ভিআইপি সড়ক সাজছে মনোরম সাজ 

Print

বনানী ওভারপাস থেকে এয়ারপোর্ট মোড় পর্যন্ত সড়ক সাজানো হচ্ছে নৈসর্গিক সাজে - সাজ্জাদ নয়ন

বনানী ওভারপাস থেকে এয়ারপোর্ট মোড় পর্যন্ত সড়ক সাজানো হচ্ছে নৈসর্গিক সাজে
রাস্তার পাশে দোকান নয়, থাকবে বনসাইয়ের বাগান, আলোর ঝরনা, পথিকের দু’দণ্ড বিশ্রামের স্থান। পাথুরে ফোয়ারার জলে ভেজা বাতাস শ্রান্তির দুপুরে প্রশান্তি দেবে। জলে খেলবে বর্ণিল মাছ। যেমনটা দেখা যায় ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে। এবার তা ঢাকাতেও হবে। রাজধানীর বনানী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের দু’পাশে এমন দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য গড়ে তোলার কাজ চলছে জোরকদমে। আশা করা হচ্ছে, পূর্ণ রূপ পাবে আগামী জুলাইয়ে।

প্রকৃতির সঙ্গে মিলবে প্রযুক্তিও। বাগান, ঝরনা যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে বিনামূল্যে ওয়াইফাই সুবিধা। বনানী থেকে এয়ারপোর্ট রোডে ঢুকতেই যাত্রীদের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত হয়ে যাবে ওয়াইফাই।

বাদ যাবে না বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হবে তিনটি স্মৃতিস্তম্ভ। সাত বীরশ্রেষ্ঠের স্মরণে থাকছে আলাদা জোন। সেখানে ফুল-গাছঘেরা সবুজ ঘাসের বুকে থাকবে মার্বেল পাথরে খোদাই বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবার উপযোগীই স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। শিশুদের জন্য থাকবে খেলার জায়গা। নিরাপত্তায় থাকবে ১২টি আধুনিক পুলিশ বক্স। থাকবে ১২টি করে যাত্রী ছাউনি ও শৌচাগার। এ ছাড়াও থাকবে এলইডি সড়ক বাতি, সৌন্দর্যবর্ধক বাগান বাতি, আধুনিক ফুটপাত, ১০টি আরএইচডি সার্ভিস পয়েন্ট, সাইকেল লেন, ডিজিটাল এলইডি ট্রাফিক সাইন, বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা ও আধুনিক ডাস্টবিন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তত্ত্বাবধানে ‘বনানী ওভারপাস-এয়ারপোর্ট মোড় বিউটিফিকেশন’ নামের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ চলছে। কাজ শেষে আগামী জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে বনানী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের দুু’পাশ অত্যাধুনিক সাজে সাজানোর তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ভিনাইল ওয়ার্ল্ড গ্রুপ’ নব্বই কোটি টাকা ব্যয়ে ছয় কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে উন্নয়নের কাজ করছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রকল্পের মোট বাজেট ১৪০ কোটি টাকা। এর মেয়াদ দশ বছর। এ প্রকল্পে সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হচ্ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই পুরো ব্যয় বহন করছে। বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত স্থানে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন দেবে। উদ্বোধনের পর যদি বনানী থেকে এয়ারপোর্ট রাস্তা সংস্কারের প্রয়োজন হয়, শুধু ওই সংস্কারের ব্যয় বহন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।

সরেজমিন দেখা যায়, র‌্যাডিসন হোটেল থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার রাস্তার দু’পাশেই আধুনিক যাত্রী ছাউনি নির্মাণের কাজ চলছে। কাজ শেষের পথে। দ্রুত শেষ করতে দিনে-রাতে দুই পালায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শ্রমিকরা কাজ করছেন। হোটেল র‌্যাডিসনের সামনে নির্মাণ করা ঝরনায় দেখা যায় আপন মনে খেলছে নানা রঙের মাছ। সড়ক থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে হাঁটার পথ। জোয়ার সাহারায় তৈরি করা যাত্রী ছাউনিতে পরীক্ষামূলক সারি সারি এলইডি টিভির স্ক্রিনে ভেসে উঠছে মানসম্পন্ন ছবি ও বিভিন্ন ধরনের লেখা ট্রাফিক সাইন।

রাতের অন্ধকার ভেদ করে রাস্তার দু’পাশের বাগানের গাছপালার ফাঁক দিয়ে নানা বর্ণের বিচ্ছুরিত আলো সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিচ্ছে দ্বিগুণ। সড়কের পাশ দিয়ে গেছে পরিচ্ছন্ন নজরকাড়া ওয়াকওয়ে। ঝকঝকে টাইলসের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে সবুজ ঘাস। কুর্মিটোলা, ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন, নিকুঞ্জ, বিশ্বরোড সড়কের পাশে যে বুনো পরিবেশ ছিল, সেটাও অপসৃত হয়েছে। সেখানে দৃশ্যমান হয়েছে সুন্দর সাজানো অক্সিজেনদায়ী বাগান। এ ছাড়াও ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনের পাশঘেঁষেই নির্মাণ করা হচ্ছে অত্যাধুনিক শৌচাগার। মেয়েদের জন্য দুটি ও ছেলেদের জন্য চারটি। কাজের তদারককারী মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘তিন মাস ধরে এ প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছি। রাত-দিন খাটছি ভালো কাজের জন্য। টয়লেট নির্মাণের কাজও শেষের দিকে।’

ভিনাইল ওয়ার্ল্ড গ্রুপের সিইও আবেদ মনসুর  বলেন, আগামী জুলাইয়ে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। তবে আগামী মাসেই কাজগুলো দৃশ্যমান হবে। তিনি জানান, দেশের যে কোনো অভিজাত হোটেলের চেয়েও সুন্দর ও রুচিশীল করে তৈরি করা হয়েছে শৌচাগার। রাস্তার দু’পাশে থাইল্যান্ড থেকে আনা ২৫ থেকে ৪০ ফুটের শত বছর বয়সী দুই হাজার বনসাই গাছ লাগানো হচ্ছে। এ ছাড়াও বারোমাস যেন সড়কের দু’পাশে ফুল থাকে, সে বিবেচনায় করা হচ্ছে বাগান। ঢাকা শহরে জগিং করার জায়গার বড় অভাব। সে অভাবও দূর করবে এ সড়কের ফুটপাত। যারা এ এলাকায় প্রাতঃভ্রমণ করেন, তাদের জন্য ২০০টি ‘গার্ডেন বেঞ্চ’ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ময়লা ফেলার জন্য বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক ডাস্টবিন। প্রতিটি ডাস্টবিনেই থাকবে তাপমাত্রা নির্ণয়, দিন ও সময় জানানোর যন্ত্র। পুরো রাস্তাজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় কেউ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে।

আবেদ মনসুর জানান, চীন থেকে পরিচ্ছন্নতার যন্ত্র (সাকার মেশিন) আনা হচ্ছে। তা দিয়ে সহজেই রাস্তার ধুলা-বালি পরিষ্কার করা যাবে। রাস্তার দু’পাশেই তিন স্তরে লাইট বসানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে মাঝরাস্তায় ২০২টি লাইট, ফুটপাত সংলগ্নে ৮০০টি লাইট এবং ল্যান্ডস্কেপিংয়ে সংযোগ দেওয়া হয়েছে অসংখ্য লাইট। যা বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। চীন থেকে আসা দুটি প্রকৌশলী দল পুরো কাজের দেখভাল করছে। বর্তমানে এই উন্নয়ন প্রকল্পে সার্বক্ষণিক ১৬০ শ্রমিক কাজ করছেন। সময়মতো কাজ শেষ করতে আগামী মাসে আরও ৫০০ শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হবে।

এ ছাড়া সড়কের দু’পাশে নির্মিত ভিন্ন ডিজাইনের ডিজিটাল ওয়েটিংরুমে থাকছে ৮০ থেকে ৪০০ জন একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা। সঙ্গে ফ্রি মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট, মায়েদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং রুম, এটিএম বুথ, কয়েন বা টাকা ফেলে কারও সাহায্য ছাড়া কোনো পণ্য কেনার সুযোগ। নিকুঞ্জ এলাকায় হবে শিশুদের জন্য কিডস জোন। সেখানে একসঙ্গে দেড় হাজার মানুষ সময় কাটাতে পারবে। দুর্গন্ধের উৎস দূষিত লেকটিও নতুন করে সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

সওজের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান জানান, দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতা, শহরকে বদলে দেওয়ার সুচিন্তা, সুপরিকল্পনা, নিজের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সৎসাহস থাকলে যে কোনো কাজই সম্ভব। সেই তাগিদ থেকেই ৯০ কোটি টাকা ব্যয় করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনানী-এয়ারপোর্ট সড়ক আমূল বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ভিনাইল ওয়ার্ল্ড গ্রুপ। বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত স্থানে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন দেবে। যাত্রীছাউনিগুলোর অত্যধুনিক সুবিধার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, মেশিনে কয়েন ফেলে পছন্দের পণ্য কেনার সুবিধা থাকবে। এ ছাড়া থাকবে এটিএম বুথ, মোবাইল রিচার্জসহ অন্যান্য সুবিধা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আবেদ মনসুর বলেন, সুযোগ পেলে শুধু ঢাকা শহর নয়, পুরো দেশ বদলে দিতে চাই। দেশের সব বিমানবন্দর ও রেলস্টেশন অত্যাধুনিকভাবে সাজানোর ইচ্ছে রয়েছে বলে তিনি জানান।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 469 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ