বাংলাদেশি পাসপোর্ট এখনো কম দামি

Print

বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাওয়ার যাত্রা শুরু করেছে, তখনো বিশ্ববাসীর কাছে এ দেশের পাসপোর্টের দাম খুবই কম। পর্যটক হিসেবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আগে থেকে ভিসা না নিয়ে ঢুকতে পারে বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশে। দেশগুলো এশিয়া মহাদেশের।

পাঁচ দেশের মধ্যে আবার শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ—এই চারটিই হচ্ছে নিকটতম প্রতিবেশী, দক্ষিণ এশিয়ার এবং সার্কের সদস্য। বাকি দেশটি ইন্দোনেশিয়া।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ভিসা ছাড়া বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের যাওয়ার যে তালিকা গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে দিয়েছেন, তা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশি পর্যটকদের তাদের দেশের এয়ারপোর্টে আগমনী (অন অ্যারাইভাল) ভিসা দেয় ৩০ দিনের জন্য। এ ছাড়া মালদ্বীপ ৯০ দিনের এবং ভুটান ১৫ দিনের ভিসা দেয় বাংলাদেশি পর্যটকদের।

তবে দ্বিপক্ষীয় ভিসা চুক্তির আওতায় কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্টধারী বাংলাদেশিরা যেতে পারেন মোট ২১টি দেশে (পাঁচটিসহ)। বেশির ভাগই এশিয়া মহাদেশের। দেশগুলো হচ্ছে ভারত, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, চীন, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, লাওস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, বেলারুশ, কুয়েত, রাশিয়া, জাপান ও চিলি।

কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্টধারী বাংলাদেশিদের ভিসা ছাড়া ঢুকতে দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ইউরোপের রয়েছে মোট তিনটি দেশ—রাশিয়া, বেলারুশ ও তুরস্ক। দক্ষিণ আমেরিকায় রয়েছে একমাত্র দেশ চিলি। এর মধ্যে রাশিয়া ৩০ দিন ও অন্য তিন দেশ সর্বোচ্চ ৯০ দিনের আগমনী ভিসা দেয়। জাপান অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীদের ঢুকতে দেয় না, তবে ৯০ দিনের জন্য ঢুকতে দেয় শুধু কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী বাংলাদেশিদের।

মোট ২১ দেশ ধরে হিসাব করলে ৯টি দেশ ৯০ দিন, ১টি দেশ ৪৫ দিন, ৯টি দেশ ৩০ দিন ও ১টি দেশ ১৫ দিনের আগমনী ভিসা দেয় বাংলাদেশিদের। আগমনী ভিসায় চীন কত দিনের জন্য কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীদের ভিসা দেয়—পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তালিকায় তার কিছু উল্লেখ নেই।

বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৩ হাজার ৭৯৮ জন সাধারণ পাসপোর্টধারী রয়েছেন। এর বাইরে সরকারি কর্মচারী বা অফিশিয়াল পাসপোর্টধারী রয়েছেন ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৯৫ জন এবং কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী রয়েছেন ৫ হাজার ৩৬৭ জন।

জানতে চাইলে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিসার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জড়িত। বাংলাদেশকে আরও বেশি দেশ আগমনী ভিসা দেবে, যদি আমরা আরও উন্নত দেশ হতে পারি।’

সর্বনিম্ন ১০-এর তালিকায় বাংলাদেশ

বৈশ্বিক ভিসামুক্ত চলাচল স্বাধীনতার ওপর এক যুগ ধরে গবেষণা ও সূচক প্রকাশ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা দ্য হ্যানলি অ্যান্ড পার্টনারস। বিশ্বের ২০১টি দেশের ওপর পরিচালিত ২০১৭ সালের সূচকে দেশগুলোর ১০৪তম পর্যন্ত মান বা অবস্থান নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) ভ্রমণ তথ্যভান্ডারের সহযোগিতা নিয়ে হ্যানলি অ্যান্ড পার্টনারস এই সর্বশেষ সূচকটি তৈরি করে। মান বা অবস্থানের পাশাপাশি দেশওয়ারি নম্বরও (স্কোর) দেওয়া রয়েছে এই সূচকে। এই নম্বর হচ্ছে একটি দেশ আগে থেকে ভিসা ছাড়া অর্থাৎ আগমনী ভিসা নিয়ে কতটি দেশে যেতে পারেন, তার নির্দেশক।

সে অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে কম দামি পাসপোর্টধারী দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান। দেশটির অবস্থান সর্বনিম্নতম অর্থাৎ ১০৪তম। আফগানিস্তানের মানুষ আগমনী ভিসা নিয়ে যেতে পারে মোট ২৪টি দেশে।

এ ছাড়া ১০৩তম অবস্থানে ইরাক; ১০২তম পাকিস্তান; ১০১তম সিরিয়া; ১০০তম সোমালিয়া; ৯৯তম লিবিয়া, ৯৮তম ইরিত্রিয়া ও ইয়েমেন; ৯৭তম নেপাল, ফিলিস্তিন ও সুদান; ৯৬তম ইথিওপিয়া, কসোভো, লেবানন ও দক্ষিণ সুদান এবং ৯৫তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, ইরান ও শ্রীলঙ্কা।

হ্যানলি অ্যান্ড পার্টনারসের তথ্য অবশ্য বলছে, বাংলাদেশের মানুষ আগমনী ভিসা নিয়ে যেতে পারে ৩৮টি দেশে।

বাংলাদেশের চেয়ে দুই ধাপ ওপরে অর্থাৎ ৯৩তম অবস্থানে রয়েছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের মানুষ আগমনী ভিসায় যেতে পারে ৪১ দেশে। ভারতের অবস্থান ৮৭তম, এ দেশের মানুষ যেতে পারে ৪৯টি দেশে। ভুটানের অবস্থান ভারতের চেয়েও ভালো, ৮৫তম। ভুটানের মানুষ পারে ৫১টি দেশে যেতে। ভুটান ও চীন আবার একই অবস্থানে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থান মালদ্বীপের। তাদের অবস্থান ৬০তম। মালদ্বীপের মানুষ আগমনী ভিসায় যেতে পারে ৮০টি দেশে। তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশ কুয়েতের অবস্থানও নেপালের সমান।

শীর্ষ ১০-এ ২৮ দেশ

হ্যানলি অ্যান্ড পার্টনারসের সূচক অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দামি পাসপোর্টধারী দেশ জার্মানি। জার্মানির লোকেরা আগে থেকে ভিসা না নিয়ে যেতে পারে ১৭৬টি দেশে। ১৭৫ দেশে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে সুইডেন রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ৫টি দেশ—ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র; দেশগুলোর নাগরিকেরা ১৭৪টি দেশে যেতে পারে। চতুর্থ অবস্থানে ৮ দেশ—অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্য।

এ ছাড়া পঞ্চম অবস্থানে আয়ারল্যান্ড, জাপান ও নিউজিল্যান্ড; ষষ্ঠ অবস্থানে কানাডা, গ্রিস, পর্তুগাল ও সুইজারল্যান্ড; সপ্তম অবস্থানে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া; অষ্টম অবস্থানে আইসল্যান্ড; নবম অবস্থানে চেক রিপাবলিক এবং ১৬৭ দেশে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে দশম অবস্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি ও মাল্টা।

বাংলাদেশিদের কাছে বেশি পরিচিত দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের অবস্থান ২৪তম, তুরস্ক ৫২তম, থাইল্যান্ড ৬৭তম, সৌদি আরব ৬৮তম এবং ফিলিপাইন ৭৫তম অবস্থানে রয়েছে। ফিলিপাইনের মানুষেরা আগমনী ভিসায় যেতে পারে ৬১টি দেশে।

ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে আগমন

বিনা ভিসায় বাংলাদেশে যাঁরা আসেন, তাঁদের ৩০ দিনের জন্য আগমনী ভিসা দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ১৯টি দেশ এবং ইউরোপের সব দেশের (৫১ দেশ) নাগরিকই বাংলাদেশের কাছে আগমনী ভিসা পায়।

অবশ্য তাঁরা যদি সরকারি কাজে, ব্যবসায়, বিনিয়োগ ও পর্যটনের উদ্দেশে বাংলাদেশে আসেন, তবেই তা দেওয়া হয়। ভিসার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বা বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (বেপজা) থেকে নেওয়া প্রত্যয়নপত্র লাগতে পারে।

যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, যেসব দেশ থেকে যাঁরা বাংলাদেশে আসবেন এবং বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাস, জাতিসংঘ ও এর অঙ্গসংগঠনের কর্মকর্তারাও আগমনী ভিসা পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক, তাঁদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদেরও দেওয়া হয় এ ভিসা।

আরও দেশে যেতে পারেন বাংলাদেশিরা!

সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন, তার বাইরেও কিছু দেশে ভিসা ছাড়া অর্থাৎ আগমনী ভিসা নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকেরা যেতে পারেন বলে জানা গেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে দেশগুলোর কিছু শর্ত থাকে, যা পূরণ করতে হয়। এ দেশগুলোর সঙ্গে সরকারের কোনো দ্বিপক্ষীয় ভিসা চুক্তি নেই বলেই সংসদে দেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্যেও কিছু বলা হয়নি।

কেনিয়ার নাইরোবিতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সম্মেলন কাভার করতে গিয়েছিলেন যেসব সাংবাদিক, তাঁরা আগমনী ভিসা পেয়েছিলেন বলে প্রথমআলোকে জানান।

ঢাকায় বেসরকারি কিছু ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ‘ভিসা থিং’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, ঢাকায় দূতাবাস নেই এমন ৭০টি দেশের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের কাজও করছে তারা।

অর্থাৎ বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে আগমনী ভিসা পায় বলে সরকার বলছে, তার বাইরেও কিছু দেশ রয়েছে, যারা বাংলাদেশিদের এ ভিসা দিয়ে থাকে। দেশগুলোর বেশির ভাগই অবশ্য আফ্রিকার। এগুলো হচ্ছে জিবুতি, মাদাগাস্কার, মোজাম্বিক, টোগো, উগান্ডা, লেসোথো, ভানুয়াতু, গাম্বিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, হাইতি, বারবাডোস, বাহামা ইত্যাদি।

ভিসা থিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস মোত্তাকিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি তালিকাই ঠিক আছে। তবে যাঁদের পাসপোর্ট ভারী অর্থাৎ যাঁরা অনেক দেশে গিয়েছেন, তাঁরা সরকারি তালিকার বাইরেও অনেক দেশে যেতে পারেন। আমরা অনেকের কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণ করেছি এবং এখনো করছি।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 130 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ