পুলিশ সুপারের বাড়ি নির্মাণে ‘রাজমিস্ত্রির হেলপার’ ৬০ পুলিশ!

Print

একটি কথা প্রচলিত রয়েছে ‘মাছের রাজা ইলিশ ও দেশের রাজা পুলিশ।’ বসকে খুশি করতে অনেক সময় সেই পুলিশকেও নির্মমতার স্বীকার হতে হয়। তাও আবার পুলিশ দ্বারাই পুলিশ নির্যাতন। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে করতে হচ্ছে রাজমিস্ত্রির হেলপার বা নির্মাণ শ্রমিকের কাজ।পুলিশের রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) ঢাকা ইউনিটের প্রধান পুলিশ সুপারের বাড়ি নির্মাণে সাব-ইন্সপেক্টসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে করতে হয়েছে এমন কাজ।

রাজধানীর মিরপুর ও সাভারে নিজের দুইটি বাড়ি তৈরিতে পুলিশ সদস্যদের দিয়ে এমন অনৈতিক কাজ করার অভিযোগ উঠেছে রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) ঢাকা ইউনিটের প্রধান পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয় নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশের গাড়ি। অভিযোগে উঠে এসেছে ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যদের নাম ও তাদের বক্তব্য।

সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন অনৈতিক কাজ করার সুনির্দিষ্ট ওই অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অভিযোগ অনুসন্ধানে এরই মধ্যে দুদকের উপপরিচালক এস এম মফিদুল ইসলামকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর অনুসন্ধান কাজের তদারকী করার জন্য পরিচালক কাজী শফিকুল আলমকে নিয়োগ দিয়েছে কমিশন।

দুদকের অনুসন্ধানের এসব তথ্য নিশ্চিত করে সংস্থাটির উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) ঢাকা ইউনিটের প্রধান পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সাভারের হেমায়েতপুরের আলীপুর ব্রিজ সংলগ্ন ৮৪ শতাংশ জমির উপর বাড়ি তৈরি ও ঢাকার মিরপুরের মাজার রোডের আলমাস টাওয়ারের পাশে আরো একটি বাড়ি নির্মাণে যোগালী ও শ্রমিক হিসেবে সাব-ইন্সপেক্টসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ৫০ থেকে ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অনুসন্ধানের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অনুসন্ধান করলে অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসবে। অনুসন্ধান পর্যায়ে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের তথ্য উপাত্ত নেওয়া হবে। এই পর্যায়ে এর বেশি কিছু বলা যাবে না।

এ বিষয়ে দুদকে জমাকৃত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চার বছর ধরে ঢাকার রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সে এসপি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মিজানুর রহমান। এর আগে তিনি বাগেরহাটের পুলিশ সুপার ছিলেন। তিনি সাভারের হেমায়েতপুরের জগন্নাথপুরে প্রায় ৮৪ শতাংশ জায়গার ওপরে তৈরি করছেন আলিশান বাড়ি। বাড়িটি ইতিমধ্যে চারতলা পর্যন্ত উঠে গেছে। আর ওই কাজে মাত্র তিনজন পেশাদার রাজমিস্ত্রির সঙ্গে হেলপার বা জোগালি হিসেবে ব্যবহার করছেন সাব-ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ৬০ জন পুলিশ সদস্য। নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়ার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশের গাড়ি। প্রায় একই অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর মিরপুরে ও পলাশে তার আরও বাড়ি নির্মাণে।

তিন পৃষ্ঠার অভিযোগে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নাম ও কয়েকজনের বক্তব্য রয়েছে। অভিযোগ উল্লেখকৃত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে বলা হয়েছে, এসপি মিজানের নির্মাণাধীন বাড়িতে পুলিশের আরআরএফ শাখার প্রায় ৬০ জন সদস্য প্রতিদিন পালাক্রমে সাব-ইন্সপেক্টর আলমগীর হোসেন, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর, নুরু ও রুহুল আমিনের নেতৃত্বে কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন নায়েক মোস্তাকিন, নায়েক আলী আশ্রাফ, নায়েক সেকেন্দার, কনস্টেবল জামাল, কনস্টেবল সাইদুল, কনস্টেবল মান্নান, কনস্টেবল মনির, কনস্টেবল আরিফ শেখ, কনস্টেবল নাজিম, কনস্টেবল কাউসার, কনস্টেবল মাসুদ, কনস্টেবল সাইদুর, কনস্টেবল জাহিদুল, কনস্টেবল রাধারমন, কনস্টেবল আজাদ, কনস্টেবল শাহিন, কনস্টেবল জহিরুল, কনস্টেবল ওয়ালিউল্লাহ, কনস্টেবল কামাল, কনস্টেবল মনসুর, কনস্টেবল তারেক, কনস্টেবল ফকরুল, কনস্টেবল সুজন, কনস্টেবল সুমন, কনস্টেবল আপেল মাহমুদ প্রমুখ। আর প্রকৃত রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন আমিনুল, শামীম ও মনু মিয়া।

অভিযোগে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যের বিষয়ে সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকাল ৯টায় গেণ্ডারিয়ার মিলব্যারাক থেকে পুলিশ সদস্যদের আনা হয়। কাজ শেষে বিকেল ৬টার দিকে পুলিশের গাড়িতে করে আবার ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ব্যারাক থেকে যে খাবার আসে তাই তাদের খেতে দেওয়া হয়। কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করলে বরখাস্তের ভয় দেখানো হয়। কিছুদিন আগে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করায় এক কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কনস্টেবলের নাম সাইফুল ইসলাম (কনস্টেবল নম্বর-৭৪৫)।

অথচ পুলিশ প্রবিধানে স্পষ্ট বলা রয়েছে, পুলিশের প্রতিটি সদস্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাঁদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানো যাবে না।

দুদক সূত্র আরো জানায়, প্রায় দুই বছরে ধরে এসপির বাড়ি নির্মাণের কাজ করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। পুলিশ সুপারের মিরপুরের মাজার রোডে আলমাস টাওয়ার ও পলাশ স্টিল মিলের পাশে আরেকটি ভবনের কাজও পুলিশ সদস্যদের দিয়ে করিয়েছেন। জগন্নাথপুরের কাজের জন্য বর্তমানে মিরপুরের কাজ বন্ধ রযেছে।

এ বিষয়ে রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) ঢাকা ইউনিটের প্রধান পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল বলেন, অনুসন্ধানাধীন কোন বিষয় নিয়ে আমি মন্তব্য করবো না। অনুসন্ধান শেষ হলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 299 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ