‘প্রভাবশালী’ বাস মালিকদের কাছে সরকার ও ওবায়দুল কাদেরের পরাজয়!

Print

রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি কারা? রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করে তারা? না তাঁদের যারা চালায় তারা। তারা কারা? এটা অজানা অনেকের। কোন ইস্যু যখন জনগণের সামনে আসে তখন জনগণ তাদের ভোটে বানানো প্রতিনিধিদের জানায় কিন্তু বরাবরে প্রতিনিধিরা এক অশুভ শক্তির জানান দেয়। সম্প্রতি সিটিং সার্ভিস এ বাড়তি ভাড়া ও সরকার কতৃক এই সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দিলে,  এই অশুভ শক্তির আভাস দেখা যায় আবার। আইন প্রয়োগ হয়েছে ঠিকই কিন্তু এর খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিককে। প্রশাসনের লোকদের সামনে লাঞ্চিত হচ্ছে অভিযোগকারীরা। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী নেতার দায়িত্বে এই পরিবহন সেক্টর। বড় বড় নেতাদের মুখে যখন অশুভ শক্তির রেশ পাওয়া যায় তখন রাষ্ট্রের নাগরিক যাত্রীদের খাল কেটে কুমির আনার অবস্থা হয়।তিনদিন ধরে রাজধানী ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। একস্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না পাবলিক পরিবহন। যদিও নামমাত্র কিছু গাড়ি চলছে, সেগুলোও ইচ্ছেমত হাতিয়ে নিচ্ছে যাত্রীদের পকেট। কেউ কিছু বলার সাহসও নিচ্ছে না। যদি কেউ কেউ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে তাকেও হতে হচ্ছে লাঞ্ছিত। এমনকি গায়েও হাত তোলার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। বাস শ্রমিকদের সব জিদ যেন সাধারণ যাত্রীদের উপরেই!ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ এপ্রিল সিটিং সার্ভিস, গেইট লক, বিরতিহীন কিংবা স্পেশাল সার্ভিস নামে যেসব বাস চলাচল করছে তা বন্ধ ঘোষণার পর থেকেই। ঘোষণা দিয়েও সিটিং সার্ভিস বন্ধ হয়নি-এই বাস্তবতায় বাস মালিকদের বাধ্য করতে অভিযানে নামে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীতে সিটিং বা ডাইরেক্ট নামে চলা বাসের একটি অংশ লোকাল হিসেবে চলা শুরু করে। কিন্তু এই বাসগুলো তাদের সেবার মান কমিয়ে দিয়েছে ইচ্ছে মত।সিটি সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পর স্টপেজে স্টপেজে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি, ঠাসাঠাসি করে যাত্রী তোলা, ভেতরের ফ্যান বন্ধ করে রাখাসহ যাত্রীদের হয়রানি করছে পরিবহন শ্রমিকরা। এসব নিয়ে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেই তারা বলছেন, সিটিং থেকে লোকাল হলে এটা মেনেই নিতে হবে।এদিকে আইনে সিটিং বলতে কিছু নেই। বাসে আসনের অতিরিক্ত না তুললেও সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আসন হিসেবে যাত্রী তোলা হবে- এই ঘোষণা দিয়ে বছরের পর বছর ধরে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করে চলছিল বাসগুলো। তবে বিষয়টি  সরকারের নজর এড়ায়নি। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরর নির্দেশে রাজধানীতে চলাচলকারী গণপরিবহনে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করে দেয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।এরপর থেকেই গণপরিবহনে সাধারণের যাত্রীদের ভোগান্তির যেন অন্ত নেই।ভরা গ্রীষ্মের রোদে দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেও যাত্রীরা  বাসের অভাবে  গন্তব্যে যেতে পারছেন না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাসের দেখা মিললেও ভিড় আর ঠেলাঠেলির কারণে অনেকেই  বাসে চড়তে ব্যর্থ হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের কাছে বাসে ওঠা একেবারেই নাগালের বাইরে চলে গেছে।

এই পরিস্থিতি কেন? জানতে চাইলে পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘গাড়ির সংখ্যা কয়েকদিন কমবে। আমরা এব্যবস্থা চলামান রাখবো যেন নিয়মের মধ্যে আনতে পারি। আমরা বিষয়টি নজরে রাখছি।’ইচ্ছেমতো যাত্রী  ওঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিআরটিএর সঙ্গে আমাদের কথা অনুযায়ী আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যাবে।’তার অবস্থা যখন এমন তখন বাস মালিকেরা সিটিং সার্ভিসের বৈধতা চান,। একই সঙ্গে  এ সার্ভিসের জন্য চান পৃথক ভাড়ার তালিকা।তাদের দাবি, ‘গত তিন দিনের অভিযানে মালিকদের চেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে যাত্রীদের। সিটিং সার্ভিসে চলাচলকারীরা লোকাল বাসে গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে পারছেন না। আবার অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে তাদের পক্ষে প্রতিদিন সিএনজি অটোরিকশায়ও চড়া সম্ভব নয়। এতে নারী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। তাই ঢাকা শহরে মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাত্রীদের জন্য সিটিং সার্ভিস থাকতেই হবে’।অন্যদিকে নতুন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ঘটনাকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করেছে। এক নেতা ও একটি পরিবহন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘সিটিং সার্ভিস বন্ধের উদ্যোগের পেছনে মালিকদের রাজনীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে’।মালিক সমিতির নেতারা ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) কাছে অনেকবার সিটিং সার্ভিসের রুট পারমিট চেয়েও পাননি। বিআরটিএকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করা হয়েছিল, সিটিং সার্ভিসের জন্য যেন পৃথক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তা না হওয়ায় সিটিং সার্ভিস বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিবহণ মালিকেরা জানতেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে তা হঠাৎ করে সিটিং সার্ভিস  বন্ধ করে দিলে দুর্ভোগ পোহাতে হবে যাত্রীকে। আর এ কারণেই এ সার্ভিস বন্ধ করা হয়েছে। যাতে আরটিসি এ ধরনের বাসকে রুট পারমিট দিতে বাধ্য হয়।’তার সঙ্গে সুরে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীও। দীর্ঘ দিনের যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘এবারের অভিযান ছিল পূর্বপরিকল্পিত। মালিকরা সিটিং সার্ভিসের বৈধতা পেতেই এর্ দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছেন। তারা সিটিং বন্ধ করিয়ে লোকালেই সিটিংয়ের ভাড়া নিচ্ছেন। যাত্রীরা বলতে শুরু করেছেন, আগের সিটিংই ভালো ছিল। নারীরা বাসে চড়তেই পারছেন না। স্বস্তিতে যাতায়াত করতে তারাও সিটিং সার্ভিস ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন। মালিকরা এটিই চেয়েছিলেন। তারা চাইছেন বেশি ভাড়ায় সিটিং সার্ভিস চালুর অনুমতি পেতে’।তার কিছুটা প্রমাণও পাওয়া যায় বাস চালকদের কথা থেকে।রাজপথে বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত তৎপর থাকায় রাজধানীতে গণপরিবহনের বহু বাস চলাচল করছে না। কাগজপত্র ঠিক না থাকার দোহাই দিয়ে জরিমানা ও ডাম্পিংয়ের ভয়ে নিজেদের বাসগুলো লুকিয়ে রাখছেন মালিকরা। কিন্তু  আদালত চলে যাওয়ার পর আবার যাত্রী পরিবহনে নেমে পড়ছে বাসগুলো।

এ কারণে তিন দিন ধরে নগরীতে রীতিমতো পরিবহন সংকট চলছে। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পরিবহন মালিকরা এভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে।অন্যদিকে বাস মালিকেরা বলেছে, ‘আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমাদের যেভাবে চলতে বলবে, আমরা সেভাবেই চলব। সিটিং বন্ধ হলে যাত্রীদেরই সমস্যা বেশি। কারণ আগে যে ভাড়া দেয়া লাগত, এখনো সেই ভাড়াই দিতে হচ্ছে। কিন্তু যেতে হচ্ছে কষ্ট করে। আর যেহেতু লোকাল হিসেবে যাত্রী তোলা হচ্ছে, তাই গাড়ি কম লাগছে। আগে যে গাড়িতে ৩০ জন যাত্রী যেতো, এখন সেই গাড়িতে ৬০ জনের ওপরে যাত্রী তোলা হচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি কম থাকাই তো স্বাভাবিক। আমরা তো আর গাড়ি খালি রেখে চালাব না। অন্যদিকে যাত্রী গাদাগাদি করে নিলে আমাদের ভাড়া কাটতে একটু সমস্যা হয়। কিন্তু সিটিং চললে ভাড়া কাটতে কোনো সমস্য হয় না।এদিকে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পর ফের চালু হবে কি-না এবং পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মালিকদের সঙ্গে বিআরটিএ’র বৈঠক বসবে বুধবার (১৯ এপ্রিল)। বৈঠকের বিষয়টি সামনে এনে পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত খন্দকার এনায়েত বলেন, ‘সিটিং সার্ভিস চালুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব হলে আমরা সরকারকে অনুরোধ করব এর অনুমতি দিতে। এ সার্ভিসের ভাড়া লোকালের চেয়ে আলাদা হবে।’একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘যাত্রী দুর্ভোগ বিবেচনা করে সিটিং সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। তবে তার ভাড়া লোকালের চেয়ে বেশি হতে হবে। লোকালে কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা হলে সিটিংয়ে এর চেয়ে কিছুটা বেশি হবে। স্টপেজ সংখ্যা কমাতে হবে, যাতে যাত্রীরা দ্রুত গন্তব্যে পেঁৗছাতে পারে।’এর আগে সচিবালয়ে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিবহন মালিকরা কোনও সামান্য লোক নয়, তারা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। পরিবহন মালিকদের ডাকলেও আসেন না।

চলমান পরিবহন সেক্টরের বিষয়ে গণমাধ্যমে আসা সংবাদগুলো আমার নজরে এসেছে। এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ও পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। পরিবহন খাতের অনিয়ম দূর করতে যে অভিযান চলছে জনস্বার্থে তা রিভিউ করার জন্য বলেছি। কাল এ সংক্রান্ত মিটিং আছে।পরিবহন মালিকরা কি সরকারের চেয়ে প্রভাবশালী? সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, তারা সরকারের চেয়ে প্রভাবশালী না। তাদের ডাকলে প্রথমে আসেন না, কিন্তু পরে ঠিকই আসেন। কারণ এর সঙ্গে অনেকের স্বার্থ জড়িত আছে।’এবিষয়ে এক মাহফুজ নামে এক যাত্রী বলেন, ‘সেতুমন্ত্রীর কথা থেকেই প্রকাশ পায় পায় তার অসহায়ত্বের কথা। তিনি একই তো আর সবকিছু পরিবর্তন করে দিতে পারে না।এখন সময় এসেছে সাধারণ মানুষের প্রতীবাদ করার। বাস মালিকেরাও আর কয়দিন বাস বন্ধ রাখবে। মালিক, শ্রমিকদেরওতো খেতে হবে। আবার দিতে হবে ব্যাংকের কিস্তি। আবার অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়া চাইলে অথবা অযাথা সময় নষ্ট করলে আমরা সাধারণ যাত্রীরা যদি একসাথে প্রতিবাদ করি তা হলে তারাও নিয়ম মেনে বাস চালাতে বাধ্য হবে’।তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘যাত্রী হয়রানি বন্ধে সরকারি উদ্যোগকে বানচাল করার জন্য কতিপয় মালিক তাদের বাস চলাচল বন্ধ রাখছেন। এসব বাসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক নেই। বিআরটিএ’র উচিত এসব বাসের রুট পারমিট বাতিল করে দেওয়া’।

অন্যদিকে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, ‘গণপরিবহনকে শৃঙ্খলায় ফেরাতেই এই অভিযান। যাত্রীদের এ ভোগান্তি, দুর্ভোগ সাময়িক। কিন্তু যাত্রীরা এর সুফল ভবিষ্যতে পাবেন।’জনগণের অধিকারে আদায়ে জনগণকে এগিয়ে আসতে হয় ,জনগণ এগিয়ে এসে আওয়াজ তুলে ,তা দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কান বরবার যায় এরপর জনগণ চুপ থাকে কিন্তু দায়িত্বরত ব্যক্তিরা যদি অল্প সময়ের মধ্য পরাজয় মেনে নে নানা অজুহাতে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা উপহাস করে। তখন নাগরিক অসহায় হয়ে নিজের সত্যকে মিথ্যা বলতে শুরু করে আর সকল ঘটনা শুধু ভুল বোঝাবুঝি নামে চালিয়ে দেয় সুযোগ সন্ধানী ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 465 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ