প্রশাসনে অদক্ষতা

Print

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যাতে আবেদনকারীর বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩০ বছর উল্লেখ করা হয়। এর ফলে সরকারি চাকরিরত প্রার্থীদেরও আবেদন করতে হলে বয়স ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে। অথচ দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম হলো চাকরির জন্য আবেদন করতে বিভাগীয় প্রার্থীদের বেলায় বয়সসীমা ধরা হয় ৩৫ বছর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আইনগত ভিত্তি নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এ ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ প্রশাসনিক অদক্ষতার ফসল। এমন অদক্ষতার কারণেই শূন্য পদে লোক নিয়োগ দিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। কারণ এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে কেউ না কেউ আদালতে যাবে। ফলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যাবে। পরে নতুন করে আবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। আর কর্মকর্তাদের এমন সিদ্ধান্তের দায় বহন করতে হয় সরকারকে।

শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তেই এ ধরনের অদক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। গত এক বছরে অর্থ মন্ত্রণালয় ইনক্রিমেন্ট (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) নিয়ে যা করেছে তা চরম অদক্ষতার নজির হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সরকারকে এ বিষয়ে দফায় দফায় সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। এই বদলানোর প্রক্রিয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় একাই জড়িত নয়, এই প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হয়। এরপর জারি করতে হয় প্রজ্ঞাপন।

সাবেক সংস্থাপন (বর্তমান নাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) সচিব ড. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে পেশাদারত্বের বদলে আনুগত্য অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। নামে মাত্র ট্রেনিং হচ্ছে। পর্যাপ্ত মনিটরিং নেই। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অদক্ষতার জন্য কোনো বিভাগীয় অ্যাকশন নেওয়া হয় না। কোনো কোনো মন্ত্রী এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল। অনেক মন্ত্রী আস্থা রাখতে পারছেন না কর্মকর্তাদের ওপর। সম্প্রতি মন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে দূরত্বও তৈরি হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্পাদিত অ্যানুয়াল পারফরম্যান্স এগ্রিমেন্ট (এপিএ) নামে মাত্র। এসব নতুন নতুন বিষয় পরিকল্পনা করলেই হবে না, বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেকে ভাসা ভাসা নলেজ দিয়ে মন্ত্রণালয় চালাচ্ছে। কেউ ডিপে (গভীরে) যাচ্ছে না। নতুন করে কাজ করা উচিত। যাদের যোগ্যতা আছে তাদের কাজে লাগাতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়।

গত বছর পর্যন্ত নিয়ম ছিল যে সরকারি কর্মচারী যেদিন চাকরিতে যোগ দেন, বছর শেষে সেদিনই তাঁর ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় গত বছর নিয়ম পরিবর্তন করে বলল, বছরের একদিনে সব সরকারি কর্মচারীর ইনক্রিমেন্ট যোগ হবে। এ কারণে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কোনো কর্মচারীকে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে না। পরে কর্মচারীদের অসন্তোষ টের পেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যাতে বলা হয়, ২০১৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা ইনক্রিমেন্টের যোগ্য হয়েছেন তাঁরাই শুধু চলতি অর্থবছরের ইনক্রিমেন্ট পাবেন। অর্থাৎ ২০১৫-১৬

অর্থবছরের মধ্যে প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে যাঁরা ইনক্রিমেন্টের যোগ্য হয়েছেন তাঁরাই শুধু ইনক্রিমেন্ট পাবেন। অর্থবছরের পরের সাড়ে ছয় মাসে যাঁরা ইনক্রিমেন্টের যোগ্য হবেন তাঁরা ইনক্রিমেন্ট পাবেন না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই নতুন সিদ্ধান্তে সরকারের সাড়ে ১২ লাখ কর্মচারীর অর্ধেকই ক্ষতির মুখে পড়ে ফুঁসতে থাকে। এটা টের পেয়ে আবার নতুন নিয়ম করে বলা হয়, সবাই ইনক্রিমেন্ট পাবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদক্ষতা সারা দেশের সরকারি কর্মচারীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইনক্রিমেন্ট নিয়ে সিদ্ধান্তের শুরুতেই আপত্তি জানিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের আপত্তি উপেক্ষা করে ইনক্রিমেন্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় অর্থ মন্ত্রণালয়। সে সময় আন্দোলনরত প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি থেকেও বলা হয়েছিল, এভাবে ইনক্রিমেন্টের হিসাব সঠিক হবে না। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই বঞ্চনার শিকার হবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও পে স্কেলে ইনক্রিমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সংশ্লিষ্ট নথিটি অনুমোদন না করে আটকে রেখেছিলেন তিনি।

সরকারের খাদ্য ভাণ্ডারে বিশাল মজুদ রয়েছে। এই মজুদ খালি করতে না পারায় এখনো ইরি-বোরো ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করতে পারেনি খাদ্য অধিদপ্তর। ভাণ্ডার খালি করার জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কর্মসূচি ‘ফেয়ার প্রাইস’ কার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠকে। ৩২ টাকা কেজি দরে চাল কিনে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করা হলে প্রতি কেজিতে ২২ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এই বিশাল ভর্তুিকর জন্য অনুমতি নিতে হবে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। এ লক্ষ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিস্তর খেটে প্রস্তাব তৈরি করেন। খাদ্য অধিদপ্তরের সেই প্রস্তাব খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পৌঁছালে তারাও যাচাই-বাছাইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রায় দুই মাস চেষ্টার পর একটি প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হলেও দুই দিন পর তা ফেরত আনে খাদ্য মন্ত্রণালয়। ফেরত আনার কারণ জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অনুমোদন আগেই নেওয়া ছিল। অর্থাৎ ২০১২ সালে এ-সংক্রান্ত অনুমোদন দিয়েছিল অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। নতুন করে আর অনুমোদনের দরকার নেই। তিনি আরো বলেন, এটা মারাত্মক প্রশাসনিক অদক্ষতা। কারণ এই প্রস্তাব তৈরি করতে অনেক সময় লেগেছে। কাজ শেষে জানা গেল, এই কাজের কোনো দরকারই নেই।

প্রস্তাব ফেরত আনার কারণ জানতে চাইলে খাদ্যসচিব এ এম বদরুদ্দোজা বলেন, ‘আগে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বা কেন দেওয়া হয়েছিল সেটা নিয়ে আমরা ভাবছি না। কাজ করতে গেলে এমনটা হতেই পারে। কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল কিনতে হলে গুদাম খালি করতে হবে। আমরা সেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব জানান, প্রশাসনিক অদক্ষতা সব সেক্টরেই বিরাজ করছে। গত বছর মানবপাচার-সংক্রান্ত কমিটি থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কক্সবাজার জেলার টেকনাফে যারা হঠাৎ ধনী হয়েছে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর। ধারণা করা হচ্ছে, টেকনাফের হঠাৎ ধনী হওয়া ব্যক্তিরা মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে এ ব্যাপারে দায়িত্বও দেওয়া হয়। কিন্তু তারা গত এক বছরে এ-সংক্রান্ত কোনো তালিকা তৈরি করতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে গত মাসে অনুষ্ঠিত মানবপাচার-সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

পূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রীর দপ্তরের একটি গাড়ির স্টিকার সংগ্রহের জন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন পাঠানো হয়েছিল এক মাসের বেশি সময় আগে। কিন্তু এত দিনেও ওই শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো পত্রই পাঠানো হয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এ বিষয়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শাখাগুলো কাজ করে ফাইলের গুরুত্ব বুঝে। যে ফাইলে টাকা পাওয়া যাবে, সে ফাইলে কাজ করা হয়। যে ফাইলে টাকা নেই সেই ফাইলের কোনো কাজ হয় না।

অদক্ষতার প্রসঙ্গ তুলতেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অদক্ষতার দেখেছেন কী? সবচেয়ে বড় অদক্ষতার নজির আছে আমার কাছে। সম্প্রতি ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন আইন পাস হয়েছে সংসদে। আইনের কপি বিজি প্রেস থেকে ছাপানোও হয়ে গেছে। মন্ত্রণালয়ে আসার পর টের পাওয়া গেল আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা নেই। সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা ছাড়াই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে, সংসদে পাস হয়েছে। এমনকি বিজি প্রেসে ছাপাও হয়ে গেছে। পরে সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনটির ওই নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা ছাপিয়ে মূল আইনের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 40 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ