ফরএভারের অভিনব ফাঁদ

Print

একের পর এক প্রতারণার পরও দেশে বন্ধ হয়নি ঠকবাজ এমএলএম (বহুস্তর বিপণন পদ্ধতি) কোম্পানির দৌরাত্ম্য। রাজধানীতে এমএলএম ব্যবসার অভিনব ফাঁদ পেতেছে ফরএভার লিভিং প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এমএলএম ব্যবসা করার কোনো সনদ না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে। অধিক অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে সদস্য বানাচ্ছে সহজ-সরল তরুণ-তরুণীদের। এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনিও একই আদলে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল।
এর মাধ্যমে প্রসাধনী ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ উচ্চ দামে সদস্যদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা। আর ভবিষ্যত আয়ের আশায় তাদের সেই পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছেন বেকার যুবক-যুবতীরা।

ডেসটিনির প্রতারণা ফাঁস হওয়ার পর সরকারের দৌড়-ঝাঁপে কিছুদিনের জন্য আড়ালে চলে যায় এমএলএম কোম্পানির নামে এসব প্রতারণাকারীরা। তবে সম্প্রতি বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান। এদেরই একটি ফরএভার লিভিং প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের যে ভবনটিতে একুশে টেলিভিশনের (ইটিভি) কার্যালয় রয়েছে ওই ভবনে অফিস স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানির ব্যবসা যে বেশ রমরমা হয়ে উঠেছে তা এই অফিসে তরুণ-তরুণীদের আগমন দেখে সহজেই বোঝা যায়।
পরিচয় গোপন করে জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক সম্প্রতি ফরএভার লিভিং প্রডাক্টসের কারওয়ান বাজার কার্যালয়ে যায়। কার্যালয়ে ঢুকেই পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানটির ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার অপু কুমার শাহকে। সদস্য হওয়ার আগ্রহ দেখাতেই এই কর্মকর্তা প্রতিবেদককে তার ডেস্কে নিয়ে যায়। ফরএভারের সদস্য হয়ে কীভাবে অধিক অর্থ আয় করা সম্ভব- দিতে থাকেন সেই ছবক।
অপু জানান, ফরএভার লিভিং প্রডাক্টের সদস্য হতে প্রথমে ২ হাজার ৫০০ টাকার পণ্য কিনতে হবে। কেউ এই পরিমাণ পণ্য কিনলে তার পদবি হবে ‘নোভাস কাস্টমার’ এবং তাকে ক্রয় করা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ কমিশন দেয়া হবে। তবে পণ্য ক্রয়ের কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত কমিশন পেতে নোভাস কাস্টমারকে ফরএভারে যোগ দেয়ার দুই মাসের মধ্যে ২ সিসি বা ২৮ হাজার টাকার পণ্য কিনতে হবে।
কোনো নোভাস কাস্টমার দুই মাসের মধ্যে ২৮ হাজার টাকার পণ্য কিনলে তার পদবি বেড়ে হবে এসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার। এই পদে উপনীত হয়ে যে কেউ পণ্য কিনে ৩৫ শতাংশ কমিশন পাবেন। সেইসঙ্গে তার অধীনের নোভাস কাস্টমাররা যে পরিমাণ পণ্য কিনবেন তার ওপর থেকে পাবেন ১৫ শতাংশ কমিশন।
আর একজন এসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার হওয়ার একমাসের মধ্যে অথবা দুইমাসের মধ্যে নিজে অথবা নতুন কোনো গ্রাহক দিয়ে ২৫ সিসি পণ্য কিনলেই হয়ে যাবেন সুপারভাইজার। এই পদে উপনীত হয়ে পণ্য কিনলেই পাওয়া যাবে ৩৮ শতাংশ কমিশন। সেইসঙ্গে নোভাস কাস্টমার দিয়ে পণ্য কেনালে ১৫ শতাংশ এবং অধিনস্ত এসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজারদের বা তাদের গ্রুপের ক্রয়ের ওপর ৩ শতাংশ কমিশন পাওয়া যাবে।

সুপারভাইজার হওয়ার পর দুই মাসের মধ্যে নিজে অথবা অন্যদের মাধ্যমে ৭৫ সিসি পণ্য কিনলেই এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হয়ে যাবেন। এই পদ অর্জনকারীরা পণ্য কিনলে ৪৩ শতাংশ কমিশন পাবেন। সেইসঙ্গে নোভাস কাস্টমারের কাছে পণ্য বিক্রি থেকে ১৫ শতাংশ এবং অধিনস্ত এসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজারদের ক্রয়ের ওপর ৮ শতাংশ কমিশন পাওয়া যাবে।
এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হওয়ার পর দুই মাসের মধ্যে নিজে অথবা অন্যদের মাধ্যমে ১২০ সিসি পণ্য কিনলেই ম্যানেজার পদে পদোন্নতি হবে। এই পদবীধারীরা নিজে পণ্য কিনলে ৪৮ শতাংশ কমিশন পাবেন। সেইসঙ্গে কোনো নোভাস কাস্টমার দিয়ে পণ্য কেনালে ১৫ শতাংশ এবং অধিনস্ত এসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজারদের বা তাদের গ্রুপের কেউ পণ্য কিনলেই তার ওপর ১৩ শতাংশ কমিশন মিলবে।
পদোন্নতি ও কমিশন পাওয়ার এই বর্ণনা দেয়ার পর অপু বলেন, ২৫, ৭৫ এবং ১২০ সিসি বেশি মনে হলেও এটি অর্জন করা খুব কঠিন কিছু না। কারণ ম্যানেজার পদে উন্নীত হওয়াদের অধীনে একাধিক এসিস্ট্যান্ট ম্যনেজার, সুপারভাইজর, এসিট্যান্ট সুপারভাইজর থাকেন। তাদের পারফরমেন্স অর্থাৎ তাদের ক্রয় বা নোভাস কাস্টমারদের ক্রয়ের সুফলও পান ম্যানেজাররা। একইভাবে এসিস্ট্যান্ট ম্যনেজার, সুপারভাইজার, এসিট্যান্ট সুপারভাইজাররাও তাদের অধিনস্তদের ক্রয়ের সুবিধা পাবেন।
‘তবে নিয়মিত কমিশন পেতে প্রত্যেক পদের জন্যই মাসে কমপক্ষে ৪ সিসি পণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে নিজের ব্যবহারের জন্য কমপক্ষে ১ সিসি পণ্য কিনতে হবে। বাকি ৩ সিসি নিজেও কেনা যাবে অথবা অন্য কারও কাছে বিক্রি করতে হবে’ বলেন অপু।
ভাই আমি ডেসটিনিতে কিছুদিন কাজ করেছি এ জন্য কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের উত্তরে অপু বলেন, ‘ডেসটিনিতে কাজ করলে আপনার জন্য অধিক টাকা আয় করা খুবই সহজ হবে। আমাদের এখানে অনেকে আছেন যারা ডেসটিনিতেও ছিল। তারা ফরএভারে যোগ দিয়ে খুব দ্রুতই ম্যানেজার হয়েছেন। আপনি শুরু করেন দেখেন ম্যানেজার হতে আপনার খুব বেশি সময় লাগবে না।
এরপর অপুর কাছে ফরএভারের লিভিং প্রডাক্টেসের প্রধানের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফরএভার ওয়াল্ড ওয়াইড কোম্পানি। বাংলাদেশের প্রধান এম বদরুল ইসলাম, যার পদবি কন্ট্রিরি সেলস ম্যানেজার।
এরপর অপুর মাধ্যমে গ্রাহক সেজে এই প্রতিবেদক এম বদরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় গ্রাহক হওয়ার আগ্রহ দেখালে বদরুল ইসলাম বলেন, কাজ শুরু করে দেন। যত দ্রুত কাজ শুরু করবেন ততই লাভ। অন্যদের কাছে পণ্য বিক্রি করলে যেমন কমিশন পাবেন, তেমনি নিজে পণ্য কিনেও কমিশন পাবেন। যত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন ততই লাভ। আজ আমি প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের প্রধান, একদিন আপনিও প্রধান হয়ে যেতে পারেন। তাছাড়া পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণেরও সুযোগ পাবেন।
এরপর পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদক কথা বলে এম বদরুল ইসলামের সঙ্গে। এ সময় প্রশ্ন করা হয় এমএলএম ব্যবসার সনদ ছাড়াই আপনারা কীভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন? উত্তরে বদরুল বলেন, ‘আমরা আদালতে রিট করে ব্যবসা চালাচ্ছি।’
গ্রাহকদের অধিক আয়ের প্রলোভন দেখানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে আয়ের পথও দেখাই না ব্যয়ের পথও দেখাই না। আমরা পণ্য বিক্রির ওপর কমিশন দিয়ে থাকি। আমাদের সদস্য হলে অধিক আয় করা যাবে এমন কথা আমরা কাউকে বলি না।’
এরপর তিনি বলেন, ‘আমি এখন ব্যস্ত আছি, সব কথা মোবাইলে বলা সম্ভব না। আপনি আমাদের অফিসে আসেন সরাসরি কথা হবে।’
সরকার দেশে কোনো এমএলএম কোম্পানিকে ব্যবসা করতে লাইসেন্স না দিলেও প্রকাশ্যে প্রতারণার মাধ্যমে সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে এভাবেই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ফরএভার লিভিং প্রডাক্টস বাংলাদেশ। এর আগে নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোস্তাফিজুর রহমানের গড়ে তোলা বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিআই) ও যুব কর্মসংস্থান সোসাইটিতে (যুবক) গ্রাহকের কয়েক হাজার কোটি টাকা আটকা পড়ে। যার সমাধান আজও হয়নি। আর সর্বশেষ এমএলএম কোম্পানি গঠন করে সব থেকে বড় প্রতারণা করে ডেসটিনি।
জানা গেছে- ডেসটিনি-২০০০ নামের কোম্পানিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একযুগে (২০০০-২০১২) প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করে ৪ হাজার কোটি টাকার মতো। সেইসঙ্গে শতকোটি টাকার ওপরে বিদেশে পাচার করে।
এ বিষয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে ডেসটিনির ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরপর ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রণয়ন করা হয় মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন। এই আইনের অধীনে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে করা হয় বিধিমালা, যা আবার সংশোধন করা হয় ওই বছরেরই ২২ জুলাই। আইনে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। আর লাইসেন্স দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা করা হয় যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়কে (আরজেএসসি)।
আইনে বলা হয়, পিরামিডসদৃশ বিপণন কার্যক্রম চালানো, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মোড়কজাত না করে পণ্য বিক্রি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য বা সেবা বিক্রি না করা, পণ্য বা সেবার অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নিম্নমানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা এবং অসত্য, কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সূত্র জানায়, আইন হওয়ার পর ২০১৪ সালে ‘এমএক্সএন মডার্ন হারবাল ফুড’, ‘ওয়ার্ল্ড মিশন ২১’, ‘স্বাধীন অনলাইন পাবলিক লিমিটেড’ ও ‘রিচ বিজনেস সিস্টেম’ নামে চারটি এমএলএম কোম্পানিকে অনুমোদন দেয় আরজেএসসি। যার মেয়াদ ২০১৫ সালের ৪ মার্চ শেষ হয়েছে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকায় এই কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স আর নবায়ন করেনি আরজেএসসি। সেইসঙ্গে বন্ধ করে দেয়া হয় এমএলএম কোম্পানির নিবন্ধন। আর ফরএভার লিভিং প্রডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৪ সালে এমএলএম ব্যবসার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করলেও আরজেএসসি থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে অনুমোদন দেয়া হয়নি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 173 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ