ভার্চুয়াল কার্ডে চলছে হুন্ডি বাণিজ্য

Print

অবৈধ হুন্ডি ব্যবসায় প্রযুক্তিগত নতুন রূপ পেয়েছে। এখন কৌশলে চলছে হুন্ডির বাণিজ্য। আর এতে জড়িত রয়েছে দেশি এবং বিদেশি সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ধরনের একটি শক্তিশালী গ্রুপকে ইতিমধ্যে নজরদারিতে নিয়েছে। এ গ্রুপটির সঙ্গে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, তাইওয়ানসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কানেকশনের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার ফ্লাটে আইটি, আমদানি-রফতানি ও গাড়ি বাণিজ্যের আঁড়ালে গোপনে অবৈধ হুন্ডির কারবার চলছে। অবৈধ এ বাণিজ্যে বিডিকার্ড ইন্টারন্যাশনাল ও পেইড নেক্সট নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক হলেন বিন আমিন ওরফে মহিউদ্দিন। আগে বাংলামোটরে বিডি কার্ডের অফিস থাকলেও একদফা অভিযানের পর তা সরিয়ে পাশেই পান্থপথে নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ইউনিট পান্থপথের কার্যালয়ে অভিযান চালায়। কিন্তু কাউকে আটক বা গ্রেফতার না করায় রহস্য দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে অভিযানে যাওয়া এক কর্মকর্তাকে আরো গভীরভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেয়। আর এরই মধ্যে অন্য আরেকটি সংস্থা অবৈধ হুন্ডি বাণিজ্যচক্রের আদ্যোপান্ত জানতে সক্ষম হয়। তাদের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বিডিকার্ড ইন্টারন্যাশনাল পেইড নেক্সট নাম ধারণ করে পুরনো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড কিংবা মাস্টার কার্ডের মতোই হুবহু ভার্চুয়াল কার্ড দিচ্ছে গ্রাহকদের। এসব গ্রাহক এই কার্ডের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে আর্থিক লেনদেন করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে করে টাকা পাচার ও অবৈধ পথে টাকা আসছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, এই ভার্চুয়াল কার্ডের বিপরীতে যে কোনো অঙ্কের টাকা রিচার্জ করা যায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতোই বিডিকার্ডের ভার্চুয়াল কার্ড দিয়ে বিভিন্ন দেশের বুথ থেকে টাকা তোলা যাবে। শপিংমলে খরচ করা যাবে। এটি এক ধরনের অবৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রে আরো জানা গেছে, ভার্চুয়াল কার্ডের মাধ্যমে অবৈধ হুন্ডি বাণিজ্যে ঢাকার শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে বিদেশি ব্যক্তিরাও জড়িত। এমনকি বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিডি কার্ড ইন্টারন্যাশনালের গোপন চুক্তি রয়েছে। তাইওয়ানের একটি অফিস নিয়ন্ত্রণ করছেন বিডি কার্ড ইন্টারন্যাশনালের মালিকের স্ত্রী। যুক্তরাজ্যে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এসব ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা অব্যাহত আছে। শক্তিশালী চক্রে জড়িত একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। এ চক্রের সবাইকে যে কোনো সময় গ্রেফতার করা হতে পারে। আর বের হয়ে আসতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য। কিন্তু তার আগেই একজন বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্যানুসন্ধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ভার্চুয়াল কাডের্র উগ্রপন্থিদের লেনদেনের প্রাথমিক তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে গভীরভাবে। কারণ বিডি কার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বর্তমানে পেইড নেক্সট) তাদের গ্রাহকদের তথ্য গোপন রাখতে হাই এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো- প্রতিষ্ঠানটি গ্রহণ করেছে ভিপিএন পদ্ধতি। যাতে করে অতিমাত্রায় গ্রাহকের কার্ডের তথ্য গোপন থাকে, কেউ যাতে হ্যাক করতে না পারে। আর এ ক্ষেত্রে জঙ্গিদের আত তামকীন সাইট, কথিত আইএস বা জিহাদি গোষ্ঠীর সাইটগুলো যেমন করে নিজেদের তথ্য ব্লক করে রাখে, তেমনটি উদাহরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিডিকার্ডের সংশ্লিষ্টরা। এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, প্রযুক্তিগত নতুন কৌশলে টাকা পাচারের কার্ড হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক ভার্চুয়াল কার্ড। এখনই তাদের দমন করা না গেলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরেও বিষয়টি আনা হয়েছে। চক্রটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিটকয়েন বা সাংকেতিক মুদ্রাও ব্যবহার করে। এরা অনলাইনভিত্তিক লেনদেন করে গোপনে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ সম্পর্কে আরো তথ্য সংগ্রহ করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন গোয়েন্দা সদস্যরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ভার্চুয়াল কার্ড ও বিটকয়েনে অর্থ লেনদেন হলো এক ধরনের অবৈধ ব্যাংকিং। আইনে এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোনো নিয়ম নেই। যারা করছেন তারা গোপনে অবৈধভাবে আর্থিক লেনদেন করে যাচ্ছেন। তাদের দমন করতে যা যা করণীয় দরকার তাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের একটি গ্রুপকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির একটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে অবৈধ বিটকয়েন সিস্টেম চালু করার জন্য একটি শক্তিশালী চক্র উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে এ ধরনের অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনকে ১৯৪৭ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।
বিডিকার্ড ও পেইড নেক্সটের তথ্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পেইজা, পেপাল, মানি বুকার্সের লেনদেন করে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশেই গেটওয়ে পেমেন্ট প্রসেস হিসেবে অনেক সাইটে বিটকয়েন এবং ভার্চুয়াল কার্ডের পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। আর এতে করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন অর্থপাচারকারী ও অপরাধীরা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে যে পরিমাণ রেমিটেন্স আসছে তার ৪০ শতাংশ আসছে ব্যাংকিং চ্যানেলে। ৬০ শতাংশই আসছে হুন্ডিতে। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন. বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার পর ভার্চুয়াল কার্ড ও বিটকয়েনের বিষয়টি নজরে আসে। এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য-উপাত্ত রয়েছে তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
র‌্যাবের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ভাচুয়াল কার্ডে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বিডিকার্ড ইন্টারন্যাশনালের বাংলামোটর কার্যালয় থেকে মিজানুর রহমান ও আহসানুজ্জামান নামে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বিন আমিনের নাম আসে। এ সিন্ডিকেটে ছিলেন মাসুদ কামাল, মনির, রকিবুল ও নুরুজ্জামান নামে আরো চার যুবক। বর্তমানে বিডিকার্ড নতুন নামে নতুন লোকবল নিয়ে কাজ করছে। আর বিন আমিনকে নজরদারি করতে গোয়েন্দা টিম মাঠে রয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 64 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ