মডেল ও নায়িকাদের স্বর্ণ পাচারে ব্যবহার!

Print

রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের সুবাস্তু ইমাম টাওয়ারে অবস্থিত আপন জুয়েলার্সের সিলগালা করে দেওয়া বিক্রয়কেন্দ্রে গতকাল অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর-আমার সংবাদ

আপন জুয়েলার্সের স্বর্ণ চোরাকারবারির গোপন তথ্য ফাঁস হচ্ছে। দেশের গ্লামার জগতের সুন্দরী উঠতি বয়সী মডেল ও নায়িকাদের আপন জুয়েলার্সের স্বর্ণ পাচারে ব্যবহার করা হতো বলেও গোয়েন্দারা ধারণা করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়টি গোয়েন্দাদের সন্দেহ হচ্ছে বলে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন।রাজধানীর বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তারকৃত স্বর্ণচোরাকারবারির ছেলে সাফাত আহমেদ রিমান্ডে গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করছেন। আর ওই সব তথ্য প্রকাশের পর দেশের কয়েকজন সুনামধন্য মডেল, নায়িকা ও সাফাতের ডজন খানেক বান্ধবী গোয়েন্দা আতঙ্কে ভুগছেন। এসব নায়িকা ও বান্ধবীর সঙ্গে সাফাতের শারীরিক সম্পর্কের কথাও গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকার করেছেন। সাফাতের এসব বান্ধবীদের মধ্যে উঠতি বয়সী কয়েকজন মডেলও রয়েছেন। এমনকি তার সঙ্গে বাংলাদেশের সিনেমা জগতের ৪ জন নায়িকার সঙ্গে নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক মেলামেশা করতেন বলেও স্বীকার করেছেন।গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত জানিয়েছেন, প্রতিদিন তার হাতখরচ বাবদ ২ লাখ টাকা ব্যয় হতো। আর এ টাকার জোগান দেন তার বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিকদের একজন দিলদার আহমেদ। তিনি এসব টাকা নিয়েই প্রায় প্রতি রাতেই পার্টি করতেন। পাঁচ তারকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এসব পার্টিতে বন্ধু-বান্ধবীরা হাজির থাকতেন। এসব পার্টিতে বান্ধবীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কও করতেন। আর এসবকিছুই সমঝোতার ভিত্তিতে করা হতো। বনানীতে ধর্ষিত দুই ছাত্রীর সঙ্গেও সমঝোতার ভিত্তিতেই সব কিছু হয়েছে বলে সাফাত দাবি করেছেন।
তিনি গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা

স্বীকার করে বলেছেন, ওই রাতেও জোর করে কিছুই করা হয়নি। এর সপক্ষে সাফাত কিছু প্রমাণও দিয়েছেন গোয়েন্দাদের। এর মধ্যে সাফাত আহমেদ অভিযোগকারী দুই তরুণীর মধ্যে একজনের সঙ্গে ঘটনার রাতে তোলা ঘনিষ্ঠ কিছু ছবিও (সেলফি) দেখিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাফাত আহমেদের দেয়া তথ্য তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন। তবে ওই দুই তরুণীর সঙ্গে তাদের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি আপসে হওয়ার দাবি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যতগুলো সম্পর্ক তিনি মেয়ের সঙ্গে করেছেন একটিও জোর করে নয়, সবই অর্থের বিনিময়ে। তার একডজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী এবং চার জন নায়িকার সঙ্গেই মেলামেশা করতেন তিনি। এর মধ্যে ৪ নায়িকার সঙ্গে নিয়মিতই মেলামেশা হতো তার। আর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সবার নামই প্রকাশ করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি সূত্রটি।

আপন জুয়েলার্স বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, হীরা ও মাদক আটকের ঘটনায় আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষকে তলব করেছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। আর অবৈধভাবে মদ রাখার দায়ে বনানীর হোটেল ‘দ্য রেইনট্রি’ কর্তৃপক্ষকেও ডেকে পাঠানো হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক (ডিজি) মইনুল খান গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন। আগামী ১৭ মে (বুধবার) বেলা ১১টায় আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষকে শুল্ক গোয়েন্দাদের কাকরাইলের সদর দপ্তরে কাগজপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়েছে। আর একই সময় দ্য রেইনট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) মদ রাখার দায়ে সমন দেওয়া হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দারা আপন জুয়েলার্সের ৫টি শোরুমে গত রোববার অভিযান চালায়।

ওই অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে ৮৫ কোটি টাকার স্বর্ণ ও হীরা উদ্ধার করে। এর মধ্যে ২৮৬ কেজি স্বর্ণ ও ৬১ গ্রাম হীরা রয়েছে। আর এগুলো উদ্ধার করে আইন অনুসারে সিলগালা করে শুল্ক গোয়েন্দাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরা রাখার ব্যাপারে আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এ বিষয়েই জানতে তাদের ডেকেছে গোয়েন্দা বিভাগ। প্রসঙ্গত গত ৫ বছর ধরে দেশে বৈধভাবে সোনা আমদানি বন্ধ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের সেল ফোনে বারবার ফোন করা হলেও তিনি তার ফোনটি রিসিভ করেননি।

অপরদিকে গত রবিবার শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানকালে গুলশানের সুবাস্তু টাওয়ারে আপন জুয়েলার্সের আরেকটি শাখা বন্ধ পাওয়ায় ইনভেন্টরি করার উদ্দেশে সবার উপস্থিতিতে সেটিও সিলগালা করা হয়েছে। এছাড়াও একইদিনে দ্য রেইনট্রি হোটেলে শুল্ক গোয়েন্দার আরেকটি দল অভিযানে গিয়ে ১০ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করে। এই মদ উদ্ধারের সময় হোটেল কর্তৃপক্ষ বারের লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। ফলে অবৈধভাবে বিদেশি মদ রাখার দায়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

অপর এক সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত বনানীর রেইন ট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় মামলা নিতে গড়িমসি, অভিযোগকারীদের হয়রানি ও দায়িত্বে অবহেলায় ফেঁসে যাচ্ছেন বনানী থানার ওসি ফরমান আলী। তদন্ত কমিটির জেরার মুখে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। দুই অভিযোগকারীর মামলা গ্রহণে কেন বিলম্ব করা হয়েছে, মামলার আসামিদের সঙ্গে কী কারণে ওসি যোগাযোগ করেছেন এমন সব প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি ওসি ফরমান আলী। তিনি তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হন।

এর আগে তিনি ৫ দিনের ছুটি শেষ করে রবিবার থানায় যোগদান করেন। তদন্ত কমিটির প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এসময় তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা এবং তাকে বেশ নার্ভাস লক্ষ্য করা গেছে বলে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। এই কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন ও যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায়।

গত ২৮ মার্চ বনানীর দ্য রেইন ট্রি হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে দুই ছাত্রীকে ডেকে ধর্ষণ করা হয়। এরপর গত ৪ মে দুই অভিযোগকারী বনানী থানায় মামলা করতে যান। তখন থানার ওসি তাদের চরিত্র হননের চেষ্টা করেন। এরপর থানা থেকে তাদের বের করে দেন। এরপর গত ৬ মে দুই অভিযোগকারী থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, থানার ওসি মামলার আসামিদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। এ কারণে তিনি এ মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো বাদীর চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন।

ধর্ষিতা দুই ছাত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বলতে পারেন আমরা থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে দ্বিতীয়বার পুলিশের কাছে ধর্ষণের শিকার হয়েছি।’ এরপরই নড়েচড়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন। গঠন করে তদন্ত কমিটি। তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ মিললে ওই পুলিশ কর্মকর্তা সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত হতে পারেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ধর্ষিত দুই ছাত্রীর একজন গত ৬ মে বনানী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় সম্ভ্রমহানির অভিযোগ আনা হয়েছে সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফের বিরুদ্ধে। অন্যরা এ কাজে সহযোগিতা করেছেন। সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ঘটনার ভিডিও করেছেন। সাফাত-নাঈম এখন পাঁচ দিনের রিমান্ডে।

তবে পুলিশ বলছে, সাফাত, নাঈম, সাদমান ও ঢাকার এক সংসদ সদস্যের ছেলে বনানী ১১ নম্বর সড়কে একটি রেস্তোরাঁ চালান। এ ছাড়া তাদের একাধিক সীসা বার রয়েছে। মামলার বাদীর অভিযোগ, সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের দাওয়াত পান তিনি। দিনটি ছিল ২৮ মার্চ। এক বান্ধবীসহ তিনি বনানীর হোটেল রেইন ট্রিতে যান। সেখানে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয় তাদের। এরপর রাতভর আটকে রেখে সাফাত ও নাঈম তাদের সম্ভ্রমহানি করেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1354 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি