১) মৃগী রোগ, পাকস্থলির সমস্যা ও ক্যাটালেপ্সি

এ ওষুধটি উদ্ভাবন করেছিলেন পল নামক এক সন্ন্যাসী। তবে এটি প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত বিচিত্র উপাদানের সমাহার বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে দেবে যে কারোরই। এ ওষুধটি তৈরিতে ব্যবহার করা হতো যষ্ঠিমধু, সেজ গাছের নির্যাস, উইলো গাছের নির্যাস, গোলাপজল, মৌরি, দারুচিনি, লবঙ্গ, আদা, করমোরান্ট নামক এক জাতের সামুদ্রিক পাখির রক্ত, ম্যান্ড্রেক নামক আলুজাতীয় নিদ্রাকর্ষক বিষাক্ত গাছ, তিন প্রকারের মরিচ এবং সব শেষে ড্রাগনের রক্ত!

উপাদানগুলোর নাম পড়ে, বিশেষ করে শেষের দিকের উপাদানগুলো, অনেকেরই হয়তো ভ্রু কুঁচকাতে শুরু করেছে। তবে এগুলোর সবগুলোরই আলাদা আলাদা ঔষধি গুণাবলী রয়েছে।

কফ ও ব্রঙ্কাইটিসের চিকিৎসায় আদিকাল থেকে শুরু করে আজও ব্যবহৃত হয়ে আসছে যষ্ঠিমধু। সেজ গাছের নির্যাস মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। উইলো গাছের নির্যাসে রয়েছে স্যালিসাইলিক এসিড যা অ্যাস্পিরিনের একটি উপাদান। মৌরি, দারুচিনি ও আদা অন্ত্রের বায়ুনাশের মাধ্যমে পেটের শূলবেদনা থেকে মুক্তি দেয় আমাদের।

Dracaena draco

Dracaena draco

করমোরান্ট পাখির রক্ত ব্যবহার করা হতো লৌহের উৎস হিসেবে যা অ্যানিমিয়াতে ভোগা রোগীদের কাজে লাগতো। ম্যান্ড্রেক বিষাক্ত হলেও এর সামান্য ব্যবহারে বেশ চমৎকার ঘুমের ওষুধ তৈরি করা যেত। সবার শেষে আসে ড্রাগনের রক্তের কথা। সত্যি কথা বলতে গেলে, এটা আমাদের কল্পনার সেই উড়ন্ত ভয়ানক প্রাণী ড্রাগন না একেবারেই। বরং মরক্কো, কেপ ভার্দে ও ক্যানারি দ্বীপে পাওয়া Dracaena draco গাছের রক্তিম রজনকেই দেয়া হয়েছিলো বিচিত্র এ নাম। আধুনিক গবেষণার দেখা গেছে যে, এ রজনটির এন্টিসেপ্টিক, এন্টিব্যাক্টেরিয়াল, এন্টিভাইরাল ও ক্ষত সারানোর মতো গুণাবলী আছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে এখনও আমাশয়ের নিরাময়ে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

২) সাইঅ্যাটিকা

সাইঅ্যাটিক নার্ভ হল মানবদেহের সবচেয়ে বড় নার্ভ যা পেলভিস থেকে শুরু হয়ে একেবারে পায়ের পাতায় গিয়ে শেষ হয়। এ নার্ভে কোনো রকমের ব্যথাকেই বলা হয় সাইঅ্যাটিকা।

সাইঅ্যাটিকা

সাইঅ্যাটিকা

তো এই সাইঅ্যাটিকার নিরাময়ের জন্য মধ্যযুগে যে ওষুধটি ব্যবহার করা হতো তার প্রস্তুত প্রণালী জেনে নেয়া যাক- “লাল বর্ণের ষাঁড়ের এক চামচ পিত্তরস, দুই চামচ জলমরিচ, রোগীর মূত্র চার চামচ (!), একটি পরিণত আখরোটের অর্ধেক ওজনের সমান জিরা এবং একটি ছোট আখরোটের সমান ওজনের চর্বি নিতে হবে ষাঁড়ের বৃক্ক থেকে। জিরাকে ঠিকমতো পিষে ফেলতে হবে।

এবার এগুলোকে পানিতে সিদ্ধ করতে হবে যতক্ষণ না মিশ্রণটি মণ্ডের রুপ না নেয়। এরপর রোগীকে তার পশ্চাদ্দেশ আগুনের ততটাই কাছে নিতে হবে যতটা সে সহ্য করতে পারে। এটি শেষ হলে রোগীর ব্যথার স্থানে সাড়ে সাত মিনিট থেকে পনের মিনিট পর্যন্ত সেই মণ্ডটি মলমের মতো করে মাখাতে হবে। এরপর পাঁচ-ছয় বার ভাজ করে রাখা একটি গরম কাপড়ে মৃদু চাপড় দিতে হবে! রাতের বেলায় বেশ কয়েকবার ভাঁজ করে রাখা একটি উষ্ণ চাদর রোগীর ব্যথার স্থানে বিছিয়ে দিতে হবে। এভাবেই তাকে থাকতে হবে দুই-তিনদিন। আশা করা যায় এরপর তার রোগ একেবারেই সেরে যাবে।”

তবে আধুনিক তত্ত্বমতে, এত কসরত করে তৈরি মণ্ডের ভূমিকা খুব একটা ছিলো না। বরং কয়েকদিন বিছানায় শুয়ে থাকার মতো বিশ্রাম ও হিট ট্রিটমেন্টই সাইঅ্যাটিকার বিরুদ্ধে আসল কাজ করতো।

৩) আগুনে পোড়া

কোনো কারণে আগুনে দেহের কোনো অংশ পুড়ে গেলে সেজন্য বেশ অদ্ভুত এক চিকিৎসা পদ্ধতির দ্বারস্থ হতো মধ্যযুগের বাসিন্দারা। এর চিকিৎসা হিসেবে লেখা ছিলো-

শামুক

শামুক

“প্রথমেই একটি জীবন্ত শামুক খুঁজে বের করো। এরপর এর শরীরের নরম অংশটি পোড়ার উপর আলতো করে ঘষতে থাকো। কিছুদিন পরেই তুমি সৃষ্ট ক্ষত থেকে মুক্তি পাবে!”

বেশ অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাই না? এবার তাহলে চলুন এর বিজ্ঞানভিত্তিক কারণটি জেনে নেয়া যাক। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, শামুকের শরীরের নরম অংশ থেকে প্রাপ্ত পিচ্ছিল পদার্থের এন্টিঅক্সিডেন্ট, এন্টিসেপ্টিক, এন্টিএস্থেটিক, এন্টি-ইরিটেটিং, এন্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, এন্টিবায়োটিক ও এন্টিভাইরাল গুণাবলী রয়েছে। সেই সাথে এতে রয়েছে কোলাজেন ও ইলাস্টিন যা চামড়া সেরে উঠতে সহায়তা করে।

এত গুণের অধিকারী শামুককে তাই আলিঙ্গন করে নিয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও। এখনও আগের মতোই শামুকের দেহের সেই আঠালো পদার্থ ব্যবহার করা হয় ‘স্নেইল জেল’ নাম দিয়ে। কাটা, জ্বালাপোড়া ইত্যাদি নিরাময়ে ওষুধ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয় সেটি।

৪) চোখের আঞ্জনি (Stye)

“সমপরিমাণ পেঁয়াজ ও রসুন নিয়ে সেগুলো ভালোভাবে ভর্তা করো। এবার সমপরিমাণ ওয়াইন ও ষাঁড়ের পিত্তরস নিয়ে সেগুলো পেঁয়াজ-রসুন ভর্তার সাথে মেশাও। এবার মিশ্রণটিকে একটি পিতলের পাত্রে নিয়ে সেখানে নয় রাতের জন্য রেখে দাও। এরপর মিশ্রণটিকে একটি কাপড়ের সাহায্যে ছেঁকে নাও। এরপর একটি পালকের সাহায্যে রাতের বেলায় সেটি চোখে লাগিয়ে দিও।”

পেঁয়াজ ও রসুন

পেঁয়াজ ও রসুন

অ্যাংলো-স্যাক্সনদের এই মলম কতটা কাজে আসতো এখন তাহলে সেটি দেখা যাক।

পেঁয়াজ, রসুন ও ষাঁড়ের পিত্তরস- এগুলোর এন্টিবায়োটিক গুণাবলী আছে যা সম্ভবত আঞ্জনি নিরাময়ে সাহায্য করতো। ওয়াইনে থাকা এসিটিক এসিড নয় দিন ধরে পিতলের পাত্র তৈরির উপাদান কপারের সাথে বিক্রিয়া করে কপারের লবণ তৈরি করতো, যা ব্যাকটেরিয়ানাশক।

সাম্প্রতিক কালে নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ঠিক এই মিশ্রণটিই তৈরি করেছিলো। শুরুতে পেঁয়াজ-রসুন-ওয়াইন-পিত্তরসের মিশ্রণটি থেকে অনেকটা খাবার দোকানের মতোই গন্ধ বেরোচ্ছিলো। কিন্তু নয় দিন পর সেটি বেশ অদ্ভুত বর্ণ ধারণ করে, গন্ধও হয়ে যায় বেশ বিশ্রী। তারপরও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো মিশ্রণটির কোনো এন্টিবায়োটিক গুণাবলী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা। আর তারা সেটা পেয়েছিলও!

৫) গেঁটেবাত

পেঁচা

পেঁচা

“একটি পেঁচা নিয়ে সেটি জবাই করো। এরপর সেটির লোম তুলে পরিষ্কার করো। এবার পেঁচাটিকে কেটে পরিষ্কার করে লবণ দিয়ে মাখাও। এবার একে একটি নতুন পাত্রে নিয়ে পাথর দিয়ে ঢেকে দাও। এবার একটি চুল্লীতে নিয়ে পেঁচাটিকে পোড়াতে থাক। এরপর সেই পোড়া পেঁচাকে শূকরের চর্বির সাথে ভালো করে চূর্ণ করে মেশাও। সেই মিশ্রণটিকে এরপর রোগীর ব্যথার স্থানে লাগিয়ে দাও।”

গেঁটেবাত সারানোর মলমের রেসিপি ছিলো ঠিক এমনই। বিচিত্র এ মলমটি একজন রোগীর গেঁটেবাত সারাতে কতটা কার্যকরী ছিলো তা জানা না গেলেও সেটি যে অনেক পেঁচার জীবন কেড়ে নিয়েছে তা তো বলাই বাহুল্য।

৬) মাইগ্রেন

“প্রথমে একটি পাত্রের অর্ধেক পরিমাণ যব নাও। এরপর তাতে এক মুঠ পরিমাণ বেটোনি (Betony), ভার্ভেইন (Vervain) ও অন্যান্য ঔষধি গাছ নাও যেগুলো মাথার রোগ সারাতে কার্যকর। এরপর সেই মিশ্রণটিকে ভালো করে সিদ্ধ করো। সিদ্ধ শেষ হলে প্রাপ্ত মিশ্রণটিকে একটি কাপড়ে পেঁচিয়ে রোগীর মাথায় দিয়ে রাখো। রোগীর ব্যথা কমে যাবে।”

বেটোনি অবশ্য অনেক আগে থেকেই রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধ্যযুগে ও টিউডরদের সময়কালে ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা খাওয়ার ওষুধ ও মলম তৈরিতে এটি ব্যবহার করতেন। বর্তমানকালেও বেটোনি থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপাদান মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগানো হয়। একইভাবে ভার্ভেইন থেকে পাওয়া উপাদান কাজে লাগিয়েও মাইগ্রেন, অবসাদ ও দুশ্চিন্তার নিরাময়ে বিভিন্ন ওষুধ এখন তৈরি করা হয়।

৭) গলার প্রদাহ (Quinsy)

গলার প্রদাহ সারাতে যে মলমটি তৈরি করা হতো তার প্রস্তুতপ্রণালী ছিলো বেশ অদ্ভুত রকমের। নীচে এখন সেই রেসিপিই তুলে ধরছি।

বিড়াল

বিড়াল

“একটি বিড়াল নিয়ে সেটি প্রথমে মেরে ফেলো। এরপর তার চামড়া ছাড়িয়ে পরিষ্কার করো এবং পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করো। এবার শূকর ও ভালুকের চর্বি, রজন, মেথি গাছ, সেজ গাছ, হানিসাক্‌ল (Honeysuckle – পুষ্পলতাবিশেষ) ও মোম নিয়ে সেগুলো একসাথে মেশাও। সেই মিশ্রণটিকে এবার বিড়ালের পেটের ভেতর ঢুকিয়ে বিড়ালটিকে সেঁকতে থাক। কিছুক্ষণ পর প্রাপ্ত পদার্থটিকে রোগীর গলায় মাখিয়ে দিবে।”

৮) কাশি

“প্রথমে হোরহাউন্ড (Horehound) গাছের নির্যাস নাও। এরপর সেটিকে ডায়াপেনিডিওনের (Diapenidion) সাথে মিশিয়ে খেয়ে নাও।”

কাশি সারাতে আজকের দিনে আমরা নানা কোম্পানির ট্যাবলেট কিংবা সিরাপ গলাধঃকরণ করলেও তখনকার সময়ে এটাই ছিলো উৎকৃষ্ট রেসিপি। হোরহাউন্ড এক ধরনের ঔষধি গাছ যা কাশি সারাতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে পানি, যব, চিনি ও ডিমের সাদা অংশ মিশিয়ে বানানো হতো ডায়াপেনিডিওন।

৯) সিফিলিস

পারদ

পারদ

পারদের বিষাক্ততার কথা কম-বেশি আমাদের সবারই জানা আছে। তবে বিশ শতকের আগ পর্যন্ত ডাক্তারগণ সিফিলিসের চিকিৎসার জন্য দ্বারস্থ হতেন পারদেরই। আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ক্ষতসৃষ্টি, দাঁত পড়ে যাওয়া, স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা থেকে শুরু করে লিভার ও কিডনী নষ্ট হয়ে রোগী মারা যাওয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে।

১০) আর্সেনিক

আধুনিক যুগের মিডিয়ার কল্যাণে আর্সেনিক গ্রহণের ভয়াবহ পরিণামের কথা আমাদের অজানা নেই। তবে আঠারো শতকের শেষের দিক থেকে প্রায় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ম্যালেরিয়া ও সিফিলিসের নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত ওষুধের অন্যতম উপাদান ছিলো এ আর্সেনিক।

১১) হেরোইন

হেরোইন

হেরোইন

মাদকদ্রব্য হিসেবে হেরোইনের নাম শোনে নি এমন একজনও বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে আঠারো শতকের শেষের দিকে এ হেরোইনই আলসার, কাশি, গায়ে ব্যথার ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে যখন এ ওষুধ সেবনকারী রোগীরা আস্তে আস্তে এর নেশায় জড়াতে শুরু করে, তখন ১৯১৩ সাল থেকে এর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়।

১২) রেডিয়াম

উনিশ শতকের কথা, তেজষ্ক্রিয়তার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে তখনও এত জানাশোনা ছিলো না মানুষজনের। তখন আর্থ্রাইটিস থেকে শুরু করে নপুংসতার মতো অসুখ নিরাময়ে লোকজন রেডিয়ামের প্রলেপ দেয়া বালতিতে পানি পান করতো। পরবর্তীতে তেজষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে আরো জ্ঞান লাভের পরই বন্ধ হয় এ ভুল চর্চা।

১৩) শামুকের সিরাপ

অদ্ভুত এ সিরাপ তৈরির কথা লিখেছিলেন একজন ডাক্তার ১৭২৮ সালে। তিনি নাকি এ সিরাপ খাওয়ার পর দুর্বলতা কাটিয়ে বেশ তরতাজা বোধ করছিলেন।

শামুক

এজন্য সকালবেলায় একটি শামুক ধরে তার খোলস আলাদা করে ফেলতে হবে। এরপর সেই শামুকটিকে চিরে তাতে চিনি মাখাতে হবে। চিনি দেয়া শামুককে এরপর একটি ব্যাগে ভরে ঝুলিয়ে দিতে হবে। একসময় শামুকের শরীর থেকে যে তরল পদার্থটি বেরিয়ে আসবে (চিনির জন্য মিষ্টি স্বাদের), সেটিকেই সিরাপ হিসেবে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই ডাক্তার।