মাসে শতকোটি টাকার গ্যাস চুরি, জড়িত উচ্চপদস্থরাও

Print

দেশে গ্যাসের যে মজুদ আছে তাতে বড়জোর বছর দশেক চলবে। তাই শিল্প তো বটেই, আবাসিক খাতেও গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ আছে, সেসব প্রতিষ্ঠানেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে শিল্প খাতে পড়েছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব; আবাসন ব্যবসায়ও মন্দার অন্যতম কারণ গ্যাসের সংযোগ দিতে না পারা। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সামর্থ্যও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না গ্যাসের অভাবে। এই যখন অবস্থা, তখন শত শত কোটি টাকার গ্যাস চুরির তথ্য উঠে এসেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খোদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা, সিবিএ নেতা এবং শাসক দলের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে চলছে এহেন অপকর্ম।
কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হয়? আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি গ্যাস কোম্পানি প্রতিমাসে প্রকৃতপক্ষে পঞ্চাশ লাখ টাকা থেকে দেড় কোটি টাকার গ্যাস বিক্রি করে; কিন্তু এর বিপরীতে বিল ধরা হচ্ছে মাত্র ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে মূলত গ্যাসের পুরো খনিই চুরি হয়ে যাচ্ছে।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালী জেলায় গ্যাস বিতরণ করে থাকে। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম খান সম্প্রতি বলেছেন, তাদের বিতরণের আওতাধীন ১০টি সিএনজি স্টেশন গড়ে প্রতিমাসে ৬৩ কোটি টাকার গ্যাস চুরি করে আসছিল; কিন্তু সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও ভয়াবহ। তাদের হিসাবে প্রতিমাসে শুধু বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি থেকেই শত কোটি টাকার বেশি গ্যাস চুরি হচ্ছে।
সম্প্রতি চৌর্যকর্মে জড়িত ১৬টি সিএনজি স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে; কিন্তু আমাদের সময়ের অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, অন্তত ৫০টি সিএনজি স্টেশন গ্যাস চুরির সঙ্গে জড়িত। এসব স্টেশনের মধ্যে অধিকাংশেরই মালিক ক্ষমতাসীন দলের নেতা কিংবা তাদের আস্থাভাজন কেউ।
বাখরাবাদ কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষমতাসীনরা জড়িত সত্যি। তবে প্রত্যক্ষভাবে খোদ বিতরণ কোম্পানিরই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িত; সঙ্গে সিবিএ কর্মকর্তারাও। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এমনটিই বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে জিএম, ডিজিএম ও ম্যানেজার, সিবিএ সভাপতিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে বাখরাবাদের এমডি ও জিএম (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. ইউসুফকে তাদের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠানো হলেও তাতে সাড়া পাননি এই প্রতিবেদক।
জানা গেছে, গ্যাস চুরির বিষয়ে সরকারের ওপরমহলও ওয়াকিবহাল; কিন্তু বছরের পর বছর এ নিয়ে আলোচনা, ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফাইল চালাচালি হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
গোয়েন্দা সংস্থাটি বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (বিজিসিএল) নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে সরাসরি গ্যাস চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানির আওতাধীন এমন দুই ডজন সিএনজি স্টেশনের নাম উঠে এসেছে।
বিষয়টি নিয়ে সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠন সিএনজি স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নুর আমাদের সময়কে বলেন, অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গে কেউ কেউ সম্পৃক্ত থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন মালিকই সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে চান। দুই-একজনের জন্য সবার বদনাম হয়।
তিনি বলেন, যারা গ্যাস চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের শাস্তি হোক; কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেন হয়রানির স্বীকার না হন, সে বিষয়ে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) গ্যাস বিতরণ এলাকায় অবস্থিত সিএনজি স্টেশনগুলোতে অবাধে চলছে অবৈধ গ্যাস চুরি।
সিএনজি স্টেশনগুলোতে মিটার থাকলেও অকার্যকর। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি স্টেশনে ইভিসি মিটার (ইলেকট্রনিক ভলিউম কারেক্টর) থাকার কথা থাকলেও হাতেগোনা কয়েকটি স্টেশন ছাড়া ৯০ শতাংশ স্টেশনে তা নেই। অধিকাংশ স্টেশনে পুরনো অ্যানালগ মিটার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিটার বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিমাসে টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট বিল দিয়ে কোটি কোটি টাকা লুট হচ্ছে এসব সিএনজি স্টেশনে।
বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, কোম্পানির আওতাধীন প্রায় ৮৮টি সিএনজি স্টেশন রয়েছে। অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনের মিটার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে প্রায় ১৬টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে কোম্পানি। দীর্ঘদিন এসব কোম্পানি অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার গ্যাস বিক্রি করে আসছিল।
গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে, বাখরাবাদ এলাকায় গ্যাস চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কোম্পানির জিএম (মার্কেটিং) এহসানুল হক পাটোয়ারী। শাস্তি হিসেবে তাকে এখন সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিতে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও জড়িত আছেন ম্যানেজার (সেলস) জিয়াউল হক, ম্যানেজার (রেভিনিউ) সঞ্জয় বাবু, ম্যানেজার (ইঞ্জিনিয়ারিং) গোলাম মর্তুজা, ম্যানেজার (সেলস) মো. রশিদ, ম্যানেজার (আরসিসিডিআর) সাইফুল ইসলাম, ডিজিএম (সেলস) আবুল বাশার ও বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানির সিবিএ সভাপতি খায়ের সরকার।
বাখরাবাদের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের অধীনে কুমিল্লা জেলাসহ আশপাশের জেলার ৮৮টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় রয়েছে ৪২টি। ওই কর্মকর্তা বলেন, এগুলোর মধ্যে অনেক সিএনজি স্টেশন আছে, যারা অবৈধ গ্যাস চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা সেগুলো খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি জানান, যারা গ্যাস চুরির সঙ্গে জড়িত, তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সম্প্রতি বাখরাবাদ কোম্পানির এমডি সংবাদ সম্মেলন করে অভিযুক্ত সিএনজি স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
এদিকে শুধু বাখরাবাদই নয়, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতাধীন সিএনজি স্টেশনগুলোতেও চলছে গ্যাস চুরির হিড়িক। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত তিতাসকে সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গ্যাস চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন সিএনজি স্টেশনগুলোর তালিকা করতে। তবে তিতাস গ্যাস কোম্পানি এখনো সে তালিকা তৈরি করতে পারেনি।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মীর মশিউর রহমান বলেন, আমরা খোঁজ নিচ্ছি। তবে যারা অবৈধ সংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছি। তিনি বলেন, গত মাসে আমরা দুটো সিএনজি স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। নারায়ণগঞ্জের মেসার্স রানা সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং মেসার্স সুন্দরবন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে বাখরাবাদের আওতাধীন যেসব সিএনজি স্টেশনের নামে গ্যাস চুরির অভিযোগ ওঠেছে, সেগুলো হচ্ছে দেবীদ্বারে অবস্থিত কুমিল্লা সিএনজি স্টেশন, সুয়াগাজীতে অবস্থিত ভূঁইয়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বিশ্বরোডে অবস্থিত রাহমা সিএনজি ফিলিং স্টেশন, নূর অ্যান্ড ব্রাদার্স সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বিশ্বরোডে অবস্থিত সাবুরিয়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন, সাকুরা সিএনজি ফিলিং স্টেশন, মিয়াবাজারে অবস্থিত হাইওয়ে লিংক সিএনজি ফিলিং স্টেশন, নন্দনপুরে অবস্থিত বাংলা গ্যাস-১ সিএনজি ফিলিং স্টেশন, চান্দিনায় অবস্থিত আরএনআর সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বেলতলীতে অবস্থিত রিভারভিউ সিএনজি ফিলিং স্টেশন, হৃদপাড়ায় অবস্থিত মুক্তি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, খোরশেদ আলম সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বিশ্বরোডে অবস্থিত তামজিদ সিএনজি ফিলিং স্টেশন, আরাফাত সিএনজি ফিলিং স্টেশন, মল্লিকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও মিয়াবাজার সিএনজি ফিলিং স্টেশন। এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঈশা গার্ডেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন, স্বজন ফিলিং স্টেশন, নুরুল ইসলাম হাজারী সিএনজি ফিলিং স্টেশন, এমএ খালেক সিএনজি ফিলিং স্টেশন, চৌধুরী অ্যান্ড সন্স সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও চিওড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 315 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ