পাক-রাশিয়া সম্পর্কে পাল্টে যাচ্ছে

Print

পাকিস্তানের সঙ্গে প্রথম যেসব দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র ছিলো তার অন্যতম। আর, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিতি ছিলো পাকিস্তানের। কিন্তু সেই উষ্ণ সম্পর্কের দিনগুলো সম্ভবত গত হতে চলেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের মাটিতে ওসামা বিল লাদেনকে মার্কিন সেনারা হত্যার পর থেকে সম্পর্কে গুরুতর অবনতি শুরু হয়। এ অবস্থায় পাকিস্তান রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে তুলতে পারে বলে অনেকের ধারণা ছিলো।
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের তালিবানদের সঙ্গে মস্কোর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশটি পাকিস্তানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। ভারতের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্কে ফাটল চোখে পড়ার মতো। তাই দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটলে তা মস্কো ও ইসলামাবাদের মধ্যে পারস্পরের জন্য লাভজনক সম্পর্ক তৈরির পথ প্রশস্ত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ইউরেশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি রাশিয়া এই অঞ্চলে নিজের প্রভাববলয় বিস্তার করতে চায়। আইএস’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া পকিস্তানকে তার অবিচ্ছেদ্য মিত্র বলে মনে করে। পাশাপাশি মস্কো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)’র সুবিধা নিয়ে আরব সাগরে পৌছাতে চায়। আর তাই বিগত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছে মস্কো।
ইসলামাবাদ ও মস্কোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন সাউথ এশিয়ান ভয়েস এক নিবন্ধ প্রকাশ করে। অতীতে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক জোরদারের পথে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের দেশগুলোর পররাষ্ট্র নীতিতে পরির্তন আসায় আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও বেশ পরিবর্তন ঘটেছে।
নিবন্ধটিতে বলা হয়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বার্থগত মিল এবং আফগানিস্তানে আইএস’র প্রভাব বিস্তার ইসলামাবাদ ও মস্কোকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। গত বছর এই তিন দেশ মস্কোতে আফগানিস্তানের ব্যাপারে এক ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হয়। ওই আলোচনায় ভারতকে রাখা হয়নি। এতে মস্কোর কাছে আপত্তি জানায় দিল্লি। পাকিস্তান এই অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটাচ্ছে বলে মস্কোকে বুঝাতে গিয়েও দিল্লি ব্যর্থ হয়েছে।
মস্কো মনে করে আফগানিস্তানে আইএস’কে মোকাবেলায় তালিবান একটি কার্যকর শক্তি। পাশপাশি দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপড়েন পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। মস্কো প্রথমবারের মতো ইসলামাবাদের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। উরি ঘটনার পর পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিরোধ চলার সময় অনুষ্টিত এই মহড়া স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে পাকিস্তানের কাছে চারটি এমআই-৩৫এম হেলিকপ্টার বিক্রি করেছে। এসব ঘটনা ভারতের সঙ্গে যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিলো তা থেকে রাশিয়া ক্রমেই সরে আসছে বলে ইংগিত দেয়। একই সঙ্গে মস্কো পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে চলেছে বলে এসএভি’র নিবন্ধ উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে সিপিইসি। চীনের অর্থায়নের প্রকল্পটি এ অঞ্চলের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সমন্বয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই করিডোর আরব সাগরের উষ্ণ পানিতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। রাশিয়া এই সুবিধা নিতে পারে এবং সিপিইসি’কে ইউরেশিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে একীভূত করার সম্ভাবনা নিয়ে মস্কো ও ইসলামাবাদ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। উষ্ণ পানিতে প্রবেশ সুবিধা ছাড়াও পাকিস্তানের অস্ত্রবাজারে প্রবেশ করতে পারবে রাশিয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে দেশটি নতুন বাজার খুঁজছে।
আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পাকিস্তানকে রাশিয়ার প্রয়োজন। তাছাড়া নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেও পাকিস্তান আফগানিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 138 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ