বান্দরবানে নিভৃত জীবন

Print
নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে এভাবেই নির্জন পাহাড়ে নিভৃতে বাঁচার লড়াই করে চলেছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন । ছবি : গার্ডিয়ান

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নিভৃতে জীবন-যাপন করছে। যাদের কথা কারো জানা নেই। নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরেই সেখানে পড়ে আছে তারা। সম্প্রতি রেহমান আসাদ নামের এক ফটোগ্রাফার পাহাড়ি অঞ্চলে নিভৃতে থাকা কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের চিত্র তুলে এনেছেন।

যুক্তরাজ্যের সংবাদ মাধ্যম ডেইলি মেইল গতকাল সোমবার এ খবর জানিয়েছে।

ডেইলি মেইলের ওই খবরে বলা হয়, ফটোগ্রাফার রেহমান আসাদ বান্দরবান জেলার কয়েক সপ্তাহ থেকেছেন। তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে নিভৃতে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের পাঁচটি গ্রাম ঘুরেছেন। সেখানে মুরংসহ প্রায় ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায় রয়েছে। এর মধ্যে মুরং ওই এলাকার চতুর্থ বৃহৎ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়।

মুরংদের জীবন-যাপনের চিত্র একদম ভিন্ন। দরিদ্র কৃষক হিসেবে জীবন কাটে তাদের। বাঘ, কুকুর, ছাগল, শুকর, গরুসহ বিভিন্ন প্রাণীই মুরংদের প্রধান খাবার।

আর মুরংদের সবচেয়ে ডিলিয়াস খাবার হলো ন্যাপি। যা মাছ, ব্যাঙ, হরিণ অথবা বন্য শুকরের তেল দিয়ে তৈরি করা হয়।

পাহাড়ের চূড়ায় মুরংদের বাড়ি-ঘর। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি—যেগুলোর স্থানীয় নাম ‘মাচাং ঘর’। বাড়ির সামনে ছোট্ট ব্যালকনিসহ প্রতিটি বাড়িতে তিন থেকে চারটি কক্ষ রয়েছে। সেগুলো শোবার ঘর, রান্নাঘর, স্টোররুম এবং অতিথি কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো তাদের ঘরে কোনো আসবাবপত্র নেই। এমনকি বিদ্যুৎও নেই। তবে কিছু কিছু মুরং আলোর জন্য ছোট সোলার প্যানেল ব্যবহার করে।

নিজেদের তৈরি মাদুর পেতে মাচাং ঘরের মেঝেতেই বিছানা করে একত্রে ঘুমায় মুরংরা।

রেহমান আসাদ জানান, তিনি চমিপাড়া নামের একটি মুরং গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা ‘কুমলাং উৎসব’ উদযাপন করছে। যেখানে তারা নতুন ফসল ঘরে তোলার আগে একটি গরু হত্যা করছে। এটি মুরংদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

মুরংদের পুর্বপুরুষরা যখন বুঝতে পারে যে অন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জীবন-যাপনের জন্য লিখিত ভাষা, নিয়ম-কানুন রয়েছে, তখন তারা তাদের দেবতা তোরাইয়ের কাছে প্রার্থনা করে। এরপর তোরাইয়ের কাছে নিয়ম-কানুন পাঠানো হয়। তোরাই কলাপাতায় নিয়ম-কানুন লিখে রাখে। কিন্তু একটি শয়তান প্রাণী সেগুলো খেয়ে ফেলে। তখন মুরংরা নিরুপায় হয়ে পড়ে। তাই এ উৎসবে গরু উৎসর্গ করা হয়।

উৎসবের সময় তারা সামনের বছর ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করে। এ ছাড়া পানীয় পান, নাচানাচি করে।

উৎসব উপলক্ষে যখন পুরুষরা বাড়ির তৈরি মদ পান করে বাঁশের বাঁশি বাজানোর প্রস্তুতি নেয়, তখন নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করে অলঙ্কার পরে নাচতে শুরু করে। মুরংদের বেশির ভাগই বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। তবে কিছু কিছু লোক খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে।

মুরং পুরুষ সংসারের জন্য সামান্য কাজ করে থাকে। খাবারের জন্য পাহাড় থেকে জীব-জন্তু শিকার করাই মুরং পুরুষদের প্রধান কাজ।

তবে নারীরা কঠোর পরিশ্রম করেন। সকাল বেলায় পাহাড়ি ঝরনা, নদী, হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং রান্না করেন। বাড়ির সব কাজ করে থাকেন মুরং নারীরা। এরপর তারা ফসল সংগ্রহের জন্য পাহাড়ে যায়। পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করে।

অবশ্য নারীরা কাজে গেলেও মুরং শিশুরা বাড়িতেই থাকে। শিশুরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে খেলাধুলা করে। তাদের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষা থেকে তারা পুরোপুরি বঞ্চিত।

ফটোগ্রাফার রেহমান আসাদ বলেন, ‘আশা করছি, মানুষজন আমার ছবিগুলো দেখে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন-যাপন সম্পর্কে জানতে পারবে। তাদের সংস্কৃতি, বেঁচে থাকার জন্য লড়াইয়ের কথা জানতে পারবে।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 357 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ