ফ্রি স্কুল ফ্রি নয়!

Print

রাজধানীর নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য মূলত সরকারি স্কুলগুলোর ওপরই নির্ভর করে। কারণ এসব স্কুলে পড়তে টাকা লাগে না। নিয়ম অনুযায়ী এসব স্কুলে টাকা না নেওয়ার কথা থাকলেও বেশ কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ফ্রি বলা হলেও আসলে এসব স্কুল ফ্রি নয়। এখানে পড়তেও টাকা লাগে। যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মিরপুরের পল্লবী প্রাথমিক বিদ্যালয় ফ্রি স্কুলগুলোর একটি। এ স্কুলে ভর্তির সময় নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুসন্ধান করতে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী হননি। তাদের একটাই কথা, ‘জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করতে চাই না। অভিযোগ করার পর নিজের সন্তানকে কোথায় নেবো?’

স্কুলের সামনে অপেক্ষমাণ কয়েকজনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টার পর তারা কয়েকটি অভিযোগের কথা জানালেন। তবে কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তারা জানান, এ স্কুলে অভিভাবকদের সামর্থ অনুযায়ী ভর্তির সময় ২০০-৫০০ টাকা নেওয়া হয়, বাইরের বই জোর করে কেনানো হয়। এছাড়া স্কুলে শিক্ষকরা যেভাবে শিশুদের পাঠদান করছেন তাতেও সন্তুষ্ট নন অভিভাবকরা।
এসব কর্মকাণ্ডের জন্য অভিভাবকরা ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শফিকুন নেসাকে দায়ী করেছেন। তাদের কথা অনুযায়ী, ‘উনার উচ্চ পর্যায়ে ভালো পরিচয় আছে। তাই তাকে কিছুই বলা যায় না।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে পল্লবী প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক শফিকুন নেসা, ‘আমি আমার স্কুলে ভর্তির জন্য কোনও টাকা নেই না। কোনও অভিভাবক এ অভিযোগ করে থাকলে সেটা মনগড়া।’
কেবল পল্লবী প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, রাজধানীর বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও এধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও প্রধান শিক্ষকরা এসব অভিযোগ কোনোভাবেই স্বীকার করতে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেসব স্কুলের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, ‘অভিযোগের সত্যতা রয়েছে। কেবল অতিরিক্ত ফ্রি-ই নেওয়া নয়, বোর্ডের ছয়টি বইয়ের বাইরে কোনও ‘সাপ্লিমেন্টারি’ বই রাখার সুযোগ না থাকলেও দেদারসে এসব শিক্ষার্থীদের বাইরের বইয়ের লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ এ থেকে মিলছে কিছু কমিশন।’
গৃহকর্মী মতিয়ার বানু শাহীনা তার একমাত্র সন্তানকে লেখাপড়া শেখাতে চান। তিনি শুনেছেন পল্লবী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে কোনও টাকা লাগে না। তাই এ স্কুলেই তিনি সন্তানকে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন। তবে স্কুলে গিয়ে শোনেন ভিন্ন খবর। ভর্তি করতে ৩০০ টাকা লাগবে। এরপর তিনি কাউকে কোনও কথা না বলেই ফিরে আসেন। সন্তানকে ওই স্কুলে ভর্তি করাতে পারেননি তিনি।
​​তিনি বলেন, ‘একবার ভর্তি করলে একের পর এক টাকা চাইতে শুরু করবে স্কুল। তখন থাকলে পরবর্তীতে আমি টানতে পারবো না। আর তখন বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসলে ওর মন খারাপ হবে। তাই এ বছর খোঁজখবর নিয়ে পরের বছর অন্য কোথাও ভর্তি করাবো।’
ফ্রি স্কুল
মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী এলাকায় ২০টির বেশি সরকারি স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলের বেশ কয়েকটিতে ঘুরে দেখা গেছে, খুব সামান্য পরিমাণে হলেও এসব স্কুলেও ভর্তি করাতে টাকা লাগে। তবে প্রতি সেশনেই যে সেটা নেওয়া হয় তা নয়। অভিভাবক বা শিক্ষকরা কেউই এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের নাম প্রকাশ করে কিছু বলার সুযোগ নেই। কিন্তু সরকার যে বিশাল লক্ষ্য নিয়ে বিনা বেতনে স্কুলগুলোতে পড়ার সুযোগ করে দিতে চেয়েছে তা সফল হয়নি। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের জন্য। আসলে সত্য হলো, ঢাকার কোনও ফ্রি স্কুলই ফ্রি না।’
​​মিরপুর-১ এর ওয়াকাফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এই স্কুলে ড্রইং, ব্যাকরণ বইয়ের মতো সাপ্লিমেন্টারি বই স্কুলের শিক্ষার্থীদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নিয়মানুযায়ী, বোর্ডের নির্ধারিত ৬টি বইয়ের বাইরে কোনও বই শিক্ষার্থীদের দেওয়ার বা পড়ানোর কোনও নিয়ম নেই। এমনকি এই স্কুলেও ভর্তি ও পরীক্ষার ফি বাবদ ৫০ থেকে ১৫০ টাকা গুনতে হচ্ছে অভিভাবকদের।
বাড়তি কোনও টাকা নেওয়া বা সাপ্লিমেন্টারি বই দেওয়া নিষেধ থাকার পরও কেন এই কাজগুলো করা হচ্ছে এমন প্রশ্নে স্কুলের প্রধান শিক্ষক কোনও কথা বলতে রাজি হননি। তবে সহকারী এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের এগুলো করা একেবারেই নিষেধ। এই স্কুলগুলোতে সাধারণত কম আয়ের মানুষেরা তাদের সন্তানদের পড়িয়ে থাকে। কিন্তু অন্যায়ভাবে টাকা নিতে দেখেও আমাদের চুপ থাকতে হয়।’
এধরনের অভিযোগ কখনও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসেছে কিনা-জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান বলেন, ‘এ ধরনের ৬৫ হাজার স্কুল আছে। কোথায় কী ঘটছে সব খোঁজ পাওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা খবর পেলে সেটি অনুসন্ধান করি এবং নিজেদেরও কিছু মনিটরিং ব্যবস্থা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের অনিয়ম যে কোথাও কোথাও হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। তবে লিখিত অভিযোগ করলে আমাদের ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা পরের দিনই সেটি অনুসন্ধান করতে পাঠাতে পারি।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 142 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ