মুশফিককে অভয়বাণী শোনাবেন বিসিবি বিগবস

Print

তামিম ইকবালের সাহসী আর প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসন করার মানসিকতা তার নেই। যেকোনো ফরম্যাটে নিজের দিনে তামিম যেভাবে প্রতিপক্ষ বোলিং দুমড়ে-মুচড়ে কিংবা তছনছ করে দিতে পারে, তার ব্যাটিং শৈলী ও অ্যাপ্রোচে সেই খুনেভাব অনুপস্থিত।
সাকিব আল হাসানের সাবলীল অথচ বেপরোয়া স্ট্রোক প্লে, যাকে তাকে নিজের মতো করে খেলার সামর্থটাও নেই। তারপরও তিনি মানে মুশফিকুর রহিমই টেস্টে বাংলাদেশের এক নম্বর ব্যাটসম্যান।

দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে একজন আদর্শ ব্যাটসম্যানের যে কিছু অপরিহার্য উপাদান দরকার, তা পুরোটাই আছে মুশফিকুর রহিমের। পরিপাটি ও পরিশুদ্ধ টেকনিক। ইচ্ছেমত ও মনগড়া শট খেলার বদলে বলের মেধা-গুণ বিচার এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি ঠাউরে ব্যাট চালনায় মুশফিক সবার ওপরে।
টেস্ট আদলের ব্যাটিং কৌশল, টেম্পারমেন্ট, দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার ধৈর্য, মনোযোগ-মনোসংযোগ এবং লাগসই অ্যাপ্রোচ ও অ্যাপ্লিকেশন ও যথার্থ শট নির্বাচন ক্ষমতা- সব মিলে বাংলাদেশের উইলোবাজদের মধ্যে মুশফিক নাম্বার ওয়ান। তার রেকর্ড ও পরিসংখ্যানও তাই বলে। সে কারণেই ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের চেয়েও টেস্টে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ মুশফিক। নির্ভরতার প্রতীকও।
কিন্তু কঠিন সত্য হলো, সেই মুশফিক মাঝে মধ্যে হন প্রশ্নবিদ্ধ। তার ব্যাটিং শৈলী, অর্জন ও কৃতিত্ব ফিকে হয়ে যায় কিপিং ব্যর্থতায়। আগে যেমন তেমন ইদানিং মানে নিকট অতীত ও সাম্প্রতিক সময় কিপার মুশফিকের গ্লাভস ফসকে বেশকিছু ক্যাচ বেরিয়ে গেছে। হায়দরবাদে ভারতের সঙ্গে একমাত্র টেস্টে ভারতের উইকেটরক্ষক ঋদ্ধিমান সাহাকে স্টাম্পড করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে কিপার মুশফিক রীতিমত ‘ভিলেন’ বনে গেছেন।
এ ম্যাচের পোস্টমর্টেম করতে গেলে মুশফিকের কিপিং ব্যর্থতার কথা উঠে আসবে বারবার। মোটা দাগে বলতে গেলে মুশফিকের কিপিং নিয়ে রাজ্যের সমালোচনা। তীর্যক কথাবার্তা। ব্যাটসম্যান মুশফিক যদি হন আস্থার প্রতীক, উইকেটের পেছনের মুশফিক যেন আড়ষ্ট ও ব্যর্থ কিপারের প্রতিচ্ছবি। এমন নয় দেশে উইকেট কিপারের আকাল।
এ মুহূর্তে দেশে যত উইকেট কিপার আছেন, তার মধ্যে মুশফিকই সেরা। কোনো কারণে তার ফর্ম ভালো যাচ্ছে না। তাই তাকে ছাড়া উপায়ও নেই।
আসলে তা নয়। মুশফিকের চেয়ে ঢের ভালো কিপার নুরুল হাসান সোহান। এমনকি লিটন কুমার দাস-এনামুল হক বিজয়ও খুব কাছাকাছি। তাই ব্যাটসম্যান মুশফিক যেমন অপরিহার্য, অটোমেটিক এবং ফার্স্ট চয়েজ, কিপার মুশফিক কিন্তু তা নন। বিকল্প আছেন কজন। যারা মানের দিক থেকে খারাপ নন।
তাই অতিবড় মুশফিক সমর্থকও মনে করেন, নিজ ব্যাটিংয়ের স্বার্থে এবং টিম বাংলাদেশের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে মুশফিকেরই উচিৎ কিপিং বাদ দিয়ে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলা। তাতে করে তার শারীরিক ও মানসিক বিশ্রাম এবং প্রশান্তি মিলবে।
যেহেতু বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত দলগুলো বেশি সময় ব্যাটিং করে, তাই মুশফিককে ওই দীর্ঘ সময় উইকেটের পেছনে হাঁটুমুরে বসে থাকতে হয়। প্রতি বলেই অঙ্গসঞ্চালনসহ সর্বোচ্চ মনোযোগ-মনোসংযোগ দিতে হয়। এতে করে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি, চোখ ও মানসিক শক্তির ওপরও চাপ পড়ে। যা তার ব্যাটিংয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাও থাকে।
এখন বয়স কম এবং প্রচুর অনুশীলন করেন, ফিটনেস লেভেল অন্যদের চেয়ে বেশি বলে হয়তো মালুম হয় না। একসময় গিয়ে ঠিক সমস্যা হবে। শরীর আর সায় দেবে না। অনেকেরই মত সে সব বিবেচনায় এখনই কিপিং ছেড়ে পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হয়ে যেতে পারেন মুশফিক। কিপিং ছেড়ে ব্যাটসম্যান হিসেবে খেললে নির্ঘাত তার পারফরমেন্স আর ভালো হবে। ব্যাটিংয়ের প্রতি শতভাগ মনোযোগী হতে পারবেন। মেধা, প্রজ্ঞা ও সামর্থের পুরোটাই ব্যাটিংকে দেয়া সম্ভব হবে।
কিপিং ছেড়ে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেললে যে ব্যাটিং কতটা ভালো হয়, নিজের প্রকৃত মেধার কেমন স্ফূরণ ঘটানো যায়- তার জ্বলন্ত নজির হচ্ছেন কুমারা সাঙ্গাকারা। এ লঙ্কান গ্রেটও মুশফিকুর রহিমের মতো স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান কাম কিপার ছিলেন। কিপিংটাও মন্দ করতেন না। কিন্তু একসময় মনে হলো, নাহ কিপিং ছেড়ে ব্যাটিংয়ে মন দেই। তাতে লাভ হবে। ব্যাটিং ক্যারিয়ার হবে আরও সমৃদ্ধ।
পরিসংখ্যানটা দেখুন, তাতেই পরিষ্কার হয়ে যাবে ব্যাটসম্যান কাম কিপার সাঙ্গাকারা আর শুধু ব্যাটসম্যান সাঙ্গাকারার পরিসংখ্যানের কত বড় ফারাক?
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি কিপার সাঙ্গাকারা খেলেছেন ৪৮ টেস্ট। ৮১ ইনিংসে রান ছিল ৩১১৭। গড় ৪০.৪৮। পঞ্চাশ ১১টি। সেঞ্চুরি ছিল ৭টি। সর্বোচ্চ ছিল ২৩০।
অন্যদিকে কিপিং ছেড়ে পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হবার পর গড়ে ২৬‘র চেয়ে বেশি রান বেড়ে যায় কুমারা সাঙ্গাকারার। শুধু ব্যাটসম্যান সাঙ্গাকারা ৮৬ টেস্টে ১৫২ ইনিংস ব্যাট চালিয়ে রান করেছেন ৯২৮৩। ট্রিপল সেঞ্চুরি হাকানোসহ টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ৩১৯ রানের ইনিংসটিও খেলেন শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে। শুধু স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে সাঙ্গাকারার গড় ৬৬.৭৮। শতরান ৩১টি। আর হাফ সেঞ্চুরির সংখ্যা ৪১।
সবচেয়ে বড় তথ্য হলো, ২০০৮ সালের এপ্রিলে কিপিং ছেড়ে শুধু ব্যাটিংয়ে মনোযোগী হবার পর সাঙ্গাকারার ব্যাটে রানের নহর বয়ে যায়। ওই সময়ের পর থেকে ক্যারিয়ারের ইতিটানার আগে পর্যন্ত তার গড় ছিল ৬৬। যা ক্রিকেটের কিংবদন্তি ডন ব্র্যাডম্যানের পর আর যেকোনো ব্যাটসম্যান শচীন, লারা, পন্টিং, জ্যাক ক্যালিস, দ্রাবির ও মার্ক ওয়াহর চেয়ে বেশি।
কাজেই মুশফিক কিপিং ছেড়ে পুরোদস্তুর ব্যাটিংয়ে মনোযোগী হলে তার গড়ও হয়তো পঞ্চাশের ওপরে চলে যাবে। তাতে তার নিজের ক্যারিয়ারই সমৃদ্ধ হবে না, টিম বাংলাদেশও অনেক উপকৃত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মুশফিক কি কিপিং ছেড়ে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলবেন? তাকে যারা চেনেন, জানেন ও বোঝেন- সবাই এক বাক্যে বলবেন নাহ, মুশফিক সহজে কিপিং ছাড়ার পাত্র নন।
এইতো কদিন আগে হায়দরাবাদ টেস্টে সাকিব জানিয়ে দিলেন মুশফিক ভাই কিপিং উপভোগ করেন। ব্যাটিংয়ের মতো কিপিংটাও তার প্রিয়। তাই সে প্রিয় কিপিং মুশফিক ছাড়বেন কি-না? সেটা বড় প্রশ্ন। তবে কারও কারও মত, শুধু পছন্দ আর উপভোগের কারণেই নয়, মুশফিক একটা অজানা শঙ্কায় ভোগেন। তার ধারণা, কখনও কিপিং ছেড়ে দিলে তার দলে অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে। তিনি একধারে অধিনায়ক, কিপার এবং ব্যাটসম্যান। মুশফিক মনে করেন কিপিং করতে না পারলে তার অধিনায়কত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
একসময় ব্যাটিং ফর্ম খারাপ হলে দল থেকে বাদও পড়তে পারেন। এই ভেবেই আসলে মুশফিক কিপিং ছাড়তে চান না। সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীদের ধারনা ও মত, বিসিবি প্রধান এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান প্রধান অভিভাবক নাজমুল হাসান পাপন মুশফিককে আশ্বস্ত করলে হয়তো কাজ হতে পারে।
তার কিপিংয়ের পাশাপাশি দল পরিচালনা নিয়েও কথা হচ্ছে বিস্তর। তা ভালোই জানেন মুশফিক। তার হাত থেকে নেতৃত্ব অন্য কারো কাঁধে চলে যেতে পারে- এমন শঙ্কাও কাজ করে ভেতরে। তাই মনে মনে ভাবেন, আমি কিপিং ছাড়লে ভবিষ্যতে দলে আমার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। তাই কিপিংটা ধরে রাখি। যেটা আমার রক্ষাকবচ। কখনও ব্যাটিং খারাপ হলেও যা আমার দলে অবস্থান নিশ্চিত রাখবে। এমন ভেবেই নাকি মুশফিক কিপিং ছাড়তে নারাজ।
এখন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান একটু উদ্যোগী হলেই হয়তো মুশফিকের সে ধারণা বদলে যেতে পারে। বিসিবি বিগবস যদি মুশফিককে আশ্বস্ত করেন, ‘তোমার চিন্তা নেই। টেস্টে তুমিই আমাদের এক নম্বর ব্যাটসম্যান। আমাদের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতিক। ব্যাটিংয়ের মূল চালিকশক্তি। তুমি কিপিং ছেড়ে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেললে তোমারও মঙ্গল, দলও উপকৃত হবে। তোমার দলে অবস্থান মোটেই নড়বড়ে হবে না। তুমি এখন যেমন অটোমেটিক চয়েজ, কিপিং ছেড়ে ব্যাটসম্যান হিসেবে খেললেও থাকবে প্রথম পছন্দ।’
এমন অভয়বাণী শুনলে হয়তো মনের ইচ্ছে বদল ঘটতেও পারে। কাজেই সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীদের ধারণা, মুশফিককে অভয়বাণী শোনানোর এখনই সময়। শুধু মুশফিকের ক্যারিয়ারের জন্য নয়, দেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে প্রধান কোচ হাথুরুসিংহে এবং প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিনকে সঙ্গে নিয়ে বিসিবি বিগবস ভারত থেকে দেশে ফেরার পর শ্রীলঙ্কা সফরের আগে মুশফিকের সঙ্গে বসে তাকে অভয়বাণী শোনাতে পারেন।
তাহলে হয়তো সাঙ্গাকারার মতো মুশফিকও কিপিং ছেড়ে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে রাজি হবেন। প্রকৃত সত্য হলো, মুশফিক নিশ্চিতভাবেই একটা নিশ্চয়তা চান। তা দেবার সত্যিকার এখতিয়ার রাখেন বিসিবি প্রধান। তিনি কি তা করবেন?

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 199 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ