ফার্মেসি এমন এক ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে একজন ফার্মাসিস্টের জ্ঞানের পরিধি থাকে অনেক বিস্তৃত তথা মেডিকেল, মার্কেটিং, কম্পিউটারসহ আধুনিক বৈশ্বিক যুগে যা কিছু প্রয়োজন তা সব-ই। যেকোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি পরিচালনা থেকে শুরু করে কাজ বাস্তবায়নের দিক থেকে ফার্মাসিস্ট অদ্বিতীয় ও অনন্য। আমাদের অনেকগুলো ভালো ওষুধ কোম্পানি আছে যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস’ অনুসরণ করে উন্নত কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখবর যে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধের বাজারকে প্রায় স্বনির্ভর করতে পেরেছে এবং যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ (MHRA), ইউরোপের ইইউ (EU), উপসাগরীয় দেশগুলোর জিসিসি (GCC), অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ (TGA), ব্রাজিলের আনভিসা (ANVISA) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (FDA) সনদসহ অনেকগুলো সনদ পেয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে পৃথিবীর ১০৬ টি দেশে (সূত্রঃ EPB, Bangladesh) ওষুধ রপ্তানি করছে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। সূতরাং, এই সেক্টরকে আরও উন্নত ও শক্তিশালী করার জন্য Potential ফার্মাসিস্টের কোন বিকল্প নেই ।

বর্তমান সময়ে ফার্মাসিস্টরা ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে তাঁদের ক্যারিয়ার গঠণে যেমনি উদগ্রীব ঠিক তেমনি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোও তাদের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে ফার্মাসিস্ট নিয়োগে তৎপর। তবে এক্ষেত্রে সাফল্য যেমন আছে তেমনি ফার্মাসিস্ট ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির একটি ব্যবধানও রয়েছে।

এ ব্যবধানের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নিম্নলিখিত কারণগুলোকে বিবেচনা করা যেতে পারেঃ

১। একাডেমিক শিক্ষা (Academic Study / Knowledge) ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দতার (Professional Skill) মধ্যে বিশাল তফাৎ ।

২। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোতে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে কম সংখ্যক ফার্মাসিস্ট দিয়ে কাজ পরিচালনা করা। ফলে সমহারে নতুন ফার্মাসিস্টদের কর্মসংস্থানের সুযোগ (Employment Opportunity) তৈরি হচ্ছে না ।

৩। ৮০/৯০’ দশকের দিকে বা তার পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের বেতন ভাতাদি সহ অন্যান্য যে ধরণের সুযোগ-সুবিধা ছিল, সেই হারে এখন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা এই ফার্মেসি শিক্ষার দিকে কম ঝুঁকছে। শুরুর দিকের চিত্রটা ছিল এমন যে, একজন ছাত্র/ছাত্রী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েও তা বাদ দিয়ে ফার্মেসি শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন ।

৪। ফার্মেসি শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্র (Practical Field) সংকোচিত হওয়ার কারণে, মেধাবী ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটরা সঠিক সুযোগ-সুবিধার অভাব ও ফার্মেসি ক্যারিয়ারের সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে Career Track পরিবর্তন করে অন্য প্রফেশনে যেমনঃ সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক সহ অন্যান্য পেশায় নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করছেন।

উপরোক্ত সীমাবদ্ধতাগুলো যদি চলতে থাকে তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফার্মা সেক্টরটি কোয়ালিটি ফার্মাসিস্টের অভাবে সঠিক দিক নির্দেশনা হারা হয়ে যেতে পারে।
এই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে ৩টি দিক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে-

১। একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থাঃ বি.ফার্ম সিলেবাসকে আরও বাস্তব ও কর্মমুখী করে গঠন করা।

২। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যবস্থাঃ বেতন-ভাতাদি সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে যথাসম্ভব অধিক সংখ্যক ফার্মাসিস্ট বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ প্রদান করা।

৩। সরকার কর্তৃক ব্যবস্থাঃ
“বাংলাদেশের প্রতিটি হসপিটালে হসপিটাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে A-Grade ফার্মাসিস্টদেরকে নিয়োগ প্রদান করা।
“একটি নীতিমালার মাধ্যমে প্রথম শ্রেণীর সরকারী চাকুরীজীবীর ন্যায় বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করা।
উন্নত দেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বিভিন্ন ধরণের Developmental Training হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও প্রথম ২০১৩ সালে ফার্মাসিস্টদের প্রফেশনাল ট্রেনিং শুরু হয় “আল-আমিন ফার্মেসি প্রফেশনাল প্রোগ্রাম (এ.পি.পি.পি)”র ব্যানারে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন নতুন ফার্মাসিস্ট তাঁর আগ্রহ (Interest) ও অনন্য প্রতিভা (Unique Talent) আবিষ্কারের মাধ্যমে সঠিক Career Path বেছে নিতে পারে। আবার অন্যদিকে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন নতুন ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করতে পারছেন।

এই উদ্যোগটি উপরোল্লিখিত ৪টি সীমাবদ্ধতার প্রথমটির পরিপূরক। এ.পি.পি.পি মূলত বাংলাদেশের নবীন ফার্মাসিস্ট ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির মধ্যে একটি ব্রিজ বা সেতু বন্ধন তৈরি করতে বদ্ধপরিকর ।

লেখক :

মোঃ আল-আমিন
এম. ফার্ম, এম.বি.এ