মালয়েশিয়ায় দেশের লোকের সর্বনাশ করছে বাঙালিরাই

Print

রাজনৈতিক গ্রুপিং-কোন্দলের বলি হয়ে ফরিদুল ইসলাম ফরিদ ও আরিফ হোসেন নামে দুই বাংলাদেশি যুবক মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাদের জেল হাজতে পাঠানো হয়। সাজা খাটার পর তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। একই অবস্থা সিরাজুল ইসলাম মাহমুদ ও মো. ইউনুসের। তারাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে জেল খেটে দেশে ফেরেন।
শুধু এ চার যুবকই নন, মালয়েশিয়া জুড়েই চলছে ‘নোংরা’ রাজনীতি। এক বাঙালি আরেক বাঙালির শত্রুতে পরিণত হচ্ছেন। পাসপোর্ট বা অন্য কোনো কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেই তাকে বৈধকরণে সহায়তার পরিবর্তে বাঙালিরাই একজন আরেকজনকে পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছেন। নানাভাবে হয়রানি করছেন। এতে মালয়েশিয়া পুলিশ আরও উৎসাহিত হয়ে ব্যাপক ধরপাকড়ে নেমেছে। বাংলাদেশি পেলেই নানাভাবে হয়রানি করছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় সরেজমিনে ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, আরিফ হোসেন, সিরাজুল ইসলাম মাহমুদ ও মো. ইউনুস বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা মালয়েশিয়া বিএনপির গ্রুপিং রাজনীতির শিকার। কুয়ালালামপুরের বাংলা মার্কেটের মালিক কাজী সালাউদ্দিনকে মালয়েশিয়া পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তার প্রতিপক্ষ কোনো এক বাংলাদেশিই তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করেছেন বলে জানা গেছে। বুকিত বিন তাঙ্গের রসনাবিলাসের মালিকানা দ্বন্দ্বে পিয়ার আহমেদ আকাশকে পুলিশে ধরিয়ে দেন তারই এক বাংলাদেশি অংশীদার। একপর্যায়ে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জানা যায়, মালয়েশিয়ায়ও বাংলাদেশিরা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে বিভক্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য বা কর্মক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের মতো সেখানেও চলছে বিভাজনের রাজনীতি। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে সহ্য করতে পারে না। মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগেও দুই গ্রুপ। মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রেজাউল করীম রেজা ও সদস্যসচিব ওয়াহিদুজ্জামান ওয়াহিদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ। সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মকবুল হোসেন মুকুল ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামরুজ্জামান কামালের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ রয়েছে। একই অবস্থা বিএনপিতেও। বর্তমানে মালয়েশিয়া বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত। ইঞ্জিনিয়ার বাদল খান ও মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে এক গ্রুপ। তারা বড় একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সভা-সমাবেশ করছেন। আরেকটি গ্রুপে রয়েছেন শহীদুল্লাহ শহীদ ও কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ। বর্তমানে সালাউদ্দিন মালয়েশিয়া কারাগারে। কুয়ালালামপুরে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পার্টনার জটিলতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা অতি লোভের আশায় বাঙালিরা একজন আরেকজনকে হয়রানিতে ফেলছে। পুলিশি হয়রানি ছাড়াও মালয় বা অন্যদের দিয়েও নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায় না। বরং একজন বিপদে পড়লে সবাইকে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র। জানা যায়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সহস্রাধিক বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার রয়েছেন। এর মধ্যে বড় অংশই নিম্নমানের শ্রমিক। পাসপোর্টসহ কাগজপত্রের নানা ঘাটতির কারণে তাদের মালয়েশিয়ায় অবৈধ ঘোষণা করে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১০ লাখের ওপরে বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছে। তাদের বৈধকরণে মালয়েশিয়া সরকার ঘোষণা দিলেও নানাভাবে হয়রানিতে শ্রমিকরা। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনও তেমন সহযোগিতা করছে না। বরং হাইকমিশন অফিসে গেলেও শ্রমিকরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। পদে পদে দিতে হয় ঘুষ। দেশে ফিরে আসার সময় সরকারি ফি ৬০০ রিঙ্গিতের বিপরীতে ঘুষ গুনতে হয় সমপরিমাণ। কুয়ালালামপুরের জালান পুদু এলাকায় বসবাস করেন জুয়েল নামে এক বাংলাদেশি। তিনি জানান, এটা খুবই দুঃখজনক। বলতেও লজ্জা লাগে, বাংলাদেশি হয়ে আরেক বাংলাদেশিকে ধরিয়ে দিচ্ছেন পুলিশের কাছে। এর মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। আবার কেউ ব্যবসায়িক পার্টনারশিপের দ্বন্দ্বে এ ধরনের নোংরা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবারই সতর্ক হওয়া উচিত। ফারুক আহমেদ নামে আরেক বাংলাদেশি তরুণ প্রবাসী জানান, শুধু ব্যক্তিস্বার্থে বা রাজনীতির স্বার্থে একজন আরেকজনকে ধরিয়ে দেওয়ায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে মালয়েশিয়া পুলিশ বিভাজনের সুযোগ নিচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ও হাইকমিশনকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 160 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ