পাঠ্যপুস্তকে ভুল শিশুদের আমরা কী শেখাচ্ছি!

Print

ইংরেজি বছরের প্রথম দিন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে সারা দেশে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া হয়। এটা এখন আমাদের দেশে নববর্ষ উদযাপনের এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ শুঁকে অশেষ আনন্দে মন ভাসিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত হয় নতুন ক্লাসে। বই বিতরণের এই উৎসবটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বছরজুড়ে কাজ করে যান পুস্তক লেখক, সম্পাদক এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধিকর্তারা। কাজটির গুরুত্ব অপরিসীম এ জন্য যে এসব পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে আহরিত তথ্যসম্ভারই শিশু শিক্ষার্থীর মনোজাগতিক গঠনের ভিত রচনা করবে।

কিন্তু যে দায়িত্ব নিয়ে এনসিটিবির কাজ করার কথা, তারা কি তা করতে পারছে? স্থিতিশীলতায় মন না দিয়ে প্রতিবছরই পাঠ্যপুস্তকের বিষয় বা পাঠে নতুন কিছু উপস্থাপন করবার এক ধরনের প্রবণতা দাঁড়িয়ে গেছে, যা শিক্ষার উপকরণ না হয়ে ইদানীং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রীতিমতো তামাশা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

এমনটা কী করে ভাবা যায়, আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের ঢাকঢোল পিটিয়ে যে পাঠ্যপুস্তকগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়, সেই বইয়ের মুদ্রণ এবং কাগজ তো নিম্নমানের থাকেই, উপরন্তু তা থাকে তথ্যসংক্রান্ত ও ভাষাগত ভুলে ভরা? এমনকি শুদ্ধ ইতিহাস চর্চাটাও অবহেলিত থাকছে। আর এবারের পাঠ্যবইয়ে শিশুমনে চিন্তার বৈকল্য উসকে দিতে জেন্ডার বৈষম্যও প্রকাশ করা হয়েছে। পাঠ্যবই কি হতে পারে এমন ভুল, অসংগতি আর বিকৃতিতে ভরা?

প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ বর্ণ পরিচিতি অংশের ‘পাঠ ১২’-এ ‘ও’ বর্ণ চেনানোর উপকরণ হিসেবে ‘ওড়না’ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘শুনি ও বলি’ পাঠ অংশে ‘ও’ বর্ণ চেনানোর জন্য ওড়না পরা কন্যাশিশুর ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে ‘ওড়না চাই’। শিক্ষাবিদরা বলছেন, একেবারে ছোট বয়স থেকে নারী-পুরুষের পার্থক্য তৈরি করে পাঠ্যপুস্তকে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়।

অন্যদিকে এবারের তৃতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ কুসুমকুমারী দাশের লেখা ‘আদর্শ ছেলে’ পদ্যটি মারাত্মকভাবে বিকৃত করা হয়েছে। মূলে আছে ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’ অথচ বইয়ে ছাপা হয়েছে ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে?’ মূলে আছে ‘মানুষ হইতে হবে—এই তার পণ’। ছাপানো হয়েছে ‘মানুষ হতেই হবে’। মূলে আছে ‘হাতে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান’। ‘খাট’ শব্দটিকে বিকৃত করে লেখা হয়েছে ‘খাটো’। এতে আমরা নিজেরা যে নিজেদেরই খাটো করে ফেললাম, সেটি কি কারো ভাবনায় আসবে?

যাঁরা অল্পবিস্তরও বিদ্যার পথে হেঁটেছেন, তাঁরা সবাই জেনে থাকবেন, কবিতা বা উদ্ধৃতি কখনো মূলটা বর্জন করে নিজেদের সুবিধা বা স্বাধীনমতো লেখা যায় না? কখনো কখনো জায়গা সংকুলানের জন্য গল্প হয়তো সংক্ষেপিত করা হয়; যদিও একজন গল্প লেখক এটাও মানবেন না। অথচ আমরা কি না যুগ যুগ ধরে শিখে আসা, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’র জায়গায় ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে’ লিখে ফেললাম। এখন শিশুর মা এত দিন যা শিখে এসেছিলেন, তা ভুল করে শিখবে শিশুটি। কিন্তু মা যদি ভুল ধরিয়ে দিতে যান; শিশুটি বইয়ের লেখা মনে করিয়ে দিয়ে মা অথবা শিক্ষককে কি অবিশ্বাস করা শিখবে না? এমন বাজে নিরীক্ষায় শিশুদের ফেলা কি সমীচীন হলো?

প্রাথমিকের তৃতীয় শ্রেণিতে যারা ইংরেজি ভার্সনে পড়বে, তাদের আঘাতের ইংরেজি শেখানো হবে Heart!  কারণ, তাদের ইংরেজি বইয়ের পেছনে মর্মবাণী হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘Do not heart anybody!’ পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনার নামে এভাবে সবাইকে Hurt করবেন বলে যাঁরা স্থির করেছেন; তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ভর্ৎসনা করে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার সংশ্লেষ থেকে দূর করে দেওয়া হোক—এ দাবি উত্থাপন করা কি অন্যায় হবে?

এখন এ বছরজুড়ে যে শিশুরটির মানসিকতায় নারী ও পুরুষের বিভাজিত ভাবনার বীজটি উপ্ত হবে, ভুল পদ্যের ছন্দবিভ্রাট মনে গেঁথে যাবে আর আঘাতের জায়গায় হৃদয় বসিয়ে দিয়ে জীবনের মূল মর্মবাণীটাই পাল্টে ফেলবে; তার দায়টা তবে কে নেবে?

দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে চারটি গুণ আয়ত্ত করা। যে চারটি বৈশিষ্ট্য সম্মিলিতভাবে আদর্শ চরিত্রের ভিত্তি রচনা করতে পারে সেগুলো হলো : উদ্যম, সাহস, সংবেদনশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তা। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়েছেন, শিশুরা প্রকৃতির কোলে মানুষ হবে। প্রকৃতি হবে তাদের গুরু। প্রত্যেক শিশু হবে প্রকৃতির শিষ্য। শিশুরা যেন বলবে ‘বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর/সবার আমি ছাত্র’।

কিন্তু ভুল পাঠ শিক্ষা দিয়ে চার গুণ কেন; শিশুদের কিছুই আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। আর যারা শিশুর মানসিক বিকাশ, পারিপার্শ্বিকতা, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পরিপ্রেক্ষিত চিন্তা না করে খামখেয়ালিপনার মধ্য দিয়ে পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন এবং যাঁরা তা অনুমোদন দেন; তারা শিশুদের প্রকৃতি কেন ভুলে ভরা জীবন ছাড়া অন্য কিছু চেনাতে পারবেন না।

বছর বছর ধরে ঝুলে থাকা আমাদের শিক্ষানীতি হবে-হচ্ছে। এহেন শিক্ষানীতি ছাড়া দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাটাকেও আমূল পরিবর্তন করে ফেলে হয়েছে। মেধাভিত্তিক নয়; গণহারে সবাই জিপিএ ৫ পেয়ে প্রায় ৯৯% শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাস করানোর লক্ষ্য স্থির করা হচ্ছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা যদি উত্তর ফাঁসের কারিগর হন, সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার প্রয়োজন নেই। আর ছাত্রানাম অধ্যয়নং তপঃ শিক্ষারও দরকার নাই। সত্যনিষ্ঠা, শ্রম বা অধ্যবসায় এখন শিক্ষার্থীদের আরাধ্য নয়; যেনতেনরূপে জিপিএ ৫ই সবার লক্ষ্য। কাঁধে ১৪/১৫টি বইয়ের বোঝা নিয়ে বাঁধা শিক্ষকের কাছে দৌড়াতে হচ্ছে মাধ্যমিকের একজন শিশুকে। শিক্ষা  নিয়ে এমন দৌড়ঝাপ পরিস্থিতিতে ভুলেভরা পাঠ্যবই হলো, বোঝার ওপর শাকের আঁটি। আর এই শাকের আঁটি আমাদের শিক্ষার ভিতকে নড়বড়ে করে দিয়ে সামগ্রিক অধঃপতনকে ত্বরান্বিত করবে বৈ আর কিছু নয়। সবক্ষেত্রে আমরা যে ভুল প্র্যাকটিস শুরু করেছি, সেই ভুলের সংস্কৃতি থেকে আমরা কি আদৌ বেরোতে পারব?

লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 90 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ