বিশেষ সাক্ষাৎকার : সাকিব আল হাসান আমার বিশ্বসেরা মুস্তাফিজ

Print

২০০৯ থেকে ক্রিকেটের কোনো না কোনো সংস্করণে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তিনি। একবার তো নজিরবিহীনভাবে তিন ফরম্যাটেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ৮ হাজার রান আর ৪০০ আন্তর্জাতিক উইকেটের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও নাম আছে তাঁর, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘকালীন পোস্টার বয় তিনি। এখন আইপিএলে নতুন এক পোস্টার বয়কে বিকশিত হতে দেখছেন সাকিব। পরশু রাতে টেলিফোনে কালের কণ্ঠ’র ক্রীড়া সম্পাদক সাইদুজ্জামানের নেওয়া সাক্ষাৎকারে মুস্তাফিজকে ক্রাউন প্রিন্সের মর্যাদাই দিয়েছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার, কথা বলেছেন নিজের ক্যারিয়ার নিয়েও।

প্রশ্ন : আপনার মেসি এবং বার্সেলোনা তো নেই চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে। দেখবেন ম্যাচটা (২৮ মে)?

সাকিব আল হাসান : (হাসি) আগ্রহ নেই আর। তবে মনে হয় অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ জিতবে। আবার ভাববেন না যে বার্সার সমর্থক বলেই রিয়াল মাদ্রিদ হারবে বলছি না। অ্যাতলেতিকো বেটার টিম বলেই ওদের জয়ের সম্ভাবনা দেখছি।

প্রশ্ন : আইপিএল কে জিতবে?

সাকিব : বলা মুশকিল। এখানকার দলগুলো তো

উনিশ-বিশ। আমার অভিজ্ঞতা বলে আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় সেই দলই, যারা এ সময়টায় মোমেন্টামটা পায়। ২০১৪ সালে আমরা শেষ আটটা ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। মুম্বাইয়ের বেলায়ও তা-ই হয়েছিল। আমার মনে হয় টুর্নামেন্টের মাঝপথ থেকে শেষ পর্যন্ত মোমেন্টাম ধরে রাখতে পারবে, তারাই চ্যাম্পিয়ন হবে।

প্রশ্ন : সেই ২০১১ সালে কলকাতা নাইটরাইডার্স যে নিল আর ছাড়ছে না। মাঝে একটা মৌসুম বাদ দিলে নাইটদের একজন আপনি। এ মৌসুমটা কেমন যাচ্ছে?

সাকিব : বাড়তি কোনো এক্সাইটমেন্ট নেই, আগের মতোই সব কিছু। আগের মতোই চেষ্টা করছি, যেন ভালো খেলতে পারি, সবগুলো ম্যাচ খেলতে পারি। যতটা সম্ভব দলে কনট্রিবিউট করতে পারি।

প্রশ্ন : কিন্তু এবার তো টিভিতে আপনাকে দেখতে একটু অন্য রকম লাগছে। চাপ নাকি ক্লান্তির কারণে আপনাকে এমন দেখাচ্ছে?

সাকিব : না, ওই রকম চাপ নেই। এত দিন ধরে এখানে খেলতে খেলতে দলটাকে নিজেরই মনে হয়। জাতীয় দলের পর এখানেই সবচেয়ে বেশি দিন হলো খেলছি। তো, মানসিক চাপ না, নিজে থেকেই চেষ্টা করছি যেন অনেক বেশি পারফর্ম করতে পারি। পুরোটাই আমার নিজের। দলের পক্ষ থেকে কখনোই কোনো চাপ দেওয়া হয়নি, হয়ও না। এমনকি দলের পক্ষ থেকে প্রত্যাশার চাপও নেই। বাংলাদেশ দলে খেললে যেমন প্রত্যাশার চাপটা বুঝতে পারি, এখানে সেটা নেই। দল মনে করে ভালো যে করতে হবে এটা প্রত্যেক ইনডিভিজ্যুয়ালই জানে। তাগিদটা নিজের থেকেই তৈরি হয়। এ পরিবেশটা বেশ স্বস্তিদায়ক। তার মানে এই না যে আমি জাতীয় দলে কমফোর্টেবল না। এখানে প্রত্যাশার চাপটা সেভাবে নেই।

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক সময়ে আপনার ব্যাটিং নিয়ে সবাই খুব উদ্বিগ্ন। আপনার নিজের কী ভাবনা, নাকি মনে হয় বাইরের মানুষ অযথাই আতঙ্কিত?

সাকিব : সত্যি বলতে কি, আমি আমার ব্যাটিং নিয়ে অত চিন্তিত না। ভালোই ব্যাটিং করছি। ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতেও ভালো করেছি। তাই ব্যাটিং নিয়ে আমার মনে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই। তবে এটা ঠিক যে আগের মতো অত বড় ইনিংস খেলছি না। এটার মূল কারণ কিন্তু আমাদের বেশ কয়েকজন ব্যাটসম্যান খুবই ভালো করছে। ওপরের ব্যাটসম্যানরা বেশি খেলে দেওয়ায় আজকাল বেশি সময় ব্যাটিংয়ের সুযোগও পাচ্ছি না। আগে হয়তো দ্রুত ৩-৪টা উইকেট পড়ে যেত, এরপর আমি গিয়ে খেলাটা ধরতাম। তখন ব্যাট করতাম ৩০-৩৫ ওভার। এখন ৭-৮ ওভার হয়তো খেলার সুযোগ পাই। তাতে আমার বড় ইনিংসের জন্য দলকে অপেক্ষায় থাকতে হয় না। দল হিসেবে যে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে, এটা তার একটা প্রমাণ।

প্রশ্ন : তার মানে সাধারণ মানুষ কি আপনাকে নিয়ে অকারণেই উদ্বিগ্ন?

সাকিব : বিষয়টা তা না। আমার ধারণা, আল্লাহর রহমতে আগে বড় ইনিংস খেলতাম বলেই হয়তো সবাই ভাবেন এখন তো আগের মতো লম্বা ইনিংস খেলছি না। ভালোবাসা থেকেই হয়তো মানুষের এ উদ্বেগ। একটা কথা কী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলে একজনের রোল পরিবর্তন হতে থাকে। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে আমাকে দল ব্যবহার করে। টিম ম্যানেজমেন্টের এ চিন্তাগুলো আসলে বিস্তারিত বলে বোঝানোর উপায় নেই। ম্যাচ পরিস্থিতিই আমার ব্যাটিং অর্ডার ঠিক করে, অ্যাটাকিং নাকি ডিফেন্সিভ খেলবে, সেটাও। বাইরে থেকে ব্যাপারটা অতটা বোঝার কথা না। বুঝতে না পারাও দোষের কিছু না।

প্রশ্ন : ৮-৯ বছর ধরেই দেশের মানুষ ‘সাকিব’, ‘সাকিব’ করেছে। এখন মুস্তাফিজুর রহমানের নামে মিছিল করছে। এ পরিবর্তন দেখে কি তারকা সাকিবের একটু খারাপ লাগে? স্থানচ্যুত হতে কারই বা ভালো লাগে!

সাকিব : না, আসলে আমি তো কখনো এ ধরনের চিন্তাই করিনি। শুধু আমি না, দলের কারো ভেতরই এটা কাজ করে বলে মনে হয় না। আল্লাহ সবাইকে একটা আলাদা গুণ দিয়েছেন। আমি অন্তত তা-ই বিশ্বাস করি। সেই গুণের বদৌলতে অন্য কেউ যদি উন্নতি করে থাকে, সেটা তার অর্জন। আমার টার্গেট থাকবে আমার জায়গা থেকে আমি সেরাটা কিভাবে দিতে পারি। মুস্তাফিজের মতো ট্যালেন্ট আসায় তো আমাদেরই লাভ হয়েছে। দু-তিন বছর আগে এলে আরো ভালো হতো।

প্রশ্ন : মুস্তাফিজ তো প্রশংসায় ভাসছেন। আপনি তাঁকে কোথায় রাখবেন?

সাকিব : সংক্ষিপ্ত ভার্সনে নিঃসন্দেহে বিশ্বের সেরা বোলার। (লাসিথ) মালিঙ্গা থাকলে হয়তো মুস্তাফিজের সঙ্গে তুলনা করা যেত। কিংবা সুনীল নারিন যদি সেরা ফর্মে থাকত, বোলিং অ্যাকশন প্রশবিদ্ধ হওয়ার আগের নারিনকে ধরা যেত। কিন্তু দুজনের কেউই এখন যেহেতু সেভাবে নেই, তাতে মুস্তাফিজের আশপাশেও কেউ নেই। এটাই সত্যি।

প্রশ্ন : মুস্তাফিজের ক্যারিয়ার তো মোটে এক বছরের। সে বিবেচনায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা কি একটু বেশিই হচ্ছে?

সাকিব : আলোচনা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। ও যেভাবে পারফরম্যান্স করেছে এবং করে চলেছে, তাতে ওকে নিয়ে হইচই হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন : প্রতিভা তো দলে আরো দেখেছেন। তাঁদের অনেকে দ্রুত হারিয়েও গেছেন। সেই হারিয়ে যাওয়াদের সঙ্গে মুস্তাফিজের তুলনা যদি করতে বলি…

সাকিব : আসলে মুস্তাফিজ স্পেশাল প্রতিভা। ওর সঙ্গে অন্যদের মেলাতে চাই না। ওর স্লোয়ার বলটাই ধরেন। ওটা তো চাইলেই কেউ করতে পারছে না, পারবে বলে মনেও হয় না। আপনার কি মনে হয় কেউ ওটা চেষ্টা করছে না? করছে; কিন্তু পারছে না। মালিঙ্গার ওই অ্যাকশনে আর কাউকে বল করতে দেখেছেন? নারিনের মতো আঙুলের ভেতর বল নাড়াচাড়া করতে করতে যেভাবে বোলিং করত, সেটাও কেউ পারবে না। আপনার আঙুল-টাঙুল ভেঙে যাবে! মুস্তাফিজরা বিশেষ প্রতিভা। এখন যদি ও প্র্যাকটিস না-ও করে, তবু স্লোয়ার ঠিকঠাক মারতে পারবে। আলহামদুলিল্লাহ যে আমাদের দলে মুস্তাফিজের মতো ট্যালেন্ট আসছে। আরো দু-একটা এলে আরো ভালো।

প্রশ্ন : মুস্তাফিজের দলের বিপক্ষে তো একটা ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। সে ম্যাচের আগে টিম মিটিংয়ে কি মুস্তাফিজকে খেলার উপায় আপনাকেই বাতলাতে হয়েছিল?

সাকিব : আলোচনা অনেক বিষয় নিয়েই হয়েছে। তার পরও মুস্তাফিজকে নিয়ে তো আলোচনা হয়েছেই। ওর স্লোয়ার, কাটার এবং জোরের ওপর ইয়র্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওর দুর্বলতা নিয়েও কথা হয়েছিল। যেমন—ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বেলায় ভেতরে বল আনতে পারে না। আমাকে বিশেষ কিছু বলতে হয়নি। ওর সব তো টিভিতে দেখলে আপনিও বুঝতে পারবেন। কিন্তু সব দেখেও মুস্তাফিজকে খেলা যায় না!

প্রশ্ন : আইপিএলে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বড় তারকা আপনি। এখন নতুন এসেই ঝড় তুলেছেন আপনারই এক অনুজ। কেমন লাগে?

সাকিব : দেখে খুবই ভালো লাগে। ওকে নিয়ে আইপিএলে যা হচ্ছে, তা একেবারেই অন্য রকম। তা ছাড়া হায়দরাবাদও ওর ওপর খুব খেয়াল রাখছে। ভাষাগত সমস্যার কথা ভেবে ওর জন্য একজন বাঙালি রেখেছে। হায়দরবাদে ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় লোকটার সঙ্গেও কথা হয়েছিল। আমার দেশের একজনের জন্য বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজির এমন যত্নশীল হতে দেখলে ভালো তো লাগবেই।

প্রশ্ন : আপনার পর মুস্তাফিজকে দেখে কি আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটারের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে মনে হচ্ছে?

সাকিব : আমি তো ভেবেছিলাম এ বছরই আরো দু-একজন আইপিএলে ডাক পাবে। তামিম এবং তাসকিনও ডাক পাবে ভেবেছিলাম।

প্রশ্ন : মুস্তাফিজকে তো বিশ্বের সব লিগই ডাকবে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই কি এতটা ধকল তিনি নিতে পারবেন?

সাকিব : বলাটা মুশকিল ওর শরীর কতটা নিতে পারবে। টেস্ট ম্যাচ ও কত দিন খেলবে পারবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। আমার কাছে মনে হয় মুস্তাফিজ যদি বাংলাদেশের হয়ে শুধু ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি খেলে, তাহলে আমাদের খুব সুবিধা হয়। এতে ওর ক্যারিয়ার এবং আর্থিক দিক দিয়েও ভালো হবে বলে আমার মনে হয়। টেস্ট ম্যাচ নিয়ে বলছি না, কারণ ওর মতো কাউকে পেলে যেকোনো অধিনায়ক ওকে দিয়ে সবচেয়ে বেশি বোলিং করাবে।

প্রশ্ন : সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে মুস্তাফিজ কি পরামর্শ করেন নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে?

সাকিব : না, এখন করার দরকারও নেই। এখন মুস্তাফিজের উপভোগ করার সময়। যখন সময় আসবে, তখনই করা উচিত। এখন ওর উচিত যেভাবে খেলতে ভালো লাগে, সেভাবে খেলে যাওয়া।

প্রশ্ন : আবার আপনার প্রসঙ্গে আসি। আপনার আবাহনীর অবস্থা তো করুণ!

সাকিব : আমার মনে হয় আবাহনীর বোলিংয়ে ঘাটতি রয়েছে। বেঞ্চেও শক্তি নেই। তাই খারাপ খেলার পরও কাউকে বসানো যাচ্ছে না।

প্রশ্ন : কিছুদিন আগে লুকিয়ে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করে গেলেন মিরপুরের ইনডোরে! এই লুকোচুরি কেন?

সাকিব : (হাসি) মোটেও লুকিয়ে করিনি। ইনডোরে কি লুকিয়ে প্র্যাকটিস করা যায়? স্টেডিয়ামের মূল গেট দিয়ে ঢুকিনি আর আপনারা কেউ ইনডোরে আসেননি, তাই দেখেননি!

প্রশ্ন : আচ্ছা, সেদিন একটা অনলাইনে দেখলাম আপনি সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার মালিক। খবরটা সত্যি?

সাকিব : (হাসি) ভাই এ খবরটা নিয়ে আমি মহাবিপদে আছি! এত টাকা থাকলে ক্রিকেট তো খেলতামই না, বিপিএলের সবগুলো দল কিনে নিতাম!

প্রশ্ন : যদি সত্যি সত্যি এত টাকার মালিক হন, তাহলে?

সাকিব : তাহলেও ক্রিকেট খেলতাম। বাংলাদেশের অনেক বড়লোকই তো হাজার কোটি টাকার মালিক বলে শুনি। কই, তারা তো ব্যবসা ছাড়েনি। ক্রিকেট আমার প্যাশন, এত সহজে এটা ছাড়ব না। বুড়ো বয়সেও মাঠে যাব, ব্যাট-বল হাতে পেলে ঠোকাঠুকি করব।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 123 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ