পুরুষতন্ত্রের অপরাধটা কী?

Print

বিথী হক : পরিচিত প্রগতিশীল প্রাক-মধ্যবয়সীদের সঙ্গে এক ওয়েটিংরুমে বসে বসে টেলিভিশনে চোখ বুলাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনে পুরুষ সঙ্গী তার নারী সঙ্গীর মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া কাপড়টা খুব অসহ্য আর বিদঘুটে লাগল। ‘কী ধুয়েছো, পরিষ্কার হয় না’- বলে নারীর মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া কাপড় নিয়ে কারও কোনও সমস্যা নেই। না নারী, না পুরুষ, না স্বামীর, না স্ত্রীর! কিন্তু কারও না কারও সমস্যা থাকার কথা। বিশেষত ছুঁড়ে দেওয়া কাপড়ের জায়গাটি যদি ওয়াশিং মেশিন না হয়। ডাস্টবিন, ওয়াশিং মেশিন বা ময়লা কাপড়ের ঝুড়িতে কোনও জিনিস ছুঁড়ে ফেলাটাই যুক্তিযুক্ত, কারও মুখের ওপর নয়। এই মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত স্মার্ট ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘ভালোবেসে বউ যদি কাপড় ধুয়ে দেয়, তাহলে সমস্যাটা কোথায় আপনাদের? সবখানে পেঁচানোটা আপনাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।’ বিষয়টি শুধুমাত্র কাপড় পরিষ্কার-অপরিষ্কার ছাড়িয়ে পারিবারিক নির্যাতনকেও প্রমোট করবে কিনা এই প্রশ্নটি করার আগেই তিনি অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন।
আমার অনেক কথাই তখন আর বলা গেলো না। ভালোবাসাটা কি একপেশে? সব ভালোবাসা শুধু নারীই বাসবে? ভালোবেসে ভাত রাঁধবে, ঘর-দোর মুছবে, ছুঁড়ে দেওয়া কাপড় ধোবে, অসুস্থ হলে সেবা করবে, যত্ন করে সংসার গুছিয়ে রাখবে, বাচ্চা-কাচ্চা দেখভাল করবে; সবই ভালোবেসে করবে সমস্যা নেই। কিন্তু ভালোবাসা সব একজন বাসলে ঝামেলা। সঙ্গী যদি মনে করেন অবস্থানগতভাবে একজন সেবা করতে পারলেই নিজেকে ধন্য মনে করেন, ‘ভালোবাসি’ বললেই যদি হাসিমুখে সব মেনে নেন তাহলে নিজেকেও যে ঠকানো হয়! ভালোবেসে শাসক-শ্রেণি কখনও শোষিতের কাপড় ধুয়ে দেন না কেন? নোংরা শোনায় নিশ্চয়ই, এসব তো নারীবাদ নয়।

আরেকজন নেতা মানুষ, সভা-টকশোতে নিয়মিত যান, সমানাধিকারের কথা বলেন, কিন্তু বিশ্বাস করেন সন্তান জন্মদান নারীর ইচ্ছে-অনিচ্ছের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। সন্তান জন্মদান প্রাকৃতিক, তাই সবাইকে এই নিয়মের মধ্যদিয়ে যেতেই হবে। এখানে ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনও স্থান নেই। এমনকি যে নারী বিয়ের পর পুরুষের নাম নেন, তার পক্ষেও সেই ব্যক্তির অবস্থান বেশ দৃঢ়। তার কাছে নারীর আইডেন্টিটি বদলানোর ঘটনা এমনকিছু নয়, স্বাভাবিক ঘটনা।

সেই তিনিই কিন্তু স্বাভাবিক হলেও অনেক কিছুই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে করতে চান না। তার শার্ট-লুঙ্গি পরে বাইরে বেরোতে আপত্তি। ঔপনিবেশ হওয়ার আগে একপ্রস্থ কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকার স্বাভাবিক রীতিতে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। বলেন, তার ইচ্ছে এবং স্বাচ্ছন্দ্যটা গুরুত্বপূর্ণ, আর এখন সময় বদলেছে। সময় যে একদিনে বদলায় না, একে কারও না কারও বদলাতে হয়। এতেও তিনি স্বাভাবিকত্ব খুঁজে পান না। এবং তাই সন্তান জন্মদানে নারীর ইচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধের গুরুত্বটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

কয়েকদিন আগে টিএসসিতে বসে এক মানবাধিকার কর্মীকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় একজন প্রো-প্রগতিশীল বললেন, ‘নারীরা নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করলে কী সমস্যা! নারী-পুরুষ সমানাধিকারের নামে এগুলো বাড়াবাড়ি।’ ‘তাহলে আত্মসম্মানবোধ আর নিজের পরিচয় তৈরির জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি বা স্বাধীনতা কোনও ফ্যাক্টরই নয়?’ এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমার মাও তো বিয়ের পর বাবার কাছ থেকেই টাকা নিয়েছেন, এমনকি দাদিও! তাতে কি তারা পরাধীন হয়ে গেছেন বা আত্মসম্মানহীন হয়ে গেছেন!’

এ বিষয়ে বললেই প্রাগৈতিহাসিক ঘটনার বিবৃতি একের পর এক আসতে থাকে। বাক্স-পেটরা টেনে ৪৪ হাজার বছরের রেফারেন্স, তন্ত্র আর চর্চা টেনে এনে যেকোনও কিছুর বৈধতা দেওয়া আমাদের অভ্যাস। আরও বেশি ঢুকেছে ‘মা-নানি-দাদিরা এতদিন যা করে এসেছেন তা ভুল হবে না’ যুক্তি। সবই তো পুরনো নিয়ম, পুরনো নিয়মে চললে কোনও সমস্যাই নেই।

ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার আপনার পাঁচ হাজার টাকা বেতন থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ খেয়ে আপনার বাবার পেনশনের ফাইল খুলে কাজ করবেন, এটাও পুরনো নিয়ম। আপনি এই নিয়ম ভাঙতে চাইলে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। সেই ভদ্রলোক কতটাকা বেতন পান, তার স্ট্যাটাসের সঙ্গে তার বেতন কতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তার ঘুষ খাওয়াকে বৈধতা দেওয়া কোনও যৌক্তিক কাজ হতে পারে না নিশ্চয়ই। আপনি ঘুষ দেন, কারণ ওখানে ঘুষের সংস্কৃতি তৈরি আছে। না দিলে কাজ হয় না। ৫০০ বছর পর সেটাই নিয়ম বনে যাবে, তারপর সিভিল রাইটস। এখন হঠাৎ যদি মনে হয় এটা অন্যায়, আপনি আপনার টাকা অন্যায়ভাবে অন্যের কাছে দিতে চান না। যদি মনে হয় সিস্টেম যাই থাকুক, বদলাক বা না বদলাক বা নিজের মতো করে বদলাক, আপনি আপনার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করবেন তো তাতে দোষের কিছু নেই।

আপনার বা আমার মা-দাদির আত্মসম্মানের ঘটনাও এখানে এমনই। একটা চর্চা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে চলতে এখন এটাই সত্য আর স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এর বাইরে কেউ বের হতে চাইলেই তা আমাদের অদ্ভূত লাগে। অন্যের কাছ থেকে রোজ টাকা নিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাতে থাকলে, একটা মানুষের নিজের আত্মবিশ্বাস অনেকখানিই কমে যায়। তাছাড়া ভাবুন তো আপনি আপনার খুব ভালো একজন বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নেন, রোজ নেন। সে ছাড়া আপনার অন্যকোনও উপার্জনের উৎস নেই। সে একদিন অন্যায় আবদার করলে আপনি চাইলেই তাকে ‘না’ করতে পারবেন না। বা ধরুন অন্যায় নয় একেবারেই, কিন্তু তার সব কথা তার অধস্তন হিসেবে শোনাটাকে, তার বাধ্যগত হয়ে যাওয়াটা একসময় আপনার গা-সওয়া হবে না? বা ধরুন সে আর নাই। তার অনুপস্থিতিতে আপনি কোথায় যাবেন, কোথায় গিয়ে মাথা গুঁজবেন, কী খাবেন?

আর কিছু না হোক, নিজের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে হলেও সবারই নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা জরুরি। শুধু নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আর আত্মসম্মানের কথা বললে কেন সেটা অতিরঞ্জন হয়? বাড়াবাড়ি হয়? আপনার মানবতাবাদ কেন এই মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলে না?

যেকোনও সম্পর্কেই সমতা একটি বড় ফ্যাক্টর। বন্ধু বা সঙ্গী হওয়ার ক্ষেত্রে তো আরও জরুরি। সম্মানের সঙ্গে সমতার তেমন কোনও সম্পর্ক না থাকলেও যেখানে সমান অংশগ্রহণ দরকার, সেখানে সমতার বিকল্প কিছু আছে? সমতা না থাকলে তার জন্য আন্দোলন আর চর্চারও কোনও বিকল্প শর্টকাট পথ নেই। সবকিছু যদি ঠিকঠাকই চলে, তাহলে আন্দোলন কেন? ঠিকঠাকই যদি থাকে তবে পুরুষতন্ত্রের অপরাধই বা কোথায়? কেনই বা মানবতাবাদের কথা বলেন?

মানবতাবাদের কথা বলবেন আর ঘরের ভেতর অসমতার চর্চা করবেন, তবে রেনেসাঁর পথ চেয়ে কেন বসে থাকা? যেমনভাবে পৃথিবী চলেছে এত এত হাজার বছর, তেমনভাবেই তো পৃথিবী বাকি হাজার বছর চলে যেতে পারবে। এত মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন কেন তবে? বিপ্লবেরই বা কী দরকার! আমরা সকলেই বেঁচে আছি, ভালোভাবে। প্রতিদিন রাতে তো আর আমাদের চামড়া ফুটে রক্ত বেরোয় না, বুকে গুলি লাগে না, তবে সিস্টেম চেইঞ্জ নিয়ে কেন এত মাথাব্যথা হয় আমাদের। আবার সমস্যা সিস্টেমে থাকলে শুধু সিস্টেম বদলে গেলেই কাল থেকে সবাই সিস্টেমমাফিক বোরকা বা বিকিনি পরে যেমন রাস্তায় বেরোনো শুরু করবে না, নিজে নিজে দৌড়ে বাসে উঠতে পারবে না, তেমন পরদিনই সকল অন্দরমহলের নারীরা অফিসে ছুটে যাবে না। তাই এমন আন্দোলন রোজ করতে হবে। ঘরে, বাইরে, টিএসসির মাঠে, অফিসে, টেলিভিশনের সামনে, নামে, পোশাকে সবখানে।

লেখক: সাংবাদিক।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 197 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ