পবিত্র মেরাজের প্রাপ্তি ও শিক্ষা

Print

মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এটি মহানবী (সা.)-এর বিশেষ  মুজেজা ও বৈশিষ্ট্য। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া অন্য কোনো নবী এই সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি।

মেরাজ শব্দটি আরবি। এর অর্থ সিঁড়ি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে যে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সপ্ত আসমানের ওপরে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই সিঁড়িকে মেরাজ বলা হয়। সাধারণত হিজরতের আগে একটি বিশেষ রাতের শেষ প্রহরে বায়তুল্লাহ শরিফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর ‘বোরাকে’ ভ্রমণ, অতঃপর সেখান থেকে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে সপ্ত আসমান এবং সেখান থেকে আরশে আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন ও আবার বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে বোরাকে আরোহণ করে প্রভাতের আগেই মক্কায় নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের ঘটনাকে মেরাজ বলা হয়।

মেরাজের পাশাপাশি আরেকটি শব্দ ব্যবহৃত হয়। সেটি হলো ইসরা। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। ইসরা হলো পৃথিবীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ। আর পৃথিবী থেকে ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণকে মেরাজ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে ‘ইসরা’ বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আর সুরা নাজমের ১৩ থেকে ১৯ আয়াত পর্যন্ত মেরাজের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া ২৬-এর বেশি সাহাবি থেকে বুখারি, মুসলিমসহ প্রায় সব হাদিস গ্রন্থে মেরাজের ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং মেরাজ অকাট্যভাবে প্রমাণিত একটি সত্য ঘটনা।

মেরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে  মেরাজ গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করে বলেন, সত্য কথা হলো, নবী (সা.) ইসরা সফর জাগ্রত অবস্থায় করেন, স্বপ্নে নয়। তিনি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এ সফর বোরাকযোগে করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে তিনি বোরাকটি অদূরে বেঁধে নেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করে কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর বিশেষ সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আসমান, তারপর অন্যান্য আকাশে যান। ওই সিঁড়িটির স্বরূপ সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.) ও সপ্তম আকাশে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। এরপর তিনি নবীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো অতিক্রম করেন। তারপর এক বিশাল ময়দানে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন যে সেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন। সেখানে আল্লাহর নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি ও নানা রঙের প্রজাপতি ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। সেখানেই তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের পালকির মতো ‘রফরফ’ ও বায়তুল মামুরও দেখেন। বায়তুল মামুরের কাছেই কাবার প্রতিষ্ঠাতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। যাঁরা একবার এখানে এসেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ নেই। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জান্নাত ও  দোজখ দেখেন। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্তের নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ হয়। এরপর তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সব ইবাদতের মধ্যে নামাজের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আকাশে যেসব নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তাঁরাও তাঁর সঙ্গে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবতরণ করেন। তাঁরা এখান থেকেই বিদায় নেন এবং রাসুল (সা.) বোরাকে সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কায় পৌঁছে যান। রাসুল (সা.)-এর এই ভ্রমণে আল্লাহর নির্দেশে সঙ্গী ছিলেন হজরত জিবরাঈল (আ.)।

মেরাজের তারিখ

ইমাম কুরতুবি (রহ.) তাঁর তাফসির গ্রন্থে লিখেছেন, মেরাজের তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। মুসা ইবনে ওকবার বর্ণনা মতে, এই ঘটনা হিজরতের ছয় মাস আগে সংঘটিত হয়। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত খাদিজার ওফাত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে হয়েছিল। ইমাম জুহুরি (রহ.) বলেন, হজরত খাদিজার ওফাত নবুয়তপ্রাপ্তির সাত বছর পরে হয়েছিল। মুহাদ্দেসগণ বিভিন্ন রেওয়ায়েত বা বর্ণনা উল্লেখ করার পর কোনো সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেননি। (মা’আরেফুল কোরআন)

এ থেকে বোঝা যায়, ২৭ তারিখকে শবেমেরাজ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে হ্যাঁ, রাতটি অবশ্যই ফজিলতপূর্ণ। এই রাতে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে বিশেষ নৈকট্য দান করেন। মুসলমানদের নামাজ উপহার দেন। তাই নিঃসন্দেহে ওই রাতই ছিল ফজিলতপূর্ণ। এই রাতের ফজিলত নিয়ে কোনো মুসলমানের সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু নির্ভরযোগ্য মতানুসারে মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল নবুয়তের পঞ্চম বছর। এ ঘটনার পর নবী করিম (সা.) আরো ১৮ বছর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু শবেমেরাজের ব্যাপারে এ দীর্ঘ সময়ে কোথাও কোনো বিশেষ হুকুম তিনি দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রাত জেগে থাকেননি। সাহাবিদেরও জাগতে বলেননি। রাসুল (সা.) পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর ১০০ বছর সাহাবায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন। শতাব্দীজুড়ে এমন একটি ঘটনাও পাওয়া যায়নি, যেখানে সাহাবায়ে কেরাম ২৭ রজবকে বিশেষভাবে উদ্যাপন করেছেন। সুতরাং যে কাজ রাসুল (সা.) করেননি, সে কাজ সাহাবায়ে কেরামও পরিহার করেছেন। তাই ২৭ রজবে প্রচলিত ইবাদত-বন্দেগিগুলোকে দ্বীনের অংশ মনে করা, সুন্নত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হাদিস ও সুন্নাহসম্মত নয়।

মেরাজের তাত্পর্য

ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। যখন সব দিক থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) মারাত্মক সংকট ও শোকের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেই দুঃসময়ে আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় হাবিবকে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ দিয়েছিলেন। পার্থিব জীবনের অভিভাবক চাচা আবু তালেবের মৃত্যু, প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল, তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনা, মক্কার কাফিরদের অমানবিক আচরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মেরাজের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়, কালো রাতের পরই আছে উজ্জ্বল প্রভাত। ইসলামের বিজয় সমাগত। এরই সঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে পূর্ণতা লাভের সবকও দান করেছিলেন। আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে আলমে বরজখ, জান্নাত, জাহান্নাম, লওহ-কলম, আরশ-কুরসি প্রত্যক্ষ করান।

মেরাজের প্রাপ্তি

মেরাজে মহান আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজ সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে উম্মতে মুহাম্মদিকে পুরস্কারস্বরূপ কয়েকটি বস্তু প্রদান করেন—এক. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফজিলতের দিক দিয়ে ৫০ ওয়াক্ত নামাজের সমান। দুই. সুরা বাকারার শেষের দুটি আয়াত মেরাজেই অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতগুলোতে উম্মতে মুহাম্মদির প্রতি আল্লাহর অশেষ রহমত ও অনুগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তিন. উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে যারা কখনো শিরক করেনি, তাদের ক্ষমা করার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে মেরাজে। চার. নামাজে যে ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পড়া হয়, সেটিও মেরাজের উপহার।

পবিত্র মেরাজের শিক্ষা

মহানবী (সা.) মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর সুরা বনি ইসরাইলের মাধ্যমে ১৪টি দফা মানুষের সামনে পেশ করেন। বর্তমান সময়ে ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ সংস্কারে এই ১৪ দফা বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

১.   আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা যাবে না।

২.   মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “…মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। তাঁদের একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় যদি তোমাদের সামনে উপনীত হয়, তাহলে তাঁদের সঙ্গে উহ্ শব্দটি পর্যন্ত কোরো না। তাঁদের ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না; বরং তাঁদের সঙ্গে মর্যাদাসূচক কথা বলো। তাদের সামনে বিনয়ী থেকো আর দোয়া করতে থাকো—‘হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি তেমনি দয়া করো, যেমনি তাঁরা শৈশবে আমাদের লালন-পালন করেছেন’।’’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৩-২৪)

৩.   নিজ কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে।

৪.   আত্মীয়স্বজনকে তাদের অধিকার দিয়ে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে তাদের অধিকার দাও। আর মুসাফিরদের হক আদায় করো। (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৬)

৫.   অপব্যয় করা যাবে না।

৬.   মানুষের অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হলে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রকাশ করতে হবে। ছলচাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।

৭.   ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেহিসাবি হওয়া যাবে না। আবার কৃপণতাও প্রদর্শন কোরো না।

৮.   সন্তানদের হত্যা করা যাবে না। এটি মহাপাপ।

৯. জেনা-ব্যভিচারের কাছেও যাওয়া যাবে না। কেননা এটি নিকৃষ্ট ও গর্হিত কাজ।

১০. কোনো প্রাণী অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার উত্তরাধিকারীকে এই অধিকার দেওয়া হয়েছে যে সে চাইলে রক্তের বিনিময় চাইতে পারে। তবে প্রতিশোধের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা যাবে না।

১১. এতিমের সম্পদের ধারেকাছেও যাবে না।

১২. ওজনে কম দিয়ে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। দাঁড়িপাল্লা সোজা করে ধরতে হবে।

১৩. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে মতামত দেওয়া অন্যায়। চোখ, কান, অন্তর সব কিছুই কিন্তু একদিন জিজ্ঞাসিত হবে।

১৪. জমিনে দম্ভসহকারে চলা যাবে না। এগুলো সবই মন্দ ও ঘৃণিত কাজ। এই ১৪ দফাই মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা।

লেখক : পরিচালক, দারুল আরকাম ইনস্টিটিউট, টঙ্গী, গাজীপুর

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 80 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ