‘মায়ের ভালবাসা আশীর্বাদের গভীরতা কখনও মাপতে পারিনি, পারবও না।”

Print

মিলি সুলতানা নিউ ইয়র্ক থেকেঃ

নদীর তলদেশে নিমিষে যাওয়া যায় কিন্তু মায়ের ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। ‘মা’ যেন সীমার মাঝে অসীম। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মা দিবস এমন একটি সময়ে এসেছে যে সময়ে মায়েদের কান্নার শেষ নেই। সকালের নাশতায় একটা জিনিস আমার খুবই অপছন্দের। সেটা হল দুধ দিয়ে সিরিয়াল। বিভিন্ন রকমের পুষ্টিকর সিরিয়াল আছে।

কর্ণফ্লেক্স, ফ্রস্টেড ফ্লেক্স, অ্যাপেল সিনামন, হানি স্ম্যাক্স, গ্র‍্যানোলা, গোল্ডেন পাফস্, হানি নাট চেরিওস, স্প্রিংকল্ড ডোনাট ক্রাঞ্চ, চেরিওস হোল গ্রেইন ওট, রেইজিন ব্র‍্যান ক্রাঞ্চ, কোকোয়া পাফস, ইত্যাদি হরেক জাতের সিরিয়াল দেখে আসছি গত আট বছর যাবত। আমার দুই বাচ্চা দুধ সিরিয়াল খেয়ে স্কুলে যায়। স্কুলের নাশতায় শর্টকাট মেরে দেয়া আর কি। সাধারণত বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠার সময় অনেক মন খারাপ করে। আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে ওদেরকে স্কুলের জন্য তৈরি হতে হয়।

কখনো কখনো বেসিনের সামনে টুথব্রাশ হাতে দাঁড়িয়ে ঝিমাতো আমার বাচ্চা। আমি তো মা। এমন দৃশ্য দেখে বুক হুহু করে উঠা স্বাভাবিক। ভাবি, ওদেরকে হুড়মুড় করে রেডি করিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে তাদের মা স্বার্থপরের মত নির্বিঘ্নে কয়েক ঘন্টার ঘুম দেয়। রুটি ডিম পরোটা খাবার সময় থাকে না বলে দুধ সিরিয়ালই হল শর্টকাট ব্রেকফাস্ট। ওদের বাবাও অফিসে যাওয়ার আগে দুধ সিরিয়াল গিলে মন দুঃখী দুঃখী করে। আমি সব বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা যে মেনে নিতে হবে। কর্তা হয়ত আশা করেন তার গিন্নী ঘি তেলে মচমচে পরোটা ডিম ভাজি আলুভাজি দিয়ে উনাকে নাশতা পরিবেশন করবে। কিন্তু মনের আশা মনেই তালাচাবি মেরে রাখা উচিত। আমি ওদিকে ধ্যান দেইনা, ইচ্ছা থাকলেও পারা যায় না।

প্রবাসে সংসারের কাজের মত অসম্ভব কঠিন কাজ আর অন্যটি নেই। বাইরের আট ঘন্টা চাকরী এরচেয়ে অনেক স্বস্তিকর। আমরা বাঙালি, স্বভাবতই কিচেনের সাথে  আমাদের বিরাট ব্যাপার স্যাপার থাকে। আমেরিকানদের কিচেন অনেক ঝকঝকে তকতকে। কারণ তারা আমাদের মত গাদাগাদা রান্না করে না। তেল  মসলা ব্যবহার করেনা। চুলায় ময়লা জমেনা। তারা বেকড ফুডে অভ্যস্ত। আমরা বাঙালিরা বেক করা ফুড খেতে অভ্যস্ত নই। পোলাও বিরিয়ানি ভাত মাছ মাংস ভর্তা করি। রান্নার পর সিঙ্ক ও চুলা পরিস্কার করতেই হবে। নাহলে গ্রিজি হয়ে যায় চুলা ও চুলার আশপাশের দেয়াল। ফ্যান্টাস্টিক কিচেন ক্লিনার স্প্রে করে চুলা পরিস্কার করার পর মনে আসল শান্তি আসে।

নইলে তেলাপোকা বাবাজীরা নবোদ্যমে কিলবিল করে আস্তানা গাড়বে রান্নাঘরে। নিউইয়র্কে কয়েকজন মহীয়সীকে চিনি। যারা “গা সুন্দর খালাতো ভাই” গোত্রের বাসিন্দা। কম্যুনিটির সব অনুষ্ঠানে বিরামহীনভাবে অংশ গ্রহন করেন। ধামাকা সব ফটো সেশন করেন। কারো বাসায় দাওয়াত খেতে গেলে ভুস করে কবিতা পাঠ করে বসে। কবিতাকে এরা কত্তো সস্তা পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। দুই লোকমা উদরে চালান দিয়ে কাউয়ার মত “কা কা কা” করে কবিতা পাঠ করে। যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করতে না পারলে এসব মহীয়সীদের জনমই নিরর্থক হয়ে উঠে।

কিন্তু হাস্যকর দিক হল এদের রান্নাঘরের কোন চেহারা সুরত নাই। চুলা চাক্কিতে তেল কাইষ্টা (গ্রিজ) ভরপুর। এদের ঘরে তেলাপোকা ইঁদুর আর চটের বস্তার দুর্গন্ধ। কিন্তু বাইরে এমন বেশভূষা করে, যে দেখলে মনে হবে নবাবদের আত্মীয় লাগে। এদের উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট।

যাইহোক সবার আগে সংসার সামলাতে হয়। তারপর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো উচিত। বলছিলাম ব্রেকফাস্ট হিসেবে দুধ সিরিয়ালের কথা। এই নাশতা বিগত আট বছরে আমি মুখেও তুলে দেখিনি। কেন জানি দুধ সিরিয়াল খেতে প্রচন্ড অনীহা আমার। বাচ্চারা খায় আমি ওদের দিকে তাকিয়ে ভাবি, আল্লাহ বাচ্চাদের বুদ্ধি বাড়িয়ে দিও। ওরা যেন সিরিয়াল নিয়ে কোনদিন আন্দোলন শুরু না করে। আমার আম্মা যখন আমেরিকায় থাকতেন দুধ সিরিয়াল খেতেন। আরেকটা নাশতা আম্মার খুব পছন্দের ছিল। বেগল উইথ এগ অ্যান্ড চিজ স্লাইস। ছোটবেলায় বনরুটি নামের এক ধরণের গোল পাউরুটি খেতাম। গ্রামে বলত বনরুটি। পাউরুটির সাইজ যদিও স্কয়ার। এই রুটি রাউন্ড অর্থাৎ গোল শেপের। মোটা দুটো পিস একটার সাথে আরেকটা লাগানো থাকে। ঠিক বার্গারের মত।

ফ্রাইপ্যানে অল্প তেল দিয়ে ডিম অমলেট করে ফ্রাইপ্যান থেকে ডিম তুলে রাখতে হয়। এরপর বেগল অর্থাৎ বনরুটির দুই সাইড চুলায় সেঁকে অমলেট করা ডিমটা  বেগলের মধ্যে রেখে ডিমের উপর এক স্লাইস চিজ দিয়ে বেগলের বাকি অংশ দিয়ে ডিম ও চিজ ঢেকে দিয়ে খুব সাবধানে খুন্তি দিয়ে বেগলের দুই সাইড সামান্য উল্টে দিতে হয়। যাতে চিজ স্লাইস সামান্য গলে যায়। খুব টেকনিক্যালি এই নাশতা বানাতে হয়। বেগল বানানো আমি শিখেছি আমার সেজোভাবীর কাছ থেকে। অনেকে অনেকভাবে খায়। টোস্টারে দিয়ে খায়। কিন্তু আমি সেজোভাবীর পদ্ধতি অনুসরণ করি।

আম্মার অন্যতম পছন্দের এই  নাশতা আমারও পছন্দের তালিকায় চলে আসে। ২০২৫ সালে আমার আম্মা শেষবার আমেরিকায় এসেছিলেন। এখন উনি বাংলাদেশে। আবার আমেরিকায় আসবার মত সেই শারীরিক শক্তি সামর্থ্য উনার নেই। প্রায় সকালে আমরা মা মেয়ে একসাথে বেগল খেতাম। চা খেতাম। আম্মা তাঁর জীবনের নানা কাহিনী শেয়ার করতেন। আমি খেয়াল করতাম, খুব মনোযোগ দিয়ে যখন তরুণী-  যুবতী বেলার কাহিনী শুনতাম তখন আম্মা খুব খুশি হতেন। মনোযোগী শ্রোতা সবাই আশা করে। এটা ঘরে বাইরে যেখানেই হোক না কেন।

সেই আমি এখন সকালের নাশতায় বেগল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। কেন জানেন? আমার আম্মা বেগল খান না বলে। বালাদেশে বেগল নেই। আম্মা খাচ্ছেন না,  তাই আমিও খাচ্ছি না। একদিন আমার কন্যা শখ করে তার বাবাকে দিয়ে বেগল কিনে আনালো। আমি রান্নাঘরে বেগল তৈরি করছি আর চোখের জল ফেলছি। ছেলেটা বুঝল তার মা মায়ের কান্নার কারণ। আমার বুকে যন্ত্রণার তুফান বইছিল। বেগল যেন আম্মার জন্য বানাচ্ছিলাম। কি অব্যক্ত সেই কষ্ট। বুক থেকে এই কষ্ট নদীর স্রোতের মত যদি ছেড়ে দিতে পারতাম, কিছুটা অন্তত শান্তি পেতাম। বুকের নদীতে শক্ত বেড়িবাঁধের উপস্থিতি টের পেলাম। সেই জন্য কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে আছে।

মা দিবস নিয়ে লিখতে হয়। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি প্রত্যেক দিনই “মা দিবস” — মায়ের প্রতি একটু বেশি শ্রদ্ধা ভালবাসা প্রকাশের জন্য মা দিবস একটি মাধ্যম মাত্র। আমাদের সমাজের কুসন্তানরা তাদের বৃদ্ধ বাবা মাকে এক দৌড়ে বৃদ্ধাশ্রমে নির্বাসন দিয়ে আসে। বাবা মায়ের প্রতি গুরুদায়িত্ব ফাঁকি দেয়ার কি চমৎকার মাধ্যম এই বৃদ্ধাশ্রম। কিছু কিছু কুসন্তান তো স্ত্রীর হাতের চাবিদেয়া পুতুলের মত নাচতে নাচতে বাবা / মাকে বৃদ্ধাশ্রমে বনবাস দিয়ে আসে। করুণা হয় ওইসব স্ত্রীদের বাবা মায়ের জন্য।

কেমন তাদের পারিবারিক সংস্কার? যে সংস্কারে আছে শুধু অভিশাপ। পুত্রবধূর অত্যাচারে বহু মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা হতে হয়েছে । এই রীতি এখনো চলমান। লজ্জা থাকা উচিত সেইসব মা বাবাদের,  যাদের মেয়েরা বিয়ে করে অন্যের পরিবারে আসার পর অশান্তির আগুনে সুখের সংসার জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। মা ছেলের সখ্যতা সহ্য করতে পারেনা অনেক মেয়ে। ভোম্বল দাস ছেলেগুলো স্ত্রীর হাতের রিমোট দিয়ে পরিচালিত হয়। এমনকি বাথরুমে কবার যাবে সেটাও স্ত্রীর হাতের রিমোট দিয়ে কন্ট্রোল হয়। স্ত্রীর ইশারায় শ্বাস প্রশ্বাস ফেলে অপদার্থ সন্তানরা।

হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি রাসূল (সঃ) কে বললেন,  হে আল্লাহর রাসূল সন্তানের উপর পিতা-মাতার কি হক আছে? তিনি বললেন তারা তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম। (ইবনে মাজাহ) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। আরেক হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)  আমার সর্বোত্তম ব্যবহারের হকদার কে? হুজুর (সঃ) বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, অতঃপর কে? হুজুর (সঃ) বললেন তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে? এবারও জবাব দিলেন, তোমার মা। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কে? এবার নবী করীম (সঃ) জবাব দিলেন, তোমার বাবা। (বুখারী ও মুসলিম) মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সূরা বনী ইসরাঈলের ২৩-২৪নং আয়াতে মা -বাবা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তোমার প্রতিপালক এ আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাকে ভিন্ন অপর কারও ইবাদত করো না। পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করো। যদি তাদের একজন অথবা উভয়ই তোমার নিকট উপনীত হয়  তবে তাদের কখনো ‘উহ’ শব্দ পর্যন্ত বলবে না। তাদের ধমক দেবে না বরং তাদের সঙ্গে মার্জিত কথা বলবে।

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’— ভাবনাটি প্রতিটি মায়েরই মনের কথা। মা শাশ্বত, চিরন্তন। কিন্তু আমি এভাবে আমার দুই সন্তানের কল্যাণ কামনা করব না। আমি বিধাতার কাছে চাইব , আমার সন্তান যেন সর্বোত্তম মানবিক গুণের অধিকারী হয়। অল্পতে খুশি থাকুক। মানুষকে ভালবাসার জন্য ওদের মনের জমিন পরিচর্যা করুক। সেখানে দয়ামায়া  মমতা সহানুভূতি ভালবাসার চাষাবাদ করুক। ওরা মাটিকে ভালবাসুক, মাটির বুকে এক্কাদোক্কা খেলুক। মাটির সাথে বন্ধুত্ব করুক। প্রাণভরে মাটির সোঁদা গন্ধ বুকে ধারণ করুক।  মাটি ও বাতাসের  সাথে হোক ওদের কথোপকথন।

মিলি সুলতানা নিউ ইয়র্ক থেকে।

 

 

 

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 152 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ