বুড়িগঙ্গা ছড়াচ্ছে জটিল রোগ

Print

রাজধানী ঢাকার প্রাণরূপী বুড়িগঙ্গা এখন নগরবাসীর আবর্জনা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নানা ধরনের বর্জ্যে অনেক আগেই দূষিত হয়ে উঠেছে এর পানি। ময়লা আবর্জনা, পয়ঃনিষ্কাষণ ও মলমূত্র নদীটিতে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে পানির গুণাগুণ। আশে পাশে ভালো নদী-নালা, পুকুর না থাকায় এলাকাবাসী বাধ্য হয়েই গোসলসহ বিভিন্ন কাজে বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহার করছে। এতে মানবদেহে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, চোখের অসুখ বিসুখসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোঃ শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন,বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত। এই পানি ব্যবহার করলে মানবদেহে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, চোখের অসুখ বিসুখসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চামড়া বিশেষজ্ঞ আউয়াল বলেন, ‘বর্জ্য দুই ভাবে বের হয়। লিকুইড বর্জ্য ও সলিড বর্জ্য। লিকুইড বর্জ্য বিভিন্ন ক্যামিকাল মিশ্রিত আর সলিড বর্জ্য চর্বি ও চামড়ার কাটিং। লিকুইড বর্জ্য পানিকে বেশি ক্ষতি করে।’ তিনি বলেন, ‘সবাই তো একসঙ্গে ড্রেনের মাধ্যমে ময়লা বুড়িগঙ্গায় ঢালে। এখন তো বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করার জন্য ট্যানারি শিল্পকে স্থানান্তর করা হচ্ছে। আশা করি সামনে ঠিক হয়ে যাবে।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার চারপাশে আবর্জনার স্তূপের পাশাপাশি ও অসংখ্য শৌচাগার৷ নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষ গৃহস্থালির বর্জ্য নদীতে ফেলছে অনবরত৷ এইসব আবর্জনা পঁচে পানিকে করছে আরও বিষাক্ত। এলাকাবাসীর ভাষ্য,পানি সংকটের কারণে বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহারে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
রতন নামে এক নৌকার মাঝি জানান, ‘বুড়িগঙ্গায় আগে গোসল করা যেত, এখন গোসল করলে গা চুলকায়। নানা ধরনের অসুবিধা হয়। কিন্তু পানি সংকটের কারণে গরীব মানুষ বাধ্য হয়েই এখানে গোসল করতে আসে।’
রিকশাচালক আতিকুর রহমান জানান, ‘কলকারখানা যত দিন আছে, ততদিন পানি দূষিত হবে। বর্ষাকালে পানি ভাল থাকে কিন্তু এখন পরিবেশ খারাপ। তারপরেও মানুষ এখানকার পানি ব্যবহার করে। আশে পাশে ভালো নদী-নালা না থাকায় গোসল, কাপড় ধোয়াসহ বিভিন্ন কাজে এর পানি ব্যবহার করছে।’
মনির নামে আরেক মাঝি বলেন, ‘পানির কারণে তাদের চোখে অসুখ হয়। দিনে চোখে দেখা যায় কিন্তু রাতে কিছু দেখা যায় না। চোখ ফুলে উঠে। ড্রপ ব্যবহার করেও কাজ হয় না।’

আজিজ নামে এক মাঝি বলেন, ‘আগে এখানে গোসল করতাম। ভাল লাগত। এখন বাসায় গোসল করি। তিনি বলেন, আমি ১৯৯৮ সালে ঢাকায় আসি। আগে এই পানিতে গোসল করতাম কিন্তু এখন এই পানির কারণে আমাদের চোখে অসুখ হয়। নৌকা চালানো যায় না। চোখ দিয়ে পানি পরে, তাকানো যায় না।’
মজিদ নামের এক ব্যবসায়ী জানালেন, বুড়িগঙ্গার পানি দূষণ বন্ধে সরকার যদি কিছু করে তাহলে ঠিক হবে। ট্যানারি সরিয়ে নিলে নদীর পানি অনেকটাই ব্যবহারের উপযোগী হবে।

হাজারীবাগের ট্যানারিশিল্প থেকে দৈনিক হাজার হাজার কিউবিক মিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এসব বর্জ্যে ক্রোমিয়াম, সিসা, সালফিউরিক এসিড, পশুর পচা মাংসসহ ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে। ট্যানারি থেকে নির্গত এসব বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানি তো বটেই, নদীর তলদেশ, তীরের মাটি ও বাতাসকেও দূষিত করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত পানি ব্যবহার করা মোটেও সঙ্গত নয়। এর জন্য ঘাঁ ও ছত্রাক জাতিয় রোগ, ফুসকুনি পড়া, হাজারীবাগের ট্যানারিতে ব্যবহৃত ক্রমিয়ামের আধিক্যের কারণে নানা ধরনের অসুখসহ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে মানুষ। এছাড়া দূষিত পানি পেটে গিয়ে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা ধরনের অসুখ হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক শরিফ জামিল বলেন, সরকার নদী রক্ষার নামে এটাকে ড্রেনে পরিণত করছে। বাঁধ নির্মাণের নামে দুই পাশে দোকান, স্থাপনা করার পরিকল্পনা করছে। বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে হলে সব ধরনের কলকারখানা উচ্ছেদ করতে হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 88 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ