বজ্রপাতে সাবধানতা ও করণীয়?

Print

বজ্রপাত হল প্রকৃতির একটি ভংঙ্কর দৃশ্য। এই দৃশ্যের একই সাথে রয়েছে আতঙ্ক এবং সৌন্দর্য। যা একটা বিরল ঘটনা। তাই তো মেঘের এ গর্জন নিয়ে কবি সাহিত্যিকরা কবিতা গান উপন্যাস রচনা করেছেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরাসরি সতর্ক  করেছেন নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে। ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা উপন্যাসের শুরুতেই বজ্রপাতে হারুর পুড়ে কয়লা হবার ছবি পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে। এই বজ্রপাতই এখন দেশের নতুন দুর্যোগ। ইদানীং বজ্রপাত বাংলাদেশের কাছে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

কারণ আমাদের দেশে নিয়মিত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, অব্যাহতভাবে বড় বড় বৃক্ষ নিধনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত গাছ লাগানো হচ্ছে না। তাই ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াসহ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রাথমিক সম্ভাব্য কারণগুলো গাছ কেটে ফেলা, মোবাইল ফোনের ব্যবহার, জলাভূমি ভরাট করা, নদী শুকিয়ে যাওয়া, কলকারখানা ও মোটরগাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি কাজে ভারী যন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি হতে পারে।

 

এদিকে গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ২ হাজার ৩৫৬ জন। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। বজ্রাঘাতে গবাদিপশু মারা পড়েছে অসংখ্য।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগা ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। অথচ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১১০ ভোল্ট বিদ্যুৎ যথেষ্ট।

এ ছাড়া বজ্রপাত সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির এক গবেষণার তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০ বার বজ্রপাত হয়। আবহাওয়াবিদরা জানান, সাধারণত চৈত্র মাস থেকে শুরু করে গ্রীষ্ম মৌসুম জুড়ে (চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) ও আষাঢ়ের প্রথম দিক পর্যন্ত আকাশে অসংখ্য বজ্রপাত হয়ে থাকে। এ সময় বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর হারও স্বাভাবিক কারণে বেশি।

অন্যদিকে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা। বিশেষ করে বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়াতে জলীয় বাষ্পের মেঘের ফরমেশন আগের তুলনায় বেড়েছে। ঠাণ্ডা বাতাস আর গরম বাতাস যখন একসাথে মিলিত হয় তখন ঠাণ্ডা বাতাস উপরের দিকে উঠে যায়। এই ঘটনা এখন বাড়ছে কারণ জলীয় বাষ্প এখন আরও বেশি আসছে। বৃক্ষ নিধনের কারণে আগে গাছ-পালার উপর বজ্রপাতের যে প্রভাব পড়ত সেটি এখন সরাসরি মানুষের উপর এসে পড়ছে।

কিভাবে বজ্রপাত–     আমরা জানি বাতাস বিদ্যুৎ অপরিবাহী, তাহলে বজ্রপাত কিভাবে হয়? মেঘের শক্তিশালী বিদ্যুৎ ক্ষেত্র তার চারপাশের বাতাসের অপরিবাহী ধর্মকে নষ্ট করে দেয়, যাকে বলে ড্রাইলেট্রিক ব্রেকডাউন। মেঘের বিদ্যুৎ ক্ষেত্র যখন শক্তিশালী হয় তখন তার চারপাশের বাতাস পজেটিভ এবং নেগেটিভ চার্জে বিভক্ত হয়ে যায়। তখন বাতাস আয়োনিত হয়ে মেঘ এবং ভূ-পৃষ্টের মধ্যে বিদ্যুৎ চলাচলের পথ তা শর্ট-সার্কিট তৈরি করে দেয় এবং বজ্রপাত ঘটায়।

বাড়ছে বজ্রপাত

প্রকৃতির আপন নিয়মের ধারায় বজ্রপাত আগেও ছিল। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। তবে বাংলাদেশেও বজ্রপাতের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মে মাসের আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছে, দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২-৩ দিন বজ্রসহ মাঝারি থেকে তীব্র আকারে কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় এবং দেশের অন্যত্র ৩-৪ দিন হালকা থেকে মাঝারি আকারে কালবৈশাখী বা বজ্রঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত মে মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে শুষ্ক ও গরম আবহাওয়ায় হঠাৎ আকাশে মেঘ জমলে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি হয়ে থাকে। খোলা মাঠে-ময়দানে, বিলে, হাওর-বাওরে, নদীতে খোলা জায়গায় বজ্রপাত সরাসরি আঘাত করতে পারে এবং এতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি।

এর ফলে প্রধানত কৃষক-কিষাণী, জেলে ও মাঝি-মাল্লা, শ্রমজীবি, পথচারীসহ খোলা জায়গায় বিচরণকারী মানুষ বজ্রপাতের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। তাই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন গুমোট হয়ে আসলে কিংবা বৃষ্টির সময় এ ধরনের খোলামেলা জায়গা এড়িয়ে বাড়িঘরে নিরাপদ স্থানে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞগণ। বিভিন্ন হিসাব মতে গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ২ হাজার ৩৫৬ জন। এরমধ্যে বিগত ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১৩ সালে ২৮৫ জন, ২০১৪ সালে ২১০ জন, ২০১৫ সালে ২৭৮ জন এবং গতবছর (২০১৬) এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫০ জন।

যন্ত্রপাতি সংগ্রহ তালগাছথেরাপি

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রযুক্তিতে বজ্রপাত বজ্রঝড়ের ‘আশঙ্কা’র পূর্বাভাস দেয়া যায়। কিন্তু বজ্রপাতের ক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ও সুনির্দিষ্টভাবে আধুনিক প্রযুুক্তিতে পূর্বাভাস দেয়ার ব্যবস্থা নেই। এর জন্য দেশে উন্নততর প্রযুক্তিরনে বজ্রপাত নিরোধক ও আগাম সংকেত প্রদানকারী যন্ত্রপাতি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে একদল কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। দেশে হাওর, বিল বাওর এলাকায় খোলা জায়গা বেছে বেছে সরকারি উদ্যোগে ১০ লাখ তাল গাছ লাগানোর কাজ চলছে। বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এসবের পাশাপশি ঢাকায় এবং হাওর অঞ্চলে বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপনের কাজে হাত দেয়া হবে শিগগিরই।

আবহাওয়া বিভাগ বলছে, বজ্রপাত থেকে রক্ষায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের অ্যাপস থেকে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগেই বজ্রপাত, বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাবে। গুগল প্লে স্টোরে (ইগউ ডবধঃযবৎ অঢ়ঢ়) অ্যাপসটি পাওয়া যাবে। অ্যাপসটি ডাউনলোড করে মোবাইল ফোনে ইনস্টল করলে যে যে জেলায় বজ্রপাত হওয়ার আশংকা রয়েছে সেখানে থান্ডারস্ট্রম নোটিফিকেশন লেখা থাকবে। তাছাড়া ‘১০৯৪১’ নাম্বারে কল করে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পূর্বে বজ্রপাতের তথ্য পাওয়া যাবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ অশোক কুমার সেনগুপ্ত বলেছেন, বজ্রপাত প্রাকৃতিক ঘটনা। বাংলাদেশে মে-জুলাইয়ে শুষ্ক আবহাওয়ায় বজ্রপাত হয় বেশি। ভরা বর্ষায় বজ্রপাত কম হয়। সাধারণ কিছু সতর্কতা মেনে চললে এই দুর্যোগে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। আমাদের দেশের মতো অনুন্নত দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুহার বেশি। কেননা বাইরে খোলামেলা জায়গায় থাকা কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি। বজ্র নিচের দিকে নেমে আসার অল্পক্ষণ আগে (কেউ বাইরে থাকলে) শরীরের লোম, চুল হঠাৎ খাড়া হয়ে উঠতে পারে, যা বজ্রপাতের পূর্ব-লক্ষণ। তখনই দৌড়াদৌড়ি না করে দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা গুঁজে (মাতৃজটরে থাকা সন্তানের মতো) থাকলে বিপদ এড়ানো যেতে পারে। বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে। ধারে কাছে কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও বিপদের শঙ্কা আছে।

তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের দেয়া আরও পরামর্শের মধ্যে রয়েছে-

১) আকাশে ঘনকালো মেঘ দেখা দিলে বজ্রপাতের আশংকা তৈরি হয়। ৩০-৪৫ মিনিট বজ্রপাত স্থায়ী হয়। এ সময় ঘরে অবস্থানই নিরাপদ।

২) ঘনকালো মেঘ দেখা দিলে খুব প্রয়োজন হলে রাবারের জুতা পরে বাইরে যাওয়া যেতে পারে।

৩) বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকা নিরাপদ নয়। গাছের তলায় থাকা বিপজ্জনক।

৪) যতদ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। টিনের চালা এড়িয়ে যেতে হবে।

৫) উঁচু গাছপালা বৈদ্যুতিক তার ধাতব খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। পরিহার করতে হবে ধাতব মাথা বের করে থাকা ছাতা। প্লাস্টিক বা কাঠের ছাতা ব্যবহার করা যাবে।

৬) বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে অবস্থান করলে গাড়ির ধাতব অংশের সাথে শরীরের সংযোগ ঘটানো যাবে না। সম্ভব হলে গাড়িটি নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।

৭) এ সময় বাড়িঘরে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দা পরিহার করতে হবে। বাড়ির জানালা বন্ধ রাখতে হবে এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ধাতব কল, সিঁড়ি, পাইপ স্পর্শ না করা নিরাপদ।

৮) বজ্রপাতের সময় সমুদ্র সৈকতে থাকা এবং ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে যাওয়া নিরাপদ নয়। তবে এ সময় নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করা উচিত। পানি থেকে দূরে থাকতে হবে।

৯) প্রত্যেকটি ভবনে বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপন ও আর্থিং ব্যবস্থা থাকা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে হাওর এলাকা এখন বজ্রপাতের প্রধান ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বেশি। এই বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতিও চলছে। ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম থেকে কিছু কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয়েছে। প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা একটি প্রকল্প তৈরির কাজে নিয়োজিত আছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকাসহ চিহ্নিত কিছু জায়গায় বাড়ির ছাদে বজ্রপ্রতিরোধক টাওয়ার স্থাপন করা হবে। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-আইনে এই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করে বিধান রাখার নির্দেশনা দেওয়া হবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে সরকার বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস করতে সারা দেশে বিশেষ করে ফাঁকা অঞ্চলে ১০ লাখ তাল গাছ লাগানোর  প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 558 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ