ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা- একজন শ্বেতশুভ্র মানুষের বিদায়!

Print

ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা আর নেই খবরটা শুনবার পর মনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। একদম হঠাৎ এক ধরণের শূণ্যতা গ্রাস করেছে আমার কিংবা আমাদের মধ্যে। আমরা যারা নটরডেম কলেজের ছাত্র ছিলাম, তাদের কাছে ভীষণ প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা।

তিনি সেইসব বিরল মানুষদের একজন যিনি তার পদবীবলে নয়, ব্যক্তিত্বগুণেই ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন ছাত্রদের মধ্যে। সবচাইতে বিরল যে জিনিসটি তিনি অর্জন করেছেন সেটি হচ্ছে অকৃত্তিম শ্রদ্ধা। সব ছাত্ররাই যেন এই মানুষটার ব্যক্তিত্বের মোহে আক্রান্ত। কী অসাধারণ ক্ষমতা তার। কী মায়াবলে এতগুলো বছর ধরে নটরডেম আর নটরডেমিয়ানদের আগলে রেখেছিলেন মানুষটা।

আরামবাগের মোড়ে নটরডেম কলেজের বিস্তৃত ক্যাম্পাস এখন কেমন বোধ করছে জানি না। ফাদারদের সেই বাসভবন, যেখানে আমাদের প্রিয় বেঞ্জামিন কস্তা এতগুলো বছর কাটিয়েছেন সেই ঘরটা কি বুঝতে পারছে কি ঘটে গেছে? নটরডেমের বিশাল সবুজ খেলার মাঠ, চেনা অচেনা হাজার বৃক্ষ, বাস্কেটবলের কোর্ট, রাস্তা, ক্লাসরুম সব কিছুই ফাদার বেঞ্জামিন কস্তাকে অনুভব করবে। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, একজন নেতা, একজন অভিভাবক। তার চেয়েও বেশি হয়ত ছিলেন একজন বন্ধু।

তাকে ঘিরে হাজার হাজার গল্পেরা ঘুরে এই আরামবাগের কলেজটায়। নটরডেমের মতো সুপরিচিত একটি কলেজের প্রধান হয়েও তিনি কি সরল, নিরহংকার জীবনই না কাটিয়েছেন। বাসে করে দাঁড়িয়ে চলে যেতেন নিজের গন্তব্যে। বাহুল্য বিশর্জন করার বিশেষ গুণ ছিলো তার মধ্যে।

শিক্ষা নিয়েও তার ভাবনা ছিলো অসাধারণ। ১৯৯৯ সালে তিনি নটরডেম কলেজ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যেটা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় নটরডেম কলেজের উদ্দেশ্য।

“শীর্ষ স্থান অধিকার করার মোহ নটর ডেম কলেজের কোন কালেই ছিল না এবং আজও নেই। তার কারণ, শুধুমাত্র পরীক্ষার নম্বর দিয়ে কোন ছাত্রের মেধা বা প্রতিভা, বিদ্যা বা জ্ঞান যাচাই করা সম্ভব নয়। উপরন্তু, নটর ডেম কলেজের আদর্শ বা দর্শনের সাথে এরূপ মোহ থাকার কোন সংগতি নেই। তথাপি আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, নটরডেম কলেজে অনুসৃত শিক্ষা পদ্ধতি যথেষ্ট উন্নত।

…ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনায়াসে টাকার বিনিময়ে তাদের সন্তানদের জন্যে শিক্ষকদের কিনে নিতে পারেন। আবার অভিভাবকদের চাহিদা পূরণের জন্যেই আজকাল দেশের আনাচে-কানাচে এমন সব তথাকথিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যাকে টাকা বানানোর কারখানা বললে ভুল হবে না। আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পুঁজি করে অনেক মহলই এভাবে শিক্ষা বিস্তার বা বিদ্যা শিখানোর নামে অনেকভাবে লাভবান হচ্ছেন। যেকোন দেশের জন্য শিক্ষাকে এভাবে ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক পণ্য বা পুঁজিতে পরিণত করার মত দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে? নটর ডেম কলেজ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন।

আমরা সব সময় বলি, পরীক্ষায় নয়, আমাদের ছেলেরা কর্মজীবনে ভালো করে।”

বস্তুত আসলেই তাই। নটরডেম কলেজে যে দুই বছর কাটিয়েছি সেখান থেকে একটা শিক্ষাই পেয়েছি। ভালো রেজাল্টের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষাটি সবার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা। তিনি তার ছাত্রদের নিয়ে সবসময়ই বেশ আশাবাদী ছিলেন।

নটরডেম কলেজ কেনোমেধাতালিকায় প্রথম হয় না এরকম একটা সুর অনেকেই তোলে। সহজলভ্য এ+ এর যুগে এমন প্রশ্নের সহজ একটা উত্তর দিয়েছিলেন ফাদার বেঞ্জামিন। তিনি বলেছিলেন, “কোনটা গাছে পাকা আম আর কোনটা ফরমালিনে পাকা, সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়েই টের পাওয়া যায়।” তার কথাকে সত্যি করে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে নটরডেম কলেজের ছাত্ররা অধিক সংখ্যক চান্স পায়। কারণ, নটরডেম কলেজে শুধু এ+ এর জন্যে পড়ানো হয় না, শেখার জন্যে পড়ানো হয়। এই কলেজের পুরো শিক্ষা প্রক্রিয়ার তদারকির কাজটা দীর্ঘদিন আন্তরিকতার সাথে করেছিলেন ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা।

ফাদার বেঞ্জামিন কস্তাকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি আছে। রিজভী শেখ নামের প্রাক্তন একজন নটরডেমিয়ান ফাদার বেঞ্জামিন কস্তাকে ঘিরে একটি স্মৃতি উল্লেখ করেছেন ফেসবুকে-

“নিয়ম মাফিক ক্লাস ফাকি দিয়ে চলছিলো আমাদের সবার ক্রিকেট খেলা! কুইজে খারাপ করা এবং ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাঁদরামো করা ছিল আমাদের একমাত্র ফিক্সড রুটিন। তো খেলার এক পর্যায়ে বল চলে যায় ফাদারদের বাস ভবনের কাছে এবং আমি যাই বল ফেরত আনতে। কিন্তু কিছুদুর গিয়েই আমার রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেলো। দেখলাম, ফাদার বেঞ্জামিন বলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মনে মনে ভাবলাম, আজকেই কলেজের শেষ দিন। হয়তো আজ কোনো রক্ষে নেই।

কিন্তু এরপর যা করলেন ফাদার, তা হয়তো আমিও কোনোদিন করতাম না। নিজেই নিচু হয়ে বল তুলে নিলেন, আমাকে ছুঁড়ে মারলেন আর তার সেই চিরচেনা হাসি দিয়ে বললেন, ‘একটু সাবধানে খেলো।’

খুব সাধারন কথা, না? কিন্তু এই অমায়িক ব্যবহার, তাও একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালের কাছ থেকে, আমার জন্য খুব অসাধারণ কিছু ছিলো। এই সামান্য একটা কথা, এই সামান্য একটা কথা আমাকে বুঝতে শিখিয়েছিলো যে, এই মানুষ গুলো আমাদের উপর আমাদের চেয়েও বেশি বিশ্বাস রাখে। তাই তাদের কাছে ক্লাস ফাকি দেওয়া খুব নগণ্য বিষয়।”

প্রতিটি ছাত্রকেই তিনি ভালবাসতেন। তার প্রমাণ মিলবে সোলায়মান ইসলাম জিসানের এই স্মৃতিকথায়-

‘দিনটি ছিল ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখ। সেদিন রিকশা ধর্মঘট চলছিল। তার আগের দিন আমাদের কলেজে এইচ.এস.সি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছিল এবং আমাদের কলেজে এইচ এস সি পরীক্ষায় সারা বাংলাদেশে সেরা ফলাফল অর্জন করেছে। আমাদের কলেজ থেকে ২৯ জন বোর্ডস্ট্যান্ড করেছিল।

আমি আর আমার বন্ধু মামুন সেদিন সকালে কলেজে যাওয়ার জন্য রওনা হচ্ছিলাম। রিকশা না থাকায় একটু দূরে আরমানিটোলা বড় মাঠের সামনে যেতেই দেখি আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার ‘ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা’ ও আমার প্রিয় ইংরেজী শিক্ষক ‘ওয়ালিউল ইসলাম’ স্যার পায়ে হেঁটে আসছেন। এতো সকালে স্যাররা পুরানো ঢাকায় কি করেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না। স্যারদের কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেই স্যার বললেন, আমাদের এক মেধাবী বড় ভাই রেজাল্ট খুব খারাপ হওয়ায় ‘সুইসাইডের’ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বেঁচে গেছে। তার সাথে দেখা করে বোঝানোর জন্যই উনারা এত সকালে কলেজ শুরু হওয়ার আগেই এখানে এসেছেন। তারপর উনাদের সাথে আলাপ করতে করতেই একটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করে উনাদের সাথে কলেজে গেলাম। আমার বন্ধুরা তো অবাক প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে একসাথে এক গাড়ীতে কলেজে আসতে দেখে। কারন তখন সেটা ছিল ভাগ্যের ব্যাপার।’

একজন ছাত্র যে রেজাল্ট খারাপ হবার দরুন স্বেচ্ছায় মরতে বসেছিলো তাকে বোঝাতে তার বাড়িতে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা বলেই হয়তো সম্ভব হয়েছে। তার জায়গা অন্য কেউ হলেও হয়ত খোঁজ নিতো কিন্তু এতটা আন্তরিকতা শুধু দেখাতে পারেন ফাদার বেঞ্জামিন কস্তাই। এ কারণে তিনি অন্য সবার চেয়ে ছিলেন আলাদা, ছিলেন সবার চাইতে সেরা।

তাকে ঘিরে কত হাজার গল্প যে প্রচলিত আছে নটরডেমিয়ানদের মধ্যে তার হিসাব নেই। তার মাহাত্ম্য বলে শেষ করবার নয়। তবুও একটি গল্প উল্লেখ না করলেই চলবে না। এই ঘটনাটি বর্ননা করেছেন সাবেক নটরডেমিয়ান মহিউদ্দিন আলমগীর-

“একজন নটরডেমিয়ান ক্যাম্পাসে হাঁটছে। তার হাতে ছিল বাদামের ঠোঙা, সে বাদাম খাচ্ছে। আর বাদামের খোসাগুলো রাস্তায় ফেলে যাচ্ছিল। পুরান ক্যান্টিন থেকে হ্যারিংটন ভবনের নিচ পর্যন্ত সে চলে এসেছে। এমন সময় পিছন থেকে ডাক দিলেন কেউ একজন,

‘Good morning বাবু।’ ছাত্রটি পেছনে ঘুরে দেখে, যিনি ডাক দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন। নটরডেম কলেজের প্রিন্সিপাল স্বয়ং। ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা দাঁড়িয়ে আছেন। ছাত্রটি উত্তর দিল,

-Good morning Father, কেমন আছেন?

-আমি ভালো আছি। তুমি ভালো তো?

-জ্বী ফাদার। আমিও ভালো আছি।

-বাদামের খোসাগুলো মনে হয় তুমি ভুলে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছিলে। যাই হোক, এরকম কাজ আর করো না। কলেজটা তো আমাদের সবারই। তাই পরিস্কার রাখার দায়িত্বও সবার।

এই কথার উপর কথা চলে না। ছেলেটি সাথে সাথে বাদামের খোসাগুলো ফাদারের হাতথেকে নিয়ে যথাস্থানে ফেলে দেয়।

নটরডেমের ফাদার হয়ে তিনি নিজে রাস্তা থেকে বাদামের খোসা গুলো সরিয়ে যে দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন, সেটি প্রমাণ করে তিনি কতটা নিরংকার, সরল এবং ছাত্রবান্ধব শিক্ষক।”

ফাদার, আপনার শুন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। যেখানেই থাকেন, ভালো থাকবেন প্লিজ। দূর থেকে আমাদের জন্য স্নেহভরা আশীর্বাদ দিয়ে যাবেন। এই আশীর্বাদই তো আমাদের ছোট্ট জীবনের সবচাইতে বড় পুঁজি!

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 144 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ