পরিবহণ সংকটে বিপথে জবি শিক্ষার্থীরা

Print

আবাসন সুবিধা বঞ্চিত পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবহন সংকটও ক্রমে তীব্র আকার ধারণ করছে। প্রায় সাড়ে ৬০০ শিক্ষক, দেড় হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী এবং ২০ হাজার শিক্ষার্থীর এ বিদ্যাপীঠটিতে নিজস্ব পরিবহণ সংখ্যা মাত্র ২৪টি। ফলে গাদাগাদি করে চলাচলের সময় শিক্ষার্থীদের তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যা প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভও ঝরে কখনও কখনও। ফলে হরহামেশাই জেনেশুনে অনিয়মে পা রাখেন শিক্ষার্থীরা। তারাও আর দশজন অসচেতন গোয়াড়ের মতো যাত্রী পরিবহনগুলোতে ধস্তাধস্তি করতে বাধ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ সংকটই শিক্ষার্থীদের বিপথে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে বলে দাবি ক্যাম্পাসের ছাত্র-শিক্ষকসহ সুশীল সমাজের।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন পুল সূত্রে জানা যায়, জবিতে নিজস্ব বাস ১২টি, মিনিবাস ৩টি, মাইক্রোবাস ৬টি, জিপগাড়ি ২টি এবং ১টি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মোট গাড়ির সংখ্যা ২৪টি। এছাড়া বিআরটিসি ডাবল ডেকারের ১২টি বাস ভাড়া নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব আরও ৩টি বাস যুক্ত করে মোট ১৫টি বাস শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন রুটে চলাচলের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অথচ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন চলাফেরায় যা যথেষ্টই অপ্রতুল। যেখানে কিনা এই ১৫টি বাসে বড়জোর তিন হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন যাওয়া আসার সুযোগ পায়। বাকি ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীকেই এই পরিবহন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব গাড়িগুলোর মধ্যে উপহারে পাওয়া গাড়ির সংখ্যাই বেশি। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টা অনুষদের ৩৮ বিভাগে ২০ হাজার শিক্ষার্থী পড়ছেন। প্রতি শিক্ষাবর্ষে একজন শিক্ষার্থীকে পরিবহন ভাড়া বাবদ ৬০০ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। সে হিসাবে ২০ হাজার শিক্ষার্থী থেকে পরিবহন সেবা বাবদ বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা আয় করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পরিবহন সংকটের এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা অনেক সময় হয়েছেন বিপদের সম্মুখীন। প্রয়োজনের তুলনায় বাস সংখ্যা খুবই অপ্রতুল হওয়ায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দরজায় ঝুলে যাতায়াত করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। ফলে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় তাদের।
গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে গাড়ি থেকে পরে নিহত হন জবির এক শিক্ষার্থী। চলতি বছর মার্চে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস গুলিস্তান গোলাপশাহ মাজারের কাছে গিয়ে জ্যামে পড়লে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের জঙ্গিবাহী একটি প্রিজন ভ্যানে অবস্থানকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বাসে সিটে বসা নিয়েও ঝামেলা যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে ‘উত্তরণ’ বাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পথে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবহন পুল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডি গত সোমবার (১৫ মে) ওই বাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের আসন বিন্যাস করে দেন।
এদিকে তীব্র পরিবহন সংকট থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি বাস দীর্ঘদিন বিকল হয়ে পড়ে আছে। এগুলো মেরামতে নেই কোনও উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রুটে চলাচল করার সময় শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ইভটিজিং এ লিপ্ত হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ভোগান্তি থেকে বাঁচতে ভুল রাস্তায় চলাচলা করেন বলেও অভিযোগ অনেকের।
বিশ্ববিদ্যালয় বাসে চলাকারী যাত্রীদের দাবি, যদি গাদাগাদি করে চলাচল করতে না হতো, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরা কোনও রকম অভিযোগে অভিযুক্ত হতো না। কারণ ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যেখানে ১৫টি বাস সামন্য, সেখানে একেকটি বাসে কী পরিমাণ চাপ হওয়ার কথা সেটি সহজেই অনুমেয়। আবার পুরান ঢাকার সদর ঘাট থেকে জ্যাম কাটিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসে যাওয়া-আসার কষ্ট কতটুকু তা বুঝা এতো সহজ না। যদি সব শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মত ৫০ সিটের গাড়িতে ৪০ জন যেত তাহলে আর কেউ কোনও অভিযোগ করার সুযোগ পেত না। যখন একজন মানুষ বাসের দরজায় ঝুলে ঝুলে চলাচল করে তখন সে কতটুকু মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে তাও আমলে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জবি আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রকল্যাণ পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দীন এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনেক কষ্ট করেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চেয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নামে রাজধানীবাসীদের অভিযোগ অনেক বেশি। পরিবহন সংকটই এর জন্য একমাত্র দায়ী।’
শিক্ষার্থীদের প্রতি এতো অভিযোগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে এখানে শুধু শিক্ষার্থীরাই দায়ী তাই নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য যে পরিবেশ দরকার, সে পরিবেশ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে পারছি না। শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিবহনে যে অকর্মের অভিযোগ সেগুলো তখনই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব- যখন শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবো।’
পরিবহন সংকট নিয়ে জানতে চাইলে জবি পরিবহন পুলের পরিচালক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের পরিবহনে তেমন কোনও সংকট নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের বাসে তুলে দেওয়ার সময় দেখেছি খুব বেশি শিক্ষার্থী বাসে উঠেন না। তেমন একটা চাপ আছে বলেও আমার মনে হয়নি।’
তবে শিক্ষার্থীদের চলাচলের সময় অপকর্মের বিষয়ে দায় নিতে রাজী হননি তিনি। বলেন, ‘শৃঙ্খলার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখবে। এ জন্য প্রক্টরিয়াল বডি আছে।’
জবিতে পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘বিআরটিসির নতুন ৫০০টি গাড়ি আমদানি হবে। এর থেকে আমরা ১৫টি গাড়ি চেয়ে আবেদন জানিয়েছি। যদি ১০টিও পাই তাহলেও চলমান পরিবহণ সমস্যা আরও সহজে সমাধান হয়ে যাবে।’
তবে কয়েকদিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন একটি বাস আসছে বলেও জানান তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 98 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ