মরণনেশা মাদক নিয়েই ওদের বসবাস

Print

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এ মৌলিক চাহিদাগুলো একটি দেশের সকল নাগরিকের জন্য প্রজোয্য। আর এই সব মৌলিক চাহিদাবঞ্চিত শিশুদের আমরা টোকাই, পথকলি, ছিন্নমূল কিংবা পথশিশু বলে থাকি।

খোলা আকাশের নিচে রাস্তার ধারেই হয়তো তাদের জন্ম। এখানেই বেড়ে ওঠা এখান থেকেই অবহেলিত জীবনের পথ চলা। আমাদের সভ্য সমাজের এ অবহেলায় তাদের জীবন হয়ে উঠে ভয়ঙ্কর।

বেড়ে ওঠার জন্য তাদের যা প্রয়োজন সেগুলো না পেয়ে তারা শুরু করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ঠিকানাবিহীন এ শিশুগুলো
একদিন হাতে তুলে নেয় মাদক নামের বিষ। এরা সারাদিন কাগজ কুড়িয়ে, বোতল কুড়িয়ে, ফুল বিক্রি করে মানুষের কাছে ভিক্ষা চেয়ে যা পায় তা দিয়েই চলে এদের মাদক সেবন। মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, নকটিন, সিলিকসিন ও সোনালি নামে নেশার ট্যাবলেট- এগুলো হয়ে ওঠে তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

রাজধানীর রেলষ্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও বস্তিগুলোতে একটু আলোকপাত করলে দেখা যায় এই সব চিত্র। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে যে পরিমান পথশিশু রয়েছে তার ৯০ শতাংশই মাদকাসক্ত। আর এদের বয়স যখন ১০ বছর অতিক্রম করে তখনই তারা বিভিন্ন রকমের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকে শুরু হয় মাদকাশক্ত জীবনযাপন।

রাজধানীর বিমান বন্দর রেলওয়ে স্টেশনে সরজমিনে গিয়ে দেখা মিলল রাজু নামে এক পথ শিশুর সাথে। তারা বাবা-মা কেউ নেই। প্রায় দুই বছর ধরে সে টোকাইয়ের কাজ করছে। প্রতিদিন তার আয় প্রায় ২০০ টাকার মতো। ১২ বছরের একটা শিশু ২০০ টাকা কি করে?

রাজুর কাছে জানায়, খাওয়া দাওয়ারের জন্য ১০০ টাকা আর বাকি ১০০ টাকার দিয়ে সে গাঁজা, ড্যান্ডি কিংবা গামবেল্ডিং ইত্যাদি কিনে। আর সেগুলো সেবন করে।

কিন্তু কারা এসব জিনিস এই ঠিকানাবিহীন শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছে? কোথায় পায় এসব জানতে চাইলে সে বলে, ওদের কিছু বড় ভাই আছে যারা এগুলো বিক্র করে, তবে সে তাদের নাম জানে না।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও আট শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে।

সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে। আর এ মাদকগুলো একটু আলাদা। গাঁজা, হেরোইন, ঘুমের ওষুধ, ডান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে এবং পেট্রল শুঁকে নেশা।

মাদকের ভয়াবহ চিত্রের দেখা মিলে রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনে। সন্ধ্যার পরই নাকি সেখানে শুরু হয় মাদকের সমরাহ। এমনটাই জালালেন কবির নামে এক পথশিশু।

কবির জানায় ড্যান্ডি তাদের সব থেকে প্রিয়। খুব সহজেই পাওয়া যায় ড্যান্ডির দেখা। এটা তাদের কাছে খুবই সহজলভ্য নেশা। ড্যান্ডি জিনসটা আসলে কি জানতে চাইলে কবির তর তর করে বলতে থাকে, জুতা জোড়ানো এক ধরণের আইকা গাম। আর এ গাম পলিথিন ব্যাগের ভিতরে রেখে ফুঁ দিয়ে পলিথিনটা ফুলাতে হয়। তারপর নাক-মুখ দিয়ে জোরে জোরে টানলে ঝিমুনি ধরে, নেশা হয়।

এই সব মারাত্মক সব নেশা নিয়ে মরণের পথে ধাবিত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। ২০১১ সালের সরকারি একটি জরিপ অনুযায়ী সারাদেশে ১০ লাখ পথশিশুর তথ্য পাওয়া যায়।

সেভ দ্য চিলড্রেনের কমিউনিকেশন অফিসারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে পথশিশুদের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। অপরাজেয় বাংলার নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু জানান, শুধু রাজধানীতেই প্রায় ৮ লাখ পথশিশু রয়েছে।

বর্তমান সরকার ৪০ হাজার পথশিশুকে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও এর কার্যকারিতা তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। দিন দিন এরা এগিয়ে যাচ্ছে মাদক নামক ভংঙ্কর মৃত্যুর দিকে। কিন্তু দেখার কেহ নেই। আমাদের এ সমাজের এরাও একটি অংশ। অথচ এই অবহেলিতো শিশুদের আত্মর্নাদ শোনারাও কেহ নাই।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 75 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ