বিস্তারিত জানুন শিশুর পরবর্তী জীবনের সুস্থতা

Print

এসেছে নতুন শিশু

সাধারণত জন্মের পর থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত শিশুকে নবজাতক বলে। প্রসবের পর পরই নবজাতকের যত্নের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকা উচিত। এ সময়ের যত্ন-আত্তির ওপর নির্ভর করে শিশুর পরবর্তী জীবনের সুস্থতা।

এসেছে নতুন শিশু

 

কোলে নেওয়ার সময়

নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই কেউ কোলে নিতে চাইলে হাত পরিষ্কার করে নিতে বলুন। ঘাড় শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ঘাড়ের নিচে এক হাত রেখে কোলে নিন। ওপর-নিচ করার সময় মাথা ও ঘাড়ের নিচে হাত রাখুন। সতর্ক থাকুন তাঁর শরীরে যেন বেশি ঝাঁকুনি না লাগে। ঝাঁকুনি-চোট থেকে শিশুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। শিশুকে জাগাতে চাইলে জোরে ঝাড়া দেবেন না। প্রয়োজনে পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিতে পারেন। হাত ধরে টেনে তুলবেন না। বরং পিঠের নিচে হাত দিয়ে তুলুন।

শালদুধ

জন্মের ঠিক পর থেকে শুরুর ২-৩ দিন পর্যন্ত মা তাঁর স্তন থেকে যে দুধ নিঃসরণ করে তাকে শালদুধ বলে। শালদুধে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যেমন উচ্চমাত্রার আমিষ, স্নেহ ও শর্করা ছাড়াও রয়েছে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার বেশ কিছু জরুরি উপাদান। যার একটি ‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন এ’। এটা শিশুকে রক্তের ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া শালদুধ শিশুর ক্ষুদ্রান্ত্রকে ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে এবং শিশুকে কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝামেলা থেকে বাঁচায়। তাই অবশ্যকর্তব্য, জন্মের পরপরই শিশুর শালদুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুকে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের দুধ দেওয়ার সুপারিশ করে। জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট। বুকের দুধপানকালে শিশু কিছু বাতাস গিলে ফেলে। এ বাতাস বের করে দেওয়ার জন্য দুধ পানের পর শিশুর মাথা আলতোভাবে কাঁধে রেখে পিঠে হাত বোলান। বুকের দুধ পানের পর ১০-১৫ মিনিট বসানো পজিশনে রাখা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে শুইয়ে দিলে পান করা দুধ বেরিয়ে আসে বেশি।

ডায়াপার

* দৈনিক ১০ বার কাপড় বা ডায়াপার বদলাতে হতে পারে।

* ডায়াপার অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত হতে হবে।

* প্রতিবার পায়খানা-প্রস্রাবের পর অপরিষ্কার কাপড় বদলে ফেলুন। পায়খানা-প্রস্রাবের স্থান জীবাণুমুক্ত তুলা, ঈষদুষ্ণ পানিতে ডুবিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করে নিন। মেয়েশিশুর বেলায় সামনে থেকে পেছন দিকে নরম স্পর্শে পরিষ্কার করতে হবে। এতে মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

* র‌্যাশ দেখা দিলে অল্প ক্ষারযুক্ত সাবানজলে ডায়াপার ধুয়ে নিন।

গোসল

জন্মের ৪৮ ঘণ্টা পর অর্থাৎ তৃতীয় দিন গোসল করানো যাবে আর শিশুর চুল কাটানোর কানো প্রয়োজন নেই। প্রাথমিক পাতলা চুলটুকুর পরিবর্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনিতেই পরিণত চুল উঠবে। নবজাতকের নাভি শুকাতে এক থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এ সময় পর্যন্ত সপ্তাহে দু-তিনবার স্পঞ্জ বাথ দিতে হবে। গোসলে অবশ্যই পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত ঈষদুষ্ণ পানি, অল্প ক্ষারের সাবান, শুকনো, জীবাণুমুক্ত পোশাক ও তোয়ালে ব্যবহার করুন। ইনফ্যান্ট বাথটাব ব্যবহার করা হলে দু-তিন ইঞ্চির মতো হালকা গরম পানিতে ভর্তি করুন। নিজের কবজি ডুবিয়ে আগেই গরম অনুভব করে নিন। শিশুর নাক, কান, কানের পাশ, দেহের ভাঁজ পরিচ্ছন্ন রাখার ভালো উপায় গোসল। গর্ভ থেকে লেপ্টে থাকা রক্ত, এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের মতো জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে গোসল করানো খুব প্রয়োজন। নবজাতকের গোসলের সময় পাঁচ মিনিটের বেশি হওয়া উচিত নয়। সাবান কিংবা ক্লিনারস প্রথম কয়েক সপ্তাহ ব্যবহার না করাই উচিত। গোসল করিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে শুষ্ক তোয়ালে দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালোভাবে মুছে দিন। অনেক মায়েরই ধারণা, প্রতিদিন গোসল করালে শিশুর ঠাণ্ডা লাগবে। এটা একদমই ঠিক নয়। বরং হালকা গরম পানিতে শিশুকে নিয়মিত গোসল করান। তবে অসুস্থ হলে ডাক্তারের পরামর্শে গোসল করান। গোসল করানো বারণ থাকলে কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিন। শিশুকে তেল মাখাতে চাইলে খেয়াল রাখুন যেন তেলটা ঝাঁজালো না হয়। বরং বেবি অয়েল মাখাতে পারেন। শীতের দিনে তেল মেখে রোদে নিয়ে বসতে পারেন। তবে কড়া রোদ যেন না হয়।

বেবি পাউডার নয়

তপ্ত কিংবা ভাপসা আবহাওয়ায় পাউডার কাজে দিলেও নবজাতকের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ঠিক নয়। এটি শিশুর ত্বকের গ্রন্থিগুলোর শ্বাস-প্রশ্বাসের ছিদ্র বন্ধ করে দেয় ও ঘামাচি তৈরি করে। পাউডার শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসে ফুসফুসে পৌঁছে মারাত্মক ক্ষতি করে।

নাভি, নাক ও চোখে

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নাড়ি শুকিয়ে যায় এবং ৫-১০ দিনের মাথায় ঝরে পড়ে। নাভিতে কোনো কিছু লাগানোর প্রয়োজন নেই। নখ কেটে ছোট ও পরিষ্কার রাখা উচিত। গরম জলে কটন ভিজিয়ে খুব আলতোভাবে চোখ পরিষ্কার করুন। ত্বকের খসখসে ভাব দূর করতে নারিকেল তেল বেশি গ্রহণযোগ্য।

ঘুম পড়ানোর কলাকৌশল

নবজাতক ২৪ ঘণ্টার প্রায় ১৬ ঘণ্টা বা এরও বেশি সময় ঘুমিয়ে কাটায়। প্রতিবার প্রায় তিন-চার ঘণ্টা ঘুমায়। নরম বা তুলতুলে নয়, এমন বিছানার ওপর শিশুকে শোয়ান। ঘুমালে বাড়ির সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে যেন উচ্চ শব্দের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াবেন না, বরং বিছানায় শুইয়ে ঘুম পাড়ান। কারণ কোলে ঘুমানোর অভ্যাস হলে আর বিছানায় ঘুমাতে চাইবে না। শিশু ঘুমালে জোর করে তুলবেন না। সে যতক্ষণ ঘুমাতে চায় ঘুমাক। তেমনি আবার ঘুমাতে না চাইলে জোর করে ঘুম পাড়াবেন না। সাধারণত পেট ব্যথা কিংবা ঠাণ্ডা লাগা ধরনের অসুখ হলে শিশু ঘুমাতে চায় না। এ অবস্থায় শিশুকে লম্বা করে কোলে নিয়ে কাঁধে মাথা রেখে ঘুম পাড়ান।

শান্ত করা

শিশুকে যেনতেনভাবে শান্ত করা ঠিক নয়, মানে হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা তুলে দেওয়া ভালো নয়। এগুলোর অনেকগুলোই বিপজ্জনক হতে পারে। বরং তার বয়স অনুযায়ী রংবেরঙের খেলনা নিয়ে তার সঙ্গে মজা করুন। তা ছাড়া পিঠে হাত বুলিয়ে দিন। শিশুর কান্না থেমে যাবে।

শিশুর পোশাক

শিশুকে সুতি ও নরম জামাকাপড় পরাবেন। পোশাক ঢিলেঢালা হওয়া ভালো। শিশুর পোশাকে বোতাম বা হুক না লাগিয়ে ফিতা লাগান। শিশুর ব্যবহারের কাপড়চোপড় ধোয়ার সময় খেয়াল রাখবেন, যেন সাবান লেগে না থাকে। কারণ ক্ষারজাতীয় জিনিস শিশুর ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।

আপগার স্কোর

জন্মের পরপরই নবজাতকের সার্বিক অবস্থা অনুধাবনের জন্য যে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তার সংখ্যাবাচক প্রকাশই হলো আপগার স্কোর। শিশু জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট নিয়ে জন্মালে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এবং পাঁচ মিনিট পর আপগার স্কোর করে দেখা হয়। অন্য সব স্বাভাবিক শিশুকেও আপগার স্কোর করে দেখা হয়। মোট আপগার স্কোর ১০-এর মধ্যে কেউ যদি ৮-১০ পায়, ধরে নেওয়া হয় সে খুবই সুস্থ আছে আর ৪-৭ পেলে মোটামুটি ভালো। কোনো বাচ্চার আপগার স্কোর ০-৩ থাকলে পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক।

বার্থ অ্যাসফিক্সিয়া

নবজাতক জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই যদি নিজে নিজে নিঃশ্বাস নিতে ব্যর্থ হয়, তাকে বার্থ অ্যাসফিক্সিয়া বা অ্যাসফিক্সিয়া নিউনেটারাম বলে। সাধারণত এ ধরনের শিশুদের জন্মের পাঁচ মিনিট পর আপগার স্কোর ৬-এর নিচে থাকে। যদি তা ৩-এর নিচে নেমে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে শিশুটির অবস্থা বেশ জটিল। শিশু জন্মের এক মিনিটের মধ্যে যদি শ্বাস না নেয়, তাহলে অতিদ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এ সময় শিশুর তাপমাত্রা যেন কোনোভাবেই কমে না যায়, এ জন্য তাকে উষ্ণ কাপড়ে মুড়িয়ে রাখতে হবে। বার্থ অ্যাসফিক্সিয়া তীব্র হলে বা চিকিৎসা করতে সামান্য দেরি হয়ে গেলে শিশু মানসিক প্রতিবন্ধকতা, মৃগী, প্যারালাইসিসসহ নানা জটিলতায় ভুগতে পারে।

ওজনহীনতা

কম ওজনের নবজাতক সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে যেতে পারে। তাই এসব শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিতে হয়। সব সময় শিশুকে উষ্ণ রাখতে হবে, তাপমাত্রা কমতে দেওয়া যাবে না, পরিষ্কার হাতে শিশুকে ধরতে হবে এবং শিশুর পরিধানের কাপড়ও খুব পরিষ্কার রাখতে হবে। শ্বাস নিতে কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভেতরের লালা এবং নাকের সর্দি পরিষ্কার করে দিতে হবে। শিশুর ওজন বেশ কম হলে হাসপাতালে ভর্তি করে শিশু বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। সঠিক পুষ্টির জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি নাকে নল দিয়ে খাবার দেওয়া, এমনকি শিরার মাধ্যমেও খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। শিশুর তাপমাত্রা কমে গেলে তাকে ইনকিউবেটরে দিতে হবে।

রক্তক্ষরণ

শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে হঠাৎ শরীরের যেকোনো স্থান দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। সাধারণত রক্তক্ষরণ ছাড়া শিশুর অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না। এটিকে বলে হেমোরেজিক ডিজিজ অব নিউবর্ন বা নবজাতকের রক্তক্ষরণ। শরীরে ভিটামিন ‘কে’-এর অভাবে এ রোগ দেখা দেয়।

নানা কারণে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, দ্বিতীয় দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে বা বিলম্বিত রক্তক্ষরণ হতে পারে। এ সময় নাভি দিয়ে, পায়খানার সঙ্গে, নাক দিয়ে রক্তপাত হতে দেখা যায়। অনেক সময় চামড়ার নিচে রক্তপাতের কারণে লাল লাল দাগ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া বিপজ্জনক হলো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। আশার কথা হলো, নবজাতকের এই রক্তক্ষরণ প্রতিরোধে সহজ একটি চিকিৎসা পদ্ধতি বিদ্যমান। সেটি হলো ভিটামিন ‘কে’ ইনজেকশন প্রয়োগ। জন্মের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ ইনজেকশন দিতে হয়। ইনজেকশন মাংসপেশিতে একবার প্রয়োগ করলেই যথেষ্ট। তবে মুখে খাওয়ালে তিন ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজ নিতে হবে জন্মের চার ঘণ্টার মধ্যে। দ্বিতীয় ডোজ চতুর্থ দিনে এবং তৃতীয় ডোজ ২৮তম দিনে। ইনজেকশন নেওয়ার পরও রক্তক্ষরণের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

নাভির ইনফেকশন

নবজাতকের নাভি দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত সাদা পুঁজের মতো কিছু এলে বুঝতে হবে বাচ্চার নাভিতে ইনফেকশন হয়েছে। এ অবস্থায় নাভির চারপাশ লালচে হয়ে যায়।

স্টেফাইলোকক্কাস নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এমনটি হয়ে থাকে। অনেক সময় নাভি থেকে এটি লিভারে গিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে জন্ডিস, লিভারের ফোড়াসহ নানা রোগ হতে পারে। এ অবস্থায় শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া উচিত। জন্মের পরপরই নাভির যত্ন নিলে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

টিকা

* জন্মের পর : বিসিজি টিকা

* ৬ সপ্তাহ : প্রথম ডোজ ডিটিপি, পোলিও, হিব এবং হেপাটাইটিস-বি টিকা

* ১০ সপ্তাহ : দ্বিতীয় ডোজ ডিটিপি, পোলিও, হিব এবং হেপাটাইটিস-বি টিকা

* ১৪ সপ্তাহ : তৃতীয় ডোজ ডিটিপি, পোলিও, হিব এবং হেপাটাইটিস-বি টিকা

* ১০ মাস : হাম, চতুর্থ ডোজ পোলিও টিকা এবং ভিটামিন-এ ক্যাপসুল।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 248 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ