বাংলাদেশের বাকেট লিস্ট

Print

ধূপ্পানি ঝর্ণা

সাখাওয়াত হোসেন সাফাত

এখনো পেরোয়নি তারুণ্যের চৌকাঠ। তবে ভয় কী দুর্গমের আহ্বানে ছুটে যেতে? তাই তারুণ্যের জোয়ার উদযাপন করুন ভ্রমণের নেশায় মেতে উঠে। এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। যৌবন, তারুণ্য জীবনের এক স্বর্ণসময়। আর তারুণ্যের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই এক সময় আমরা স্বাধীন করেছিলাম আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে। আর এখনকার তারুণ্য? কী করতে পারে তারা? দেশমাতৃকায় লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য বের করে আনতে বেড়িয়ে আসতে পারেন দেশের নানা প্রান্ত। তাই অ্যাডভেঞ্চার আর তারুণ্য যেন একই সুতোয় গাঁথা দুটি শব্দ। দেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের দেশের কোন দিকগুলো ঘুরে আসা উচিত? কী থাকা উচিত আপনার ট্র্যাভেল বাকেট লিস্টে? চলুন দেখে নিই এমন দশটি স্থানের বিশদ বর্ণনা।

 

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড

জায়গার নাম শুনেই মনে হচ্ছে, বিদেশি কোনো স্থান, তাই না? কিন্তু না। অবাক করা হলেও সত্যি, বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে গভীর একটি অংশের নাম সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, যেখানে কিনা বড় বড় তিমির বসবাস! তাও আবার বাংলাদেশে? হ্যাঁ,কল্পনাতীতই বটে। এ ছাড়াও দেখা মিলবে ইরাবতী ডলফিন ও প্রচুর পাখির। তার জন্য আপনাকে অবশ্যই হতে হবে অপরিসীম ধৈর্যশীল। এমনও হতে পারে, দুই দিন হয়ে গেছে কিন্তু দেখা মিলল না কাক্সিক্ষত তিমির। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের সর্বমোট এলাকা প্রায় ৩৮০০ বর্গকিলোমিটার। গভীরতা ১০ মিটার থেকে ১০০ মিটার। যদি দেশের অমিত সুন্দর এই জায়গাটি দেখা ও তিমি-ডলফিনের সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা থাকে তো নিজেই উদ্যোগ গ্রহণ করে চলে যেতে পারেন।

 

মিশন ঝরনা

এক অদ্ভুত নেশা হতে পারে ঝরনা ও জলপ্রপাত দর্শন। একবার এই নেশায় ঢুকে গেলে শত বাধা-বিপত্তিও ভ্রমণকারীদের ঠেকাতে পারে না। বিশাল পাহাড়, বিপজ্জনক ঝিরিপথ, খাড়া ঢাল পার হয়ে ভ্রমণকারীরা তাই প্রতিনিয়ত বের করছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকা (বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম) বিভিন্ন রকমের ঝরনার খোঁজ। কিছুটা অ্যাডভেঞ্চার চাইলে ঘুরে আসতে পারেন সীতাকু- ইকো পার্কের সুপ্তধারা, ছোট দারোগারহাটের সহস্রধার-১ বা মূল সহস্রধারা; খাগড়াছড়ির হাজাছড়া, মিরসরাইয়ের বান্দরখুম, বাঘবিয়ানী হাঁটুভাঙা আর মিরসরাইয়ের বারতাকিয়াতে অবস্থিত বাংলাদেশের আট স্তরের একমাত্র ঝরনা খইয়াছড়াতে। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে মৌলভীবাজারের হামহাম, বান্দরবানের লুংলাক ঝরনা। এরপর আসা যাক দেশের সবচেয়ে সুন্দর ঝরনা বান্দরবানের জাদিপাই, খাগড়াছড়ির তৈদুছড়া ১ ও ২, খাগড়াছড়ির সিজুক ১ ও ২, বান্দরবানের জিনাপাড়া বা ক্রাইক্ষ্যংহ্লোম ঝরনায়। এসব জায়গায় যেতে হলে দরকার আরো বেশি শারীরিক সক্ষমতা। আর একেবারে মাত্রাতিরিক্ত অ্যাডভেঞ্চার চাইলে যেতে হবে বান্দরবানে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে উঁচু ঝরনা বাক্লাই (৩৮০ ফুট), জিংসামসাইতার, প্রাতাপাড়া ঝরনা, লেইক্ষ্যংম্রোং (২৮০ ফুট আনুমানিক), সাদরা ঝরনা, ফাইপি ঝরনা)

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ঝিরি ধূপপানি  ঝরনায় যেতে পারেন। এ ছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে এত ঝরনা আছে নাম বলে শেষ করা যাবে না। আপনার দেখার তালিকায় আছে কয়টি? যেগুলো দেখা হয়নি তা দেখতে আজই বেরিয়ে পড়–ন ঝরনার খোঁজে। কে জানে! হয়তো আপনিই বের করে ফেলতে পারেন নতুন কোনো ঝরনার ঠিকানা।

Chor KukriMukri

জলপ্রপাতের খোঁজে

দেশের বাইরের বড় বড় জলপ্রপাতের নাম তো অহরহই আমরা শুনি। বাংলাদেশের কোনো জলপ্রপাতে গেছেন কি? দেশের সবুজের সমারোহের মাঝে সুন্দর কিছু জলপ্রপাতের মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের নাফাখুম, আমিয়াখুম ও রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে অবস্থিত চ্যাঁদলাং। এগুলোর মধ্যে নাফাখুম ও চ্যাঁদলাং যেতে দরকার ছোটখাটো অ্যাডভেঞ্চার আর আমিয়াখুম যেতে দরকার একটু বড় অ্যাডভেঞ্চার।

Lauachora forest

লাউয়াছড়া জঙ্গলে বৃষ্টিভেজা ট্র্যাকিং

লাউয়াছড়া জঙ্গলে অনেকেই গেছেন। পাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ঘন জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু আপনি কি লাউয়াছড়া জঙ্গলের ঘন গভীরে ঝিরিপথ ধরে ট্রেকিং করেছেন? তাও আবার বর্ষাকালে? যদি না করে থাকেন তো আজকেই তা টুকে রাখুন আপনার বাকেট লিস্টে। পঞ্চাশের দশকের মতো ভালুক আর চিতাবাঘ যদিও এখন দেখা যায় না, তবে উল্লুক, বানর, নানা প্রজাতির মাকড়সা আর বিবিধ প্রকার সাপ, চিনেজোঁক আপনার পথ মনোরঞ্জন করতে বাধ্য।

Cave

গুহায় রাত্রিযাপন

গুহায় রাত্রিযাপন! এ আবার কেমন কথা! কিন্তু হ্যাঁ! প্রকৃত অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পেতে হলে একটি বারের জন্য হলেও গুহায় রাত্রিযাপন করতে হবে আপনাকে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক গুহাগুলোর মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের আলীকদম, খাগড়াছড়ির আলুটিলা এবং টেকনাফের কুদুম গুহা। কুদুম গুহাকে আবার বাদুড়ের গুহাও বলা হয়। এই শীতকালই গুহায় থাকার জন্য উপযুক্ত সময়। তবে আর দেরি কেন? প্রকৃত ভ্রমণের স্বাদ নিতে একটু সাহস নিয়ে চলেই যান।

 

রাইখং লেক পুকুরপাড়া

অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষদের জন্য চমৎকার হতে পারে এই দুটি জায়গা। দুর্গম পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তা আর খাল পার হওয়ার মতো মানসিক ও শারীরিক শক্তি যাদের আছে তারাই এই জায়গাগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে পারেন। রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত হলেও রাইখং লেক দেখতে হলে বান্দরবান হয়ে যেতে হবে। বগা লেক থেকেও ১০-১২ ঘণ্টার হাঁটা পথ। সেই সঙ্গে খাল আর পাহাড় পার হতে হয়। তবে এর সৌন্দর্য আপনার পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। আর পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা ত্রিপুরা অধ্যুষিত গ্রাম পুকুরপাড়াও ঠিক তাই।

Chor Tojumuddin

দ্বীপ চরের হাতছানি

প্রকৃতির অঢেল সৌন্দর্যের নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশে রয়েছে অনেকগুলো দ্বীপ ও চর, যেমন চর কুকরী-মুকরী, চর তমিজউদ্দিন, চর তুফানিয়া, নিঝুম দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, দুবলারচর, মনপুরা, চর গজারিয়াসহ নাম না জানা কত দ্বীপ আর চরের সমাহার! এসব চর থেকে যেমন আপনি দেখতে পাবেন চরাঞ্চলের মানুষের জীবনগাথা, ঠিক তেমনি উপভোগ করতে পারবেন সমুদ্রের মতো উত্তাল জীবনের সঙ্গে বেঁচে থাকার নানা দিক। তবে এসব স্থানে বর্ষাকালে না যাওয়াই ভালো।

Lalon Mela Kustia

ৎসবের দেশ বাংলাদেশ

রাসলীলা, বুদ্ধপূর্ণিমা, দুর্গাপূজা, লালন মেলা (কুষ্টিয়া, মুন্সীগঞ্জ), বৈশাখী মেলা, যাত্রাপালা, সার্কাস (এখনো উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় আসল রূপ দেখা যায়), পাহাড়িদের বিজু উৎসব, শাঁখারীবাজারের হোলি উৎসব, ঈদ, শীতকালের পিঠা মেলা, চট্টগ্রামের জব্বারের বলীখেলা বা কুস্তি, রাখের উপবাস, মাঘীপূর্ণিমা, ময়মনসিংহের ছটপূজা, বৈসাবি উৎসব, হেমন্ত ও বসন্ত বরণ উৎসব, উপজাতিদের জলকেলি, পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসব, জন্মাষ্টমীর মিছিল- আর কী জানতে চান? হ্যাঁ, প্রতিটিই আমাদের দেশের প্রাণের উৎসব। এখনই হিসাব করে নিন আপনি কয়টিতে গিয়েছেন আর কয়টি বাকি আছে?

Snorkelling at saintmartin

সেন্টমার্টিনে সমুদ্রতলের জীবন

মাটির ওপরেই শেষ নয়; এবার ঘুরে আসা যাক সমুদ্রের তলদেশ থেকে। বাইরের দেশে নয়, আমাদের আপন সেন্টমার্টিনেই এখন করতে পারেন স্কুভা ডাইভিং কিংবা স্নোর্কেলিং। একটু সময় নিয়ে গিয়ে দেখে আসুন সমুদ্রের তলদেশে আপনার জন্য কী চমক অপেক্ষা করছে!

Rema Kalenga

রেমা কালেঙ্গা

প্রথম নামটির মতো শেষেও থাকছে অদ্ভুত নামের এক জায়গার কথা। হ্যাঁ, জায়গাটির নাম রেমা কালেঙ্গা। আমাদের দেশের অনেকেই স্থানটি সম্পর্কে জানেন না। রেমা কালেঙ্গা হলো বাংলাদেশের বৃহত্তম পাহাড়ি বন। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় ভারত সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ১৭০০ হেক্টর আয়তনের এই রিজার্ভ ফরেস্ট। এই বনে চিতা ও কালো ভালুকের উপস্থিতির কথা অনেক সময় শোনা যায়। তবে সিলেটের আর সব বনের মতো বানর, বন্য শূকর, হনুমান, জায়ান্ট কালো কাঠবিড়ালি, মেছোবাঘ আর উল্লুকই এখানকার প্রধান প্রাণী। এ ছাড়াও আছে নাম না জানা অনেক পাখি ও বিভিন্ন রকমের সাপ। জঙ্গলের প্রতি আকর্ষণ থাকলে ঘুরে আসতে পারেন রেমা কালেঙ্গা থেকে। সময় বয়ে যায়। ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়–ন আপনার না দেখা বাংলাদেশের সন্ধানে! নিজের বাকেট লিস্টকে করুন আরো সমৃদ্ধ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 48 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ