ভূমিকম্পের কারণ ও করণীয়

Print
ভূমিকম্প হলো আকস্মিকভাবে ভূমিরূপ পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম বা জিওমরফিক এজেন্ট। সাধারণত ভূ-গর্ভের ৫-৭০০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের উত্পত্তি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতিবছর ছয় লক্ষাধিক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, তার মধ্যে আট বা ৮+ মাত্রার ভূমিকম্প হয় একটি। ভূমিকম্প সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। ১. আগ্নেয় বা ভলকানিক ২. ভূ-গাঠনিক বা টেকটনিক এবং ৩. মানবসৃষ্ট বা কৃত্রিম। ভূমিকম্পের কারণ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিদ্যমান আছে তার মধ্যে প্লেটগতির তারতম্য অন্যতম কারণ। এটি হলো, পৃথিবী ছোট-বড় অনেকগুলো প্লেট বা খণ্ডে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো সর্বদাই গতিশীল যদি কোনো কারণে এর নিয়মিত গতির ব্যত্যয় ঘটে তাহলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। যেমন যদি দু’টি পাশাপাশি প্লেট দুইদিকে সরে যায় তাহলে প্লেটসীমানায় ফাটলের সৃষ্টি হয়ে ভূ-অভ্যন্তরস্থ বাষ্পীয়, গলিত পদার্থসমূহ সবেগে বেরিয়ে আসে যাকে অগ্ন্যুত্পাত বলে। ফলে উভয় প্লেটের সীমানাবর্তী তলদেশে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয় এবং ভূমিকম্প হয়। আবার যদি একটি প্লেট অন্যটির মধ্যে ঢুকে যায় তাহলে প্লেট সীমানাবর্তী এলাকার ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে পর্বত সৃষ্টি হয় এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্পের আরেকটি কারণ হলো স্থিতিসাম্যতার তারতম্য। এটি হলো পৃথিবীর কোনো স্থানে যদি অধিক পরিমাণে পাহাড় কাটে বা গাছপালা কেটে বনাঞ্চল ধ্বংস করে অথবা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় ফলে ভূমির স্থিতিসাম্যতার তারতম্য ঘটে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। যেমন ১৯৯৯-তে পাকিস্তানে পারমাণবিক বিস্ফোরণের কারণে আফগানিস্তানে ভূমিকম্প হয়ে ৫ সহস াধিক লোক মারা যায়।
আবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ ভারত প্লেটের পূর্বাংশে এবং চীন ও মিয়ানমার প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়াও যথেষ্ট পাহাড় কাটা এবং নিম্নভূমি ভরাটের ফলে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে বাংলাদেশে যদি সাত বা ৭+ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে ঢাকা শহরের প্রায় ৭৩ হাজার ভবন ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে মানুষ মারা যাবে ২০ লক্ষাধিক যা কল্পনা করলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। এখন কথা হলো ভূমিকম্প থেকে বাঁচার উপায় কি। এটি দুভাগে ভাগ করা যায় একটি হলো ভূমিকম্প শুরু হলে কি করতে হবে, আরেকটি হলো ভূমিকম্প হওয়ার আগেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। যেমন ভূমিকম্প ঝাঁকুনি পৃথকীকরণ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, এ ব্যবস্থাগুলো হলে যে ভবন তৈরি করা হবে তাতে যে বড় ও কনক্রিট সেকশন দেয়া হয় তাতে এমন শক্তি দেয়া যেন তা যে কোনো ধরনের ঝাকুনিতে টিকে থাকতে পারে। এরপর আছে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনে ভূমিকম্প ফ্যাক্টর বিবেচনা করা যেমন কোনো ভবনের কাঠামোতে বিম ও কলামের জয়েন্টে যে শক্তি সৃষ্টি হয়। বিম ছাড়া ছাদ নির্মাণ করতে সেই শক্তি হয় না। সবচাইতে বড় কথা হলো কনক্রিটের কোয়ালিটি। আমাদের দেশের যে কোম্পানিগুলো আছে তাদের মান নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে নিম্নমানের কনক্রিট ব্যবহার করায় ভবন ঝুঁকির মধ্যে থেকে যায়।
ঢাকা শহরের ভবনগুলোর আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো ফাউন্ডেশন ত্রুটি। তাই ভবন নির্মাণের সময় যত পারা যায় নীচের ফাউন্ডেশন তত শক্ত ও নিখুঁত করা। এবার আসি ভূমিকম্প শুরু হলে কি করণীয়। প্রথমে যেটি করতে হবে তা হলো মনোবল ঠিক রাখা, অস্থির না হয়ে ঠান্ডা মাথায় কাজ করা। ভূমিকম্পের সময় ঘরের মধ্যে থাকলে দেয়ালের কোনায় অথবা শক্ত খাট বা টেবিলের নীচে আশ্রয় নেয়া। এবং কাচের জানালা কিংবা আলমারি থেকে নিরাপদ দূরে থাকা। সবচেয়ে নিরাপদ হলো বাইরে বেরিয়ে খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নেয়া। কিন্তু ঢাকা শহরের যে অবস্থা তাতে ঘরের চেয়ে বাইরে আরো বেশি ঝুঁকি। তাই বাসায় থাকলে দৌড়ে সিঁড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে কোনো সময়ে লিফট ব্যবহার করা যাবে না। সাথে মোটা তোয়ালে বা বালিশ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা ভালো। ঘরের মধ্যে অন্তত তিন থেকে চার দিনের শুকনো খাবার রাখা। আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেটি করা উচিত তা হলো সেনাবাহিনীর একটি বা দুটি ডিভিশনকে ভূমিকম্পের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া যাতে কোনো ধরনের বড় দুর্ঘটনা হলে ব্যবস্থা নেয়া যায়। তাই পরিশেষে বলব সবার আগে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে যাতে ভবন নির্মাণের পূর্বে তা সঠিক নিয়মে করা হয়।
লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 25 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ