বাড়িভাড়ার ভোগান্তি

Print

নতুন বছর এলেই শুরু হয় ভারিভাড়ার ভোগান্তি। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে নিত্যপণ্যের দামও। গত ২৫ বছরে রাজধানী ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৮৮ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ।
বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামের এই হিসাব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।

অথচ বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ২৫ বছর আগে আইন হলেও বিধিমালা হয়নি। নেই আইনের প্রয়োগ। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠনের জন্য সর্বোচ্চ আদালত রায়ও দিয়েছিলেন। দেড় বছর পেরোলেও সেই কমিশন এখনো গঠিত হয়নি। এরই মধ্যে প্রতিবারের মতো এবারও বছরের শুরুতে বাড়ির মালিকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, গ্রিন রোড, গুলশান, বনানী, উত্তরা, ওয়ারী, মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও এলাকার অন্তত ২০ জন ভাড়াটের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা বলেছেন, ইতিমধ্যে তাঁদের কাছে এলাকাভেদে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পাঠিয়েছেন বাড়ির মালিকেরা।
এ বিষয়ে ক্যাবের সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভাড়াটেরা বাড়ির মালিকদের কাছে জিম্মি। সরকার কখনোই ভাড়াটেদের পক্ষে ন্যায্য পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৯১ সালের যে বাড়িভাড়া আইন আছে, সেটিও কার্যকর নেই।
নির্মাণসামগ্রী, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার অজুহাতে বাড়িভাড়া বাড়ানোর বিষয়টিও অযৌক্তিক বলে মনে করেন গোলাম রহমান। তিনি বলেন, ভাড়াটেদের চাহিদার সুযোগ নিয়ে বাড়ির মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
উচ্চ আদালতের রায়ে বাড়িভাড়া কমিশন গঠনের দায়িত্ব ছিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের মুঠোফোনে গত মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হয়। তিনি জবাব না দেওয়ায় খুদে বার্তা পাঠানো হয়। খুদে বার্তার জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। তিনি খোঁজ নেবেন।
বাড়িভাড়া বাড়ছেই
ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৯৯০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের একটি বাসার ভাড়া ছিল ২ হাজার ৯৪২ টাকা। ২০১৫ সালে সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১৫০ টাকা। ২০০৬ সাল থেকে গত ১০ বছরে ভাড়া বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এ সময় ভাড়া বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ।
গ্রিন রোড এলাকায় দুই কক্ষের একটি বাসায় চার বছর ধরে থাকছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন। তিনি ৮০০-৮৫০ বর্গফুটের এই বাসাটি ১২ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন। সাব্বির বলেন, প্রতিবছর ১ হাজার টাকা করে ৪ হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছে। বাড়িওয়ালা আগামী বছরও ১ হাজার টাকা বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী মো. আজমল হায়াত খান পরিবার নিয়ে বনানী ২ নম্বর সড়কের একটি বাসায় থাকেন। ২ হাজার ৬০০ বর্গফুটের বাসাটির মূল ভাড়া ৪০ হাজার টাকা। আজমল হায়াত গতকাল বলেন, ‘এবার ভাড়া এক লাফে ৫ হাজার টাকা বাড়ানো হবে বলে জানানো হয়েছে। একবারে এত ভাড়া বাড়ানোটা কতটা যুক্তিযুক্ত জানি না। ভাড়াটের জন্য এটি বিশাল চাপ।’
বাড়িভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বাড়িওয়ালারা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, গৃহঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ইত্যাদি যুক্তি দেখান। কল্যাণপুর এলাকার একজন বাড়িওয়ালা বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়লে বাড়িভাড়া বাড়বে না কেন? বাড়িওয়ালা অন্যায্যভাবে ভাড়া বাড়াচ্ছেন এটা ঠিক না। বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখেই বাড়িভাড়া বাড়ানো হচ্ছে।’ তবে বাড়িভাড়া নির্ধারিত থাকলে সে হারেই ভাড়া নিতেন বলে তিনি দাবি করেন।
কেবল মাসিক ভাড়া নয়, অগ্রিম হিসেবেও কয়েক মাসের ভাড়া নিচ্ছেন বাড়ির মালিকেরা। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মানোয়ার রহমান কাঁঠালবাগানে গত মাসে তিন কক্ষের একটি বাসায় উঠেছেন। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে মাসিক ভাড়া ৩০ হাজার টাকা। আর অগ্রিম হিসেবে ৯০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
২৫ বছরেও আইনের প্রয়োগ নেই
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশটি প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। বর্তমানে প্রচলিত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটি ১৯৯১ সালের। কিন্তু সরকার এখনো এই আইনের বিধি করেনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 129 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ