পালিত হয়।

মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি

ভা রতের একজন ইসলামি পন্ডিত মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের যুক্তপ্রদেশের একটি ছোট শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলামি নীতি ও আদর্শের ঘাটতিজনিত কারণে তিনি ১৯২০ এর দশকে তাবলিগ জামাত নামক সংস্কারবাদি আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলন ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ প্রচার করে এবং মুসলিমদের নামাজ, রোজাসহ অন্যান্য ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দেয়ার কাজ করে। এর সদস্যদের কাজ স্বেচ্ছাসেবামূলক। সেই সাথে অন্যান্যদের এতে যোগ দিতে উৎসাহ দেয়া হয়। বিশৃংখলা দূরে রাখতে তাবলিগ জামাতে রাজনীতি ও ফিকহ নিয়ে আলোচনা করা হয় না। তার মৃত্যুর পর মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভি তাবলিগ জামাতের আমির নিযুক্ত হন।

কাকরাইল মসজিদ

কাকরাইল মসজিদ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কাকরাইল এলাকায় রমনা পার্কের পাশে অবস্থিত একটি মসজিদ। এটি বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মারকায বা প্রধান কেন্দ্র। ১৯৫২ সালে এই মসজিদটি তাবলীগ জামাতের মারকায হিসেবে নির্ধারিত হয়। মসজিদটির আদি নাম ছিল মালওয়ালি মসজিদ। পরবর্তীতে ১৯৬০এর দশকে তাবলীগ জামাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইঞ্জিনিয়ার মরহুম হাজী আব্দুল মুকিতের তত্ত্বাবধানে তিন তলা মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 96 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ