‘মামা স্টুডেন্ট’ ভাড়া অর্ধেক’

Print

‘মামা স্টুডেন্ট’

শুনেছিলাম রবিবার টঙ্গিতে পাখির হাট বসে, তাই পাখি কিনতে টঙ্গি এসেছি। হাট ঘুরে মনের মতো পাখি না পেয়ে একটু খারাপই লাগছিলো। মন খারাপ নিয়েই একটি লোকাল বাসে উঠে পড়লাম বাসায় যাবো বলে। বাসের ভিতর প্রচন্ড ভীড় থাকায় দরজায়ই দাড়াতে হল। একটু পর খেয়াল করলাম, বাসের মাঝ থেকে দরজা প্রযন্ত মানুসে ঠাসা কিন্তু পিছনটা একদম খালি।

হেলপার ছেলেটি বার বার যাত্রীদের একটু পিছনে যেতে অনুরোধ করছে। রাস্তায় গাড়ি কম তাই যে যেভাবে পারছে গাড়িতে উঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু গাড়ির মাঝ বরাবর দাড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কথা শুনে ভীষণ মন খারাপ হলো। কেউ তো হেলপারের কথা শুনলোই না বরং ভিতর থেকে একজন বলে উঠল ‘ওই বেটা! লোক কী তোর মাথায় উঠাবি গাড়ি টান দিতে বল’। অনেকেই আবার তাকে খারাপ গালিও দিচ্ছে। তবে হেলপার তাদের কোন কথা কানে নিচ্ছে না, সে যাত্রী ডেকেই যাচ্ছে।

পাশ থেকে হেলপারকে কেউ একজন বলল ভাই এতো বকাঝকা করছে আপনার কী কিছু মনে হয় না। কেন একটু একটু পর পর গাড়ি থামান? জবাবে হেলপার বলল, ‘বকাঝকা এখন পান্তা ভাত, বকাঝকা শুনতে শুনতে এখন বুঝতে পারি না কোনটা বকা আর কোনটা ভালো কথা। যাত্রীদের কথায় কিছু মনে করলে পেটে ভাত যাবে না, তারা অনেক কিছুই বলবে। দুই এক পা না হেটে বাসার সামনে থেকে গাড়ি থামিয়ে গাড়িতে উঠবে আবার তারাই বলবে গাড়ি যেখানে-সেখানে থামাই কেন?

এই গাড়িতে যে যাত্রী আছে তার অর্ধেকেই ছাত্র, ভাড়া চাইলেই বলবে ‘মামা স্টুডেন্ট’ আর তাই ভাড়া অর্ধেক। তাছাড়া এই যাত্রীগুলোর মধ্যে অনেক ভদ্রলোক আছেন যারা ভাড়া না দিয়ে নেমে যাবেন। এতো যাত্রীর মধ্যে সবাইকে চিনে রাখা তো আর সম্ভব না। আর চিনে রাখলেও বা কী, ভাড়া না দিয়েও যদি বলে ভাড়া দিয়েছে তাই মেনে নিতে হবে। আমি চিনে রাখলেও লাভ নাই, তারা যা বলবে সেটাই সত্য আমরাই শুধু মিথ্যা কথা বলি।

তারপরেও যদি কোন সময় বলি কখন ভাড়া দিলেন, তখন সে বলবে একটা কানের নিচে মারলে সব মনে পরবে তোকে ভাড়া দিয়েছি কী না। তাই তাদের সাথেি  এর বেশি কিছু বললে মার খেতে হয়  বলে চুপ করে থাকি। লোকাল বাসে যেই উঠুক তার হাতটা একটু বেশিই চলে, কথায় কথায় মারতে চায় তাছাড়া আমরা তো মার খাবার জন্যই জন্ম নিয়েছি তা না হলে কেন কথায় কথায় মারতে চাইবে বলেন?

অসহায় হেলপারটির এই কথাগুলো শুনতে শুনতে বেশ কয়েকটা ষ্টেশন পার করে এলাম। গাড়ির ভিতরটা একটু খালি হওয়ায় আমি ভিতরে ডুকলাম। তারপরও বসার জায়গা না পেয়ে দাড়িয়ে আছি। গাড়ির ভাড়া কাটছে বছর পনেরর একটি কিশোর ছেলে। আমার কাছে ভাড়া চাইতে এল ছেলেটির সঙ্গে একটু কথা বলার চেষ্টা করলাম।

তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, ছেলেটির নাম হোসেন। সংসারে বাবা নেই। গত ছয়মাস ধরে বাসের কন্ট্রাকটরি করে। বিনিময়ে দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পায়। এই দিয়েই তার সংসার চলে। এই কয়টা টাকা ইনকাম করতে তাকে অনেক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কিন্তু যেকোন নির্যাতন সে হাসি মুখে মেনে নেয়। মানুষের কাছ থেকে ভাড়া কাটতে কেমন লাগে জানতে চাইলে সে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানায় তার কষ্টের কথাগুলো।

কখনো বেশি ভাড়া চায় এই ছুতোয় কখনো বা আবার স্টুডেন্ট কার্ড দেখতে চাইলে ছেলেটির উপর নেমে আসে অত্যাচরের খড়্গ। কপালে জুটে দু একটি চড় থাপ্পর। অথচ কেউ আজ পর্যন্ত কোনদিন একটু হাত বুলিয়ে আদরের ছোয়া দেয়নি। বলতে বলতে ছেলেটির অজান্তেই হয়তো গড়িয়ে পড়লো দু-ফোটা কষ্টের নোনা জল। এই হোসেনের মতোই আরো কত কিশোর না জানি প্রতিদিন যাত্রীদের এমন নির্যাতনের শিকার হয়! এই অন্যায়ের কী কোন প্রতিকার নেই?

অথচ এই মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকালের সূর্য উঠার আগে ঘুম থেকে উঠে রোদ,বৃষ্টি, ঝড়, শীত উপেক্ষা করে বের হয় মহাসড়কে এবং আমাদের জীবনের দায়িত্ব নিয়ে সুস্থভাবে যথাসময়ে যার যার লক্ষ্যে পৌছে দিচ্ছে। শুধু তাই নয় ঈদ, পূজা, বড়দিনের মতো আনন্দের দিনগুলোতে রাস্তায় থেকে নিজেদের আনন্দ বির্সজন দিয়ে আমাদের আনন্দটা পরিপূর্ন করে করে তোলে। যে মানুষ গুলো আমাদের আপন না হয়েও আপনের চেয়েও বেশি কিছু করে আর আমরা সেই মানুষদের সাথে কেমন আচরণ করি ভাবলে অবাক হতে হয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 184 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ