মণিরামপুরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে গেছে

Print

মণিরামপুরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে গেছে

 

মণিরামপুরে নবম শ্রেণির ছাত্রীকে অচেতন করে অপহরণ এরপর ধর্ষণ ও ধর্ষণের ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। তবে ধর্ষণের মামলা হয়নি ১৬ দিনেও। উপরন্তু মোটা টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ঘটনা চাপা দিয়ে বিষয়টিকে অপহরণ বলে চালানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ, ধর্ষক রুমান পুলিশের ছেলে ও তার সহযোগীরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ তাদের ধরছে না। ফলে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর পরিবার। এদিকে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে জানা যায়, মাস চারেক আগে মালয়েশিয়া প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিয়ে হয় মণিরামপুরের রাজগঞ্জ এলাকার এক নির্মাণশ্রমিকের স্কুলপড়ুয়া মেয়েটির। দেশে ফিরে ছেলেটি তার স্ত্রীকে নিজ ঘরে তুলে নিয়ে যাবেন বলে কথা রয়েছে।
সম্প্রতি পাশের গ্রামের আজিজুরের বখাটে ছেলে রয়েল (২০) ওই ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি রাজি না হওয়ায় রয়েল ও একই গ্রামের মোর্শেদের ছেলে রুবেল মিলে রাজগঞ্জ বাজারের ভাড়াটিয়া পুলিশ সদস্য হাবিবুরের ছেলে রুমানের সঙ্গে মেয়েটির পরিচয় করিয়ে দেয়।
গত ২৯ জানুয়ারি সকালে মেয়েটি স্কুলে যায়। সেখান থেকে তাকে অচেতন করে রয়েল ও রুবেলের সহযোগিতায় রুমান পাশের মশ্মিমনগর ইউনিয়নের নলতা গ্রামের সাখাওয়াত কবিরাজের বাড়িতে নিয়ে যায়। কবিরাজকে ‘ম্যানেজ’ করে অচেতন অবস্থায় ওই ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে তারা। এরপর ধর্ষণ করে রুমান। ধর্ষণের ভিডিও তার মোবাইল ফোনে ধারণ করে রুবেল ও রয়েল। জ্ঞান ফিরলে মেয়েটি তাদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে। একপর্যায়ে মেয়েটির চিৎকারে স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান আশপাশের লোকজনের সহায়তায় ধর্ষক রুমানকে পাকড়াও করে পিটুনি দেন। কিন্তু জনতার হাত থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় রয়েল ও রুবেল।
এদিকে, স্কুল থেকে মেয়ে ফিরে না আসায় বিকেল থেকে তাকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। সন্ধ্যার পরে তিনি জানতে পারেন, নলতা গ্রামে তার মেয়ে রয়েছে। বিষয়টি জানানো হয় রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকেও। রাতেই পুলিশের সহায়তায় আশংকাজনক অবস্থায় মেয়েকে হেফাজতে নেয় তার পরিবার। তবে ধর্ষক রুমানকে হাতে পেয়েও পুলিশ ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ।
মেয়েটির বাবা জানান, পরদিন মণিরামপুর থানায় গিয়ে বিষয়টি খুলে বললে পুলিশ অপহরণের মামলা নেয়। যার তদন্তভার পড়ে রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের আইসি আইনুদ্দীনের ওপর। এরই মধ্যে ওই ছাত্রীর মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হয়। যাতে ওই ঘটনার ভিডিওচিত্র ছিল। একইসঙ্গে ভিডিওটি এলাকায় ছড়িয়ে দেয় রুমান ও তার সহযোগীরা। নিজের মোবাইল ফোনে ধর্ষণের ভিডিও দেখে আত্মহত্যার চেষ্টা করে মেয়েটি। তবে, ভিডিওটি পুলিশকে দেখালে সেটা ‘এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়; আগের অন্য কোনো ঘটনা’ বলে মামলা নেয়নি পুলিশ।
কিন্তু, স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের দাবির মুখে পুলিশ ওই ছাত্রীর ডাক্তারি পরীক্ষা করায়। একইসঙ্গে মেয়েটির জবানবন্দি রেকর্ড করেন যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
এদিকে, স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ভিডিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে রুমানসহ তার দুই সহযোগী গা-ঢাকা দিয়েছে। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্কুলছাত্রীর পরিবারকে মামলা না করতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবারটির। মামলা করলে ওই ছাত্রীর ছোটভাইকে হত্যা করা হবে বলে অনবরত শাসানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সহায়তার দুই লাখ টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন মেয়েটির বাবা-মা।
মেয়েটির মা জানান, তার মেয়ের চার মাস আগে মোবাইল ফোনে বিয়ে হয়েছে। তারপরেও পুলিশের ছেলে রুমান ও তার দুই বন্ধু রুবেল ও রয়েল তাকে তুলে নিয়ে অচেতন করে পাশবিক নির্যাতন করেছে। প্রথমে তিনি অপহরণের মামলা করেছিলেন। পরে ভিডিও দেখার পর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পুলিশ টাকা খেয়ে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে তার অভিযোগ।
তিনি বলেন, ‘রুমান ও তার সহযোগীরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিচ্ছে। আমাদের বাড়িঘরেও হামলা চালিয়েছে। আমরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ঠিকমতো ঘরে থাকতেও পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘মেয়ের বাবা বাইরে রাজমিস্ত্রির কাজ করে বেড়ান। এখন ছেলেমেয়েকে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। তাছাড়া রুমান ওই ভিডিওটি মালয়েশিয়ায় আমার জামাইয়ের কাছেও পাঠিয়েছে। ফলে, আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে চলেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাই, আছিরন, ফুলজান, রাবেয়া, রওশনারা ও শাহাদতসহ অনেকেই জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত রুমান, রয়েল ও রুবেল মাদকাসক্ত ও ছিনতাইকারী। এমন কোনো খারাপ কাজ নেই, যা তারা করে না। তারা এই তিনজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
অভিযুক্ত রুবেলের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। আর অপরাধী প্রমাণিত হলে ছেলের শাস্তি দাবি করেছেন রয়েলের মা শাহানারা বেগম ।
জানতে চাইলে এসআই আইনুদ্দীন বলেন, ‘কয়েকজন সাংবাদিক দুই লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন। আমি কোনো টাকা নিইনি বরং ভিডিওটি দেখার পর আদালতে ওই ছাত্রীর জবানবন্দি রেকর্ডসহ তার ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হয়েছে।’
মণিরামপুর থানার ওসি বিপ্লবকুমার নাথ জানান, এই বিষয়ে প্রথমে অপহরণের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। পরে ওই ছাত্রী বলছে, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী তার ডাক্তারি পরীক্ষা এবং আদালতে জবানবন্দি রেকর্ড করানো হয়েছে।
রিপোর্টে ধর্ষণের বিষয়টি প্রমাণিত হলে অপহরণ মামলার সঙ্গে ধর্ষণের ধারাটি যোগ করা হবে বলে তিনি জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘রুমান পুলিশের ছেলে হলেও এই বিষয়ে তার প্রতি কোনো প্রকার সহানুভূতি দেখানো হবে না।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 252 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ