বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীর তালিকা প্রধানমন্ত্রী

Print

নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে নেই আর কোথাও। এভারেস্ট চূড়া থেকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ, কোথায় নেই নারীরা? রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে ছোট-বড় প্রতিটি পেশায় মেধা আর শ্রম দিয়ে উন্নত বিশ্ব বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছেন নারীরা। ফোর্বস, টাইমসসহ জনপ্রিয় ম্যাগাজিনগুলো প্রতিবছর বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর নারীদের তালিকা তৈরি করে। সম্প্রতি ফোর্বসের করা তালিকায় থাকা ক্ষমতাধর কিছু নারীকে নিয়ে আজকের আয়োজন ফয়সাল স্বরূপ
মেলিন্ডা গেটস

সহপ্রতিষ্ঠাতা, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী বিল গেটসকে কে না চেনে? সফটঅয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের পতœী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস। কম্পিউটার সায়েন্স আর অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষে মাইক্রোসফটে পেশাজীবন শুরু করেন, ১৯৯৪ সালে বিল গেটসের সঙ্গে বৈবাহিক জীবন শুরুর আগে। ১৯৯৮ সালে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন গঠন করেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে মানুষের সেবার জন্য। সংস্থাটির পক্ষে এ পর্যন্ত দান করেছেন প্রায় বিলিয়ন সাতাশেক। কাজের জন্য দেশ-বিদেশে প্রশংসার পাশাপাশি পেয়েছেন কয়েকটি সম্মানসূচক ডক্টরেট। ফোর্বস তালিকায় এবার তিনি আছেন চার নম্বরে।
মেরি ব্যারা
সিইও, জেনারেল মোটরস
প্রায় শতবর্ষ পুরনো জেনারেল মোটরসের ইতিহাসে প্রথম নারী সিইও হিসেবে মেরি ব্যারাকে নিয়োগ দেওয়া হয় ২০১৪ সালে। জেনারেল মোটরসের সঙ্গে মেরির সম্পর্কটা ছোটবেলা থেকেই। বাবা কাজ করতেন এ কোম্পানিতেই। আবার কলেজে পড়াকালীন এখানেই পার্টটাইম কাজ নেন মেরি। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফেলোশিপ নিয়ে ১৯৮৮ সালে জোরালোভাবে কাজ শুরু করেন। সময়ের আবর্তে জেনারেল মোটরস বিজ্ঞ হিসেবে সিইও পদে মেরি ব্যারাকে নির্বাচিত করে। লোকসানসহ কোম্পানির বেশ কিছু জটিলতা মোকাবিলা করতে হয় সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই। টাইম, ফোর্বস, ফরচুন ম্যাগাজিনের পৃথিবীর ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় পাঁচ নম্বর এই নারী।
শেরিল স্যান্ডবার্গ
সিওও, ফেসবুক
ব্যক্তিজীবনে মা-বাবার প্রথম সন্তান, পেশাগত জীবনে ফেসবুকের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আর সবচেয়ে বেশি বেতনের কর্মকর্তা। হার্ভার্ড থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তিনি প্রথমে ম্যাকিনজি অ্যান্ড কোম্পানি এবং তারপর বিশ্বব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০১ সালে গুগলে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া গুগলের জনপ্রিয় প্রকল্প গুগল ডট অর্গ চালুতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০১২ সালে শেরিল প্রথম নারী হিসেবে ফেসবুক বোর্ডে যোগদান করেন। ফেসবুক ছাড়াও তিনি ওয়াল্ট ডিজনি ও উইমেন ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। এ বছর করা ফোর্বসের তালিকায় ৭ম তিনি।
সুজান ওজিকি
সিইও, ইউটিউব
ছোটবেলায় পড়তে ভালবাসতেন সাহিত্য, জানতে চাইতেন ইতিহাস। কিন্তু বড় হয়ে বনে যান টেকনোলজিষ্ট। ইউটিউবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও। হার্ভার্ড থেকে সাহিত্য নিয়ে পড়ে মাস্টার্স করলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতির ওপর। পরবর্তী সময়ে আবার মাস্টার্স করলেন ব্যবসায় প্রশাসনের ওপর। ১৯৯৯ সালে গুগলের প্রথম মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। গুগলের বিজ্ঞাপন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন তিনি গুগল বোর্ডকে ইউটিউব কেনার পরামর্শ দেন। ২০১৪ সালে সুজান হয়ে যান সেই ইউটিউবের প্রধান। ব্যক্তিজীবনে পাঁচ সন্তানের জননী সুজান। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নারী হিসেবে ফোর্বস তালিকায় তিনি ৮ নম্বর।
মেগ হুইটমেন
সিইও, এইচ-পি
প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিউলেট-প্যাকার্ড কোম্পানিকে আমরা এইচপি বলেই জানি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আমেরিকান ধনকুবের নারী মেগ হুইটমেন। এর আগে কাজ করেছেন ওয়াল্ট ডিজনি, হ্যাসব্রো, ড্রিমওয়ার্ক পিকচার্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে। তার জন্ম নিউইয়র্কের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার। কিন্তু পরবর্তীকালে অর্থনীতি নিয়ে পড়েন হার্ভার্ডের মতো প্রথিতযশা প্রতিষ্ঠানে।
ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে হুইটমেন প্রথমে ঢোকেন একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখান থেকে হলিউডের কয়েকটি প্রথম সারির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ঘুরে ১৯৯৮ সালে যোগ দেন ইন্টারনেটভিত্তিক ‘ ই-বেতে। মাত্র ৩০ কর্মী নিয়ে কাজ শুরু করে ২০০৮ সালে দাঁড় করিয়ে দেন ১৫ হাজার কর্মীর বিলিয়ন ডলারের বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য দুর্দান্ত মেধাবী ওই নারী আমেরিকান রিপাবলিকান সমর্থক। ২০১১ সালে এইচপি কোম্পানি তাদের প্রধান নির্বাহীর পদে হুইটমেনকে নিয়োগ দেন। এরপর থেকে এইচপি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। আমেরিকান রাজনৈতিক ও করপোরেট জগতে প্রভাবশালী ওই নারীকে ফোর্বস রেখেছে তাদের তালিকার নবম অবস্থানে।
শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। সাতচল্লিশের দেশভাগের উত্তাল সময়ে জন্ম শেখ হাসিনার। বাংলাদেশের তৃতীয় দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বেই শুধু নিয়োজিত নন, তিনিই একমাত্র রাজনীতিবিদ; যিনি টানা ৩৬ বছর ধরে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। গত ৩৬ বছরে তার জীবননাশের জন্য কমপক্ষে ২১ বার হামলা হয়েছে। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হয়েছেন। করাবরণ, কারানির্যাতন ভোগ, মিথ্যা মামলায় হয়রানি এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তিনি দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে চলেছেন সেই ছাত্রজীবন থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আট মাস বন্দি ছিলেন সপরিবারে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। সে সময় তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। ছয় বছর ভারতে থাকার পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন করেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন, ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার, ২০০৮ সালের ১২ জুন মুক্তি এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৪টি আসন লাভ করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাহসিকতা আর ব্যক্তিত্বের জন্য দেশ-বিদেশের নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন নানা সম্মাননা আর তার চেয়েও বড় সাধারণ মানুষের ভালবাসা। তিনি আছেন এই তালিকায় ৩৬ নম্বরে।
অ্যাঙ্গেলা মেরকেল
চ্যান্সেলর, জার্মানি
লৌহমানবী হিসেবে খ্যাত জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা। ছিলেন কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির গবেষক। দুই জার্মান এক হওয়ার বছর, ১৯৯০তে নাম লেখান রাজনীতিতে। সেখান থেকে নানা পথ পেরিয়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে অর্জন করেন দেশটির সর্বোচ্চ আসন চ্যান্সেলরের পদ। জার্মানের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা নির্বাচিত চ্যান্সেলর। ২০০৫ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত সফলভাবে নিজের কাজ চালিয়েও যাচ্ছেন তিনি। গত কয়েক বছরের বেশ কিছু কাজ, বিশেষ করে সিরিয়ার উদ্বাস্তু সমস্যা আর গ্রিসের অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে তার কার্যকরী দিকনির্দেশনা বিশ্লেষকদের চোখে পৃথিবীর ক্ষমতাধরদের তালিকায় তিনি এক নম্বর। এই ক্ষমতাধর নারীকে তার অনুসারীরা ডাকেন ‘মাম্মি’ নামে।
হিলারি ক্লিনটন
সাবেক ফার্স্টলেডি ও পররাষ্ট্র সচিব, আমেরিকা
হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। হিলারির বর্ণাঢ্য জীবনের শুরু শিকাগোয়। মজার ব্যাপার হলো, ডেমোক্র্যাটদের হয়ে টানা তিন দশক ক্ষমতা ও প্রশাসনের কেন্দ্রে থাকা এই হিলারি যুবতী বয়সে ছিলেন কট্টর রিপাবলিকান সমর্থক। পড়েছেন বিশ্বখ্যাত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিনের সহপাঠী ও সহকর্মী বিল ক্লিনটনকে বিয়ে করেন ১৯৭৫ সালে। আট বছর ছিলেন পুরো মার্কিন মুলুকের ফার্স্ট লেডি। তারপর দায়িত্ব পালন করেছেন দেশটির প্রথম নির্বাচিত নারী সিনেট হিসেবে। ২০০৮ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে হিলারিকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে হেরে যান হিলারি। ফোর্বসের শীর্ষ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় এবার দুই নম্বরে আছেন।
জ্যানেট ইয়েলেন
প্রধান নির্বাহী, ফেডারেল রিজার্ভ অব আমেরিকা
ভেবেছিলেন দর্শন নিয়ে পড়বেন। কিন্তু মার্কিনিদের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ভবিষ্যতে যার হাতে থাকবে তাকে মার্কস-ফুকো-ফ্রয়েড দর্শন পড়লে চলে কী করে? অর্থনীতিতে ডক্টরেট করে শিক্ষকতা শুরু করলেন নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিল ক্লিনটনের উপদেষ্টা হিসেবে দুই বছর কাজ করার পর প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন সান ফ্রান্সিসকোর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে। তত দিনে অর্থনীতিবিদ স্বামী জর্জ অ্যাকারলফের নোবেলজয়ের কারণে দেশবাসীর নজরে আসেন জ্যানেট। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবে কাজের পর ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারপারসন হন জ্যানেট। বিশ্বের অর্থবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে প্রথম নারী চেয়ারপারসন তিনি। ফোর্বসের গত চার বছরের তালিকায় শীর্ষ তিন ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে একজন জ্যানেট ইয়েলেনের বর্তমান বয়স প্রায় ৭০ বছর।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 140 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ