মুহূর্তেই মৃত্যুপুরী বঙ্গবন্ধু এভিনিউ

Print

হঠাৎ বিস্ফোরণ। চারিদিকে ছোটাছুটি। একের পর এক গ্রেনেড হামলা। মুহূর্তেই বয়ে গেল রক্তের বন্যা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরীরের অঙ্গ খসে পড়ল অনেকের। তখন চারদিকে শুধুই লাশ আর কান্নার রোল। বলছি ইতিহাসের কলঙ্কিত এক অধ্যায় ২১ আগস্টের কথা। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক পাঁচটা ২২ মিনিট। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে বক্তৃতা শেষ করে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগোতে থাকলেন মঞ্চের সিঁড়ির দিকে।
মুহূর্তেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। একটু আগের প্রাচঞ্চল বঙ্গবন্ধু এভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হল মৃত্যুপুরীতে।ওই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং আহত হন চার শতাধিক।

অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান শেখ হাসিনা। সোমবার সেই বিভীষিকাময় ২১ আগস্টের ১৩তম বার্ষিকী।
ভয়ঙ্কর এই হামলার পর স্প্লিন্টারের আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় পড়েছিলেন আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক আইভি রহমানসহ শত শত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।গুরুতর আহত আইভি রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২৪ আগস্ট। ঘটনার দিনই মারা যান শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ।সেদিনের গ্রেনেড হামলায় আরও নিহত হন আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), ঢাকা মহানগরের ৫৮ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুফিয়া বেগম, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হাসিনা মমতাজ রীনা, মহিলা আওয়ামী লীগ কর্মী রেজিয়া বেগম, জাতীয় শ্রমিক লীগের কর্মী নাসির উদ্দিন সর্দার, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড রিকশা শ্রমিক লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হানিফ, ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেলাল হোসেন, যুবলীগ বালুঘাট ইউনিটের সভাপতি ও ক্যান্টনমেন্ট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সদস্য আবুল কালাম আজাদ।
এছাড়া হোসেনপুর ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি লিটন মুন্সী লিটু, ৮৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা আতিক সরকার, স্বেচ্ছাসেবক লীগকর্মী আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ কর্মী ও রিরোলিং মিল ব্যবসায়ী রতন সিকদার, ছাত্রলীগ কর্মী ও সরকারি কবি নজরুল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মামুন মৃধা, জামালপুর আওয়ামী লীগ কর্মী আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ কর্মী ইছহাক মিয়া, মো. শামসুদ্দিন, মমিন আলী, আবুল কাসেম ও জাহেদ আলী।এই ২২ জন ছাড়া আরও দু’জন নিহতের খবর পাওয়া যায়, যাদের পরিচয় মেলেনি।
ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে এক মানববর্ম তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে তাকে গ্রেনেড ও গুলির আঘাত থেকে রক্ষা করেন।এদিকে শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তার শ্রবণ শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।হীমশীতল মৃত্যুর স্পর্শ থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকে এখনও বিশ্বাসই করতে পারেন না আসলে তারা জীবিত আছেন কি না!মৃত্যুর এতো কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসায় হয়তো তারা নতুন জীবন পেয়েছেন। কিন্তু যতদিন তারা বেঁচে থাকবেন, ততদিন বহন করে যেতে হবে সেই দুঃস্বপ্নের মত তাড়িয়ে বেড়ানো স্মৃতিকে।
অভিযোগ রয়েছে, হামলার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং এতে জজ মিয়া নামে এক ভবঘুরে, একজন ছাত্র, একজন আওয়ামী লীগের কর্মীসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ পরে তদন্তে তাদের কারও বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুকূল পরিস্থিতিতে সরকার এ হামলার পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিলে সাড়ে তিন বছর পর বিলম্বিত পুলিশ চার্জশিট নথিভুক্ত করা হয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 190 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ