প্রাইভেটই যদি পড়াব তবে স্কুল কেন

Print

প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষাসহ জীবনের জন্য জরুরি সব দক্ষতা ও জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীদের তৈরি করার কথা স্কুল-কলেজগুলোর। বাস্তবে এর ছিঁটে-ফোঁটাও নেই দেশের প্রায় সব স্কুল-কলেজে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম- সবখানেই একই পরিস্থিতি। শিক্ষার্থীদের সামনে বিকল্প তাই প্রাইভেট টিচার আর কোচিং। এতে অভিভাবকদের খরচ করতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের বাড়তি অর্থ। প্রশ্ন উঠছে, প্রাইভেটই যদি পড়তে হবে, তবে স্কুল কেন?
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে যে সারমর্ম মেলে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব শিক্ষকদের কাছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত কোচিং সেন্টারে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।

যেমন রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ঝর্ণা। কলেজের বেতন, কোচিং ও প্রাইভেট টিচার- সব মিলে শুধু তার পড়ালেখার পেছনেই প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয় অভিভাবকের।
ঝর্ণার বাবা রেজাউল করিম মেয়ের ভালো ফলাফলের আশায় স্কুলের পাশাপাশি বাসায় গৃহশিক্ষক রেখেছেন। পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত-এ তিন বিষয়ে পড়ানোর জন্য গৃহশিক্ষককে দেন ১৪ হাজার টাকা। আর স্কুলে মেয়ের কোচিংয়ের জন্য দিতে হয় আট হাজার টাকা। এর বাইরে স্কুলে বেতনসহ অন্যান্য খরচ বাবদ তাকে প্রতি মাসে আরও ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয়। এ ছাড়া স্কুলে মডেল টেস্টসহ অন্যান্য খাতে তার পেছনে খরচ হয় আরও আট হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৪০ হাজার টাকা প্রতি মাসে রেজাউল করিমের খরচ হয় এক মেয়ের পেছনে।
শুধু রেজাউল করিমই নন, অভিভাবকদের প্রায় সবাইকেই ছেলেমেয়েদের পেছনে বাড়তি মোটা অংকের অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, স্কুল-কলেজে তাহলে কী হয়? শিক্ষকরা কী করেন? নিয়মতি পাঠদান করছেন না তারা? অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকরা পাঠদানের নামে দায় সারেন। এ ব্যাপারে কিছু বললে উল্টো সন্তানের স্কুলে পড়াশোনার ক্ষতির ভয়। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের কাছে কিংবা কোচিংয়ে পড়াতে হচ্ছে সন্তানকে।
ঝর্ণার বাবা রেজাউল করিম যেমন বলেন, ‘স্কুলে তো একজন শিক্ষার্থী তার পড়াটা ভালোভাবে বুঝতে পারে না। শিক্ষক ভালো করে বোঝান না। এ কারণেই প্রাইভেট ও কোচিংয়ে পেছনে ছুটতে হয়।’
স্কুলে কেন শিক্ষক ভালোভাবে পড়ান না, কখনো এর প্রতিবাদ করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম বলেন, ‘কত প্রতিবাদ করলাম। কোনো কাজ হয় না। বরং প্রতিবাদ করলে উল্টো শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিলের ভয় দেখানো হয়। কে আর যাবে প্রতিবাদ করতে! আমাদের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাই এখন এমন হয়ে গেছে। সবই গা সওয়া হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন যে- স্কুলের পাশাপাশি গৃহশিক্ষক ও কোচিং সবই বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।’
একই পরিস্থিতির কথা জানালেন মহাখালী টিঅ্যান্ডটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার রিয়ার মা সোনিয়া বেগম। তিনি বলেন, তার মেয়ের জন্যও তিনি বাসায় শিক্ষক রেখেছেন। আবার স্কুলে কোচিং করাতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে তার বাড়তি খরচ প্রতিমাসে ১০ থেকে ১৫ হা্জার টাকা।
এমন পরিস্থিতির উত্তরণ চেয়ে এই অভিভাবক বলেন, ‘বাসায় ও কোচিংয়ে যদি সব পড়তে হয় তাহলে স্কুলের কী দরকার। আর স্কুলে পড়ানো হলে কোচিং কেন?’

তিনি তার শৈশব ও কৈশোরের পড়ালেখার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আমরা যখন পড়েছি তখন তো এমন ছিল না। আমরা তো শুধু স্কুলেই পড়েছি। গৃহশিক্ষক এবং কোচিং কিছুই তখন ছিল না। আমরাও তো ভালো ফল করেছি। এখন কেন এমন?’
সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ‘শিক্ষা এখন বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে। এ কারণেই স্কুলে না পড়িয়ে কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন শিক্ষকরা। এটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। এমনটা প্রত্যাশিত ছিল না। এ থেকে উত্তরণ জরুরি। একজন শিক্ষক ক্লাসে পড়ালে কেন আবার সেই বিষয়ে শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে পড়তে হবে? গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে হবে।’ কোচিং বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই বলে পর্যবেক্ষণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর।
এ প্রসঙ্গে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবীর দুলু অভিযোগ করেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের সদিচ্ছা নেই। তিনি বলেন, ওয়েবসাইটে কোচিং বন্ধে নীতিমালা জারি করেই দায় সেরেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কোচিং বন্ধে মনিটরিংয়ের জন্য জেলা, উপজেলা ও বিভাগ পর্যায়ে যে কমিটি থাকার কথা বলা হয়েছে তা কোথাও নেই বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোচিংবাজ শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্য চালাচ্ছেন। কিন্তু কার্যত পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেই’।
কোচিং বাণিজ্য প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে মনিটরিং কমিটি কাজ করছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

কোচিং বন্ধে ২০১২ সালে নীতিমালা করে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম চলাকালীন শ্রেণিসময়ের মধ্যে কোনো শিক্ষক কোচিং করাতে পারবেন না। তবে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে শুধুমাত্র অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান প্রধান অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি বিষয়ে মেট্রোপলিটন শহরে মাসিক ৩০০ টাকা, জেলা শহরে ২০০ টাকা এবং উপজেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে ১৫০ টাকা করে রশিদের মাধ্যমে নেয়া যাবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান স্ববিবেচনায় এ হার কমাতে বা মওকুফ করতে পারবেন।
একটি বিষয়ে মাসে সর্বনিম্ন ১২টি ক্লাস হতে হবে এবং এক্ষেত্রে প্রতিটি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারবে। এই টাকা প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিয়ন্ত্রণে একটি আলাদা তহবিলে জমা থাকবে। প্রতিষ্ঠানের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সহায়ক কর্মচারীর ব্যয় বাবদ ১০ শতাংশ টাকা কেটে রেখে বাকি টাকা অতিরিক্ত ক্লাসে নিয়োজিত শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। কোনোক্রমেই এই টাকা অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে না।
কোনো শিক্ষক তার নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। নীতিমালা অনুযায়ী অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি লাগবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে লিখিতভাবে ছাত্রছাত্রীর তালিকা, রোল ও শ্রেণি উল্লেখসহ জানাতে হবে।
নীতিমালা না মানলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার এমপিও স্থগিত বা বাতিল, বেতন ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমপিওবিহীন কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরাখাস্ত ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমপিওবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার বেতন ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। মনিটরিংও জোরদার হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইনের মুঠোফোনে ফোন করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 254 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি