প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে রাজনীতিতে উত্তাপ

Print

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের এখন বাকি তিন সপ্তাহ। কিন্তু এরই মধ্যে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির অঙ্গন। এই সফরে কী নিয়ে চুক্তি বা আলোচনা হবে-এর মধ্যে কেবল একটি বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। এটি হলো বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। তাও বলেছেন বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী।
চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী ভারতে যাচ্ছেন আগামী ৭ এপ্রিল। পরদিন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক হবে তার। সেখানেই তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা এবার তিস্তা চুক্তি নিয়ে নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত আবারও নিরাপত্তা নিয়ে চুক্তি চায়-বিদেশি একটি গণমাধ্যমের এমন সংবাদ প্রকাশের পর এ নিয়েই আলোচনা হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে বিএনপি নেতারা এটা নিয়েই সোচ্চার বেশি।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে চুক্তি করলে সেটি হবে আত্মঘাতী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি হুমকিস্বরূপ। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আগেভাগেই আলোচনারও দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা শীর্ষ রাজনৈতিক দলের প্রধানের ভারত সফরের আগে বরাবরই নানা আলোচনার ঝড় উঠে আগেভাগেই। এবারও বিএনপির প্রতিক্রিয়াকে গতানুগতিক হিসেবেই দেখছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।
গত ১১ মার্চ এক আলোচনায় বিএনপির কড়া সমালোচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পাওনার কথা তুলতে সাহসই করেনি কখনও্। আর আওয়ামী লীগ স্থল সীমানা চুক্তি, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মীমাংসা করেছে। তিনি সেদিন বলেন, ‘যারা ভারতের কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারেনি, এথন আবার ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলে।’
প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরও বিএনপি নেতারা তাদের বক্তব্য অব্যাহত রেখেছেন।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের সামরিক চুক্তি হলে এর আগে অবশ্যই পাবলিক ডোমেইনে আসা উচিত। বিস্তারিত আলাপ আলোচনা হওয়া উচিত। আমরা সেই কথাই বলেছি। স্বাভাবিকভাবে এটাই হওয়া উচিত। তারপরও সরকার পাশ কাটিয়ে যদি নিজেদের মতো করে ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে তাহলে তার দায়দায়িত্ব তাদের নিতে হবে।’
বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরাও কথিত সামরিক চুক্তি নিয়ে সোচ্চার। গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘আজ আমাদের দেশে যেসব অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড ও অপকর্ম পরিচালিত হচ্ছে সবকিছুই ভারতের মদদে হচ্ছে। ভারত এখন আমাদের দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন করে নিরাপত্তা ও সামরিক চুক্তির জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে। এটা হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, দেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে।’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৫ বছর মেয়াদী নিরাপত্তা চুক্তি হয় স্বাধীনতার পর পর। দুই দশক আগে ১৯৯৭ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় তখনই সে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। আর আওয়ামী লীগ এই চুক্তি নবায়ন করেনি। ভারতের পক্ষ থেকেও সে সময়ে কোনো ধরনের চাপ ছিল বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়নি।
আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করতে ১৯৭৫ সালের পর থেকে বিএনপি নেতারা এই চুক্তিকে গোলামি চুক্তি বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বক্তব্য দিয়ে এসেছে। তবে চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের বিষয়ে দুই দফা ক্ষমতায় থাকার পরও কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিএনপি।
আওয়ামী লীগ বরাবর বলে আসছে, বিএনপি পাকিস্তানি রাজনৈতিক ভাবধারার মতোই ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করে রাখতে চায়। এবারও তারা সেই একই কাজ করছে।
ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা বলেছেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-কলকাতা বাস চালুর প্রতিবাদে তিন দিনের টানা হরতাল করেছিল বিএনপি। তাদের দাবি ছিল, এই বাস চালুর ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হবে।
গত ১১ মার্চের আলোচনায় আরও একটি বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটি হল ১৯৯৭ সালে তিন পার্বত্য এলাকায় স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে অস্ত্র তুলে নেয়া জনসংহতি সমিতির সঙ্গে করা শান্তি চুক্তি। এই চুক্তির বিরোধিতা করে বিএনপি তখন বলেছিল এই চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। চুক্তি বাতিলের দাবিতে তখন খালেদা জিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চও করেছিলেন।
অবশ্য ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই চুক্তি বাতিল করেনি। বরং চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু উদ্যোগ তারাও নিয়েছিল।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিএনপির ভারত নীতি অদ্ভুত। তারা মুখে বলে একটা আর করে আরেকটা। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে তাদের সাফল্য শূন্য। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় গঙ্গার পানিবণ্টন সমস্যা তুলতেই ভুলে গিয়েছিলেন। সেই তারাই আবার রাজনীতির ময়দানে শোরগোল করে।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের অবদান আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। তাই বলে আমরা আমাদের স্বার্থ কখনও এতটুকু ছাড় দেব-এমনটা নয়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ভারত বিরোধীতা একটা রাজনৈতিক কারণে হয়। এবারও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে বিরোধীরা যে বিতর্ক করছে তা রাজনৈতিক কারণেই হচ্ছে। তবে দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখেই প্রধানমন্ত্রী চুক্তি করবেন।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে আমাদের সাথে তাদের কী ধরণের চুক্তি হচ্ছে সেই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোন কথা বলা হয়নি। কিন্তু তার আগেই বিএনপি কীভাবে বলছে আমরা তাদের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করছি?’।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যেই চুক্তিই হোক, তা হবে বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘কোন চুক্তিই গোপন থাকবে না। সামরিক হোক, অসামরিক হোক। যেকোন চুক্তি জাতীয় স্বার্থ সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে করতে আপত্তি কোথায়?

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 50 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ