মেয়েরা কেন চাকরি করবে? 

Print

কেস স্টাডি ১ – মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল একাদশে পড়ার সময়ে। শ্বশুরের একান্ত দায়িত্বে বিএ পাশ করলেও এমএ’তে মেয়েটির ভর্তি হওয়া হয়নি। ততদিনে এক সন্তানের জননী সে। বরের কথা ছিল, যেহেতু চাকরি করবে না তাহলে পড়াশুনার কী দরকার? আর আমি থাকতে তোমার আর আম্মুর (মেয়ের) কী চিন্তা?

মেয়েটিও বাকবাকুম করতে করতে পড়াটা শেষ করেননি। বিয়ের ছয় বছরের মাথায় পরকীয়ায় লিপ্ত বরের সাথে বিচ্ছেদে জীবন ওলটপালট হয়ে যায় মেয়েটির। দুই কাঁধে দুই বছরের বয়সের পার্থক্যের ছোট ছেলে মেয়ে। না করা পড়াশোনা মেয়েটাকে সারাজীবন অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকতে বাধ্য করেছিল। আর দিয়েছিল ভোগান্তির জীবন।

কেস স্টাডি ২- ঢাবি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা থেকে পাশ করা মেয়েটা কোন চাকরি করেননি অনেকগুলো চাকরির সুবিধা হাতে থাকার পরেও। বরের কথা, আমি থাকতে তোমার কী চিন্তা? ঘরের বউ চাকরি করবে এ কেমন কথা?

মেয়েটি মেনে নিল বরের কথা।

বরের অকথ্য অত্যাচারের পরে ঘর ছেড়ে আসতে চাওয়া মেয়েটি যখন চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে ততদিনে তার চাকরির বয়স শেষ।

কেস স্টাডি ৩- মেয়েটির সঙ্গী তাকে বেশি একটা বাইরে যেতে দেননি কখনো। খুব বেশি হলে দু’ঘণ্টা সময় বেধে দিতেন বোনদের সাথে মার্কেটে যাবার জন্যে। হঠাৎ করে বর মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাক করে। রেখে গেলেন দুই ছেলে, একটা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত, আরেকটা ষষ্ঠ শ্রেণিতে। জাঁকজমকপূর্ণ জীবনে কখনো বাইরে না বের হওয়া নারীটি চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলেন। এরপরেও জীবন তাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এলো। পুরো সংসার তাকে একাই টানতে হয়। খাবি খেতে খেতে জানান দেন সবাইকে, তোমাদের জাকাতের টাকাটা অন্তত আমাকে দাও। আমার ছেলেদের পড়শুনাটা অন্তত চলুক তাতে।

মেয়েরা চাকরি করে নিজেদের পরিচয়, নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নিজের নিজস্বতাকে বিকশিত করার জন্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চুকিয়ে একজন নারী তার সুখি এবং সন্তুষ্ট জীবনের জন্যে চাকরি করেন। একজন কর্মজীবী নারী তার পড়াশোনার পাট চুকিয়ে নিজেকে  কোন উৎপাদনশীল জায়গায় দেখতে পছন্দ করেনএবং তেমনটা হলে খুশি হন। গৃহিণী মেয়েদের তুলনায় তারা চাপ সামলানোতে অধিক পারদর্শী এবং বিষণ্ণতায় কম আক্রান্ত হন। এই সন্তুষ্ট জীবনের জন্যে নারীরা চাকরি করেন।
পারস্পারিক বোঝাপড়ায় চাকরীজীবী নারীদের দাম্পত্য জীবন অধিক সুখি হয়। কর্মজীবী নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে সময় দেন বলে সঙ্গীর প্রতি তাদের মনে ক্ষেদ বা ক্ষোভ পুষে রাখার সময় কম পান। নিজেরা অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হন বলে সঙ্গীর উপরে অর্থনৈতিকভাবে কম চাপ পড়ে।
বাচ্চারা যখন দেখে তাদের মায়েরা অফিস থেকে শুরু করে তাদের হোম ওয়ার্ক পর্যন্ত যত্ন করে দেখতে পারছেন তখন তারাও উদ্বুদ্ধ হয় সময়ে মায়ের মতন হবার জন্যে। মায়ের চাকরি বাচ্চার জীবনেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে।
একজন মেয়ে যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন তখন তার সঙ্গীর কাছে তার টাকা চাওয়ার প্রয়োজন হবে না। একজন মেয়ের নিজস্ব পরিচয় তৈরির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মুক্তি একটা বিশাল ভূমিকা রাখে। অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে আসে স্বাধীন জীবনের স্বাদ।
সঙ্গীর চাকরি না থাকলে কিংবা ব্যবসায় ধ্বস নামলে একজন চাকরিজীবী নারী সংসার এবং সন্তানকে খুব ভালোভাবে সামলে উঠতে পারেন। যদি চাকরিজীবী মায়েরা বাচ্চাসহ বিচ্ছেদের মুখোমুখি হন তাহলেও তার পুরো পরিবার একেবারে উচ্ছন্নে যায় না কারণ তার কাছে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে এবং খুব দ্রুত তিনি সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন।
বৃদ্ধকালে তারা কম বিপন্নবোধ করেন। বিষণ্ণতাবোধে কম আক্রান্ত হন। বাচ্চারা তাদের নিজস্ব জগত নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু তাদের পরিচিত মানুষ, ব্যবসায়িক সঙ্গী, কর্মক্ষেত্রের সঙ্গীরা তাদের মাতিয়ে রাখেন। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন মানুষদের সাথে মিশে জীবনকে ভিন্ন ভাবে দেখার সুযোগে তারা জীবনের ভিন্ন অর্থ খুঁজে পান। ফলে নতুন প্রজন্মকে দিক নির্দেশনা দেবার মত অনেক শক্তিশালী বার্তা তাদের কাছে থাকে। এই সামাজিক পরিচয় তাদের বৃদ্ধবয়সকেও আনন্দময় করে রাখে।
চাকরিজীবী মায়েদের বাচ্চারা নিজেরাই ছোটবেলা থেকে অনেক কাজ করতে শেখে নিজে নিজে। ফলে ছোটবেলা থেকেই আত্মনির্ভরশীলতা পরবর্তীতে তাদের জীবন গঠনে ভূমিকা রাখে। বাচ্চারা ছোটবেলা থেকে জ্ঞানী, দক্ষ, সুখি এবং জীবনকে বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা একজন মায়ের কাছ থেকে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বড় হয়।
পুরুষতান্ত্রিক ধারণা মেয়েদের দমিয়ে রাখার জন্যে প্রচলন করে রেখেছে কিছু ভুল ধারণা এবং প্রথার। সময় এখন ধারণা বদলানোর এবং প্রথা ভাঙ্গার। প্রথা আর ধারণাগুলো এরকম-

“বিয়ের আগে চাকরি করো সমস্যা নেই, বিয়ের পরে করতে পারবে না”

মেয়েরা বিয়ের আগে চাকরি করলেও এখনো অনেক শ্বশুরকুলকে দেখা যায় এই শর্তের ফর্দ দিয়ে বসে থাকেন। মেয়েরা চাকরি করবে না, অভিনয় করবে না, সমাজকর্ম করবে না শুধু সুবোধ গৃহিণী হবার স্বার্থে পৃথিবীর সব সম্পর্ক চুকিয়ে বসে থাকবে।

“চাকরি করা মেয়েরা ফটফট করে মুখের উপরে কথা বলে/ উগ্র / উচ্চভিলাষী হয়”
চাকরি করা মেয়েগুলোকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় বলে তার অন্যান্য মেয়েদের তুলনায় বেশি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত জানাতে পছন্দ করে। কিন্তু শ্বশুরগৃহে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত জানানোকে এখনো অপছন্দ করা হয় আমাদের সমাজে। ফলাফল তাদের সুনাম জোটে “মুখ ফটফট” হিসেবে। যা কেবলি তাদের মুখ বন্ধ করে রাখার কিংবা পরিবারে ছেলেদের অধঃস্তন করিয়ে রাখার একটা উপায় মাত্র।

“চাকরিজীবী মায়েদের সন্তান মানুষ হয় না”

এটা একটা প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। হাজার হাজার উদাহরণ আছে চাকরিজীবী মায়েদের উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের নিয়ে। কিন্তু সমাজ পুরুষতান্ত্রিক এই ধারণা পুষে রেখেছে কেবল মেয়েদের দমিয়ে রাখার জন্যেই। মেয়েরা মাঠ ঘাট চষে বেড়াবে, মেয়েরা কাজে বিলীন হবে, মেয়েরা ঘরে থাকা বাদ দিয়ে ছুটে বেড়াবে – এই ধারণা পুরুষতন্ত্র কখনো মেনে নিতে পারেনি। তাই মেয়েদের দমিয়ে রাখার স্বার্থেই এই ধারণা।

চাকরিজীবী মেয়েরা ভালো মেয়ে, ভালো সঙ্গী, ভালো মা সবই হতে পারেন। তাছাড়া মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা বিষয়ে পড়বেন কেবল ভালো বিয়ে হবার জন্যে আর গৃহিণী হয়ে থাকার জন্যে এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

“চাকরিজীবী মেয়েদের সঙ্গীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কম থাকে”

সঙ্গীর সাথে মতের মিল না হলে সেখানে শ্রদ্ধার ঘাটতি থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানে এরকম যুক্তিহীন কথা চাকরিজীবী মেয়েদের বেলায় এনে তাকে চাকরি করতে বাধা দেয়া একটা নীতিবিরোধী কাজ। অনেক ক্ষেত্রেই এইরকম যুক্তিহীন কথার জের ধরে অনেক মেয়েই তার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে চাকরি ছেড়ে গৃহিণী হয়ে বসেন। তবুও কী কুকথা থেকে মুক্তি মেলে তার?

“চাকরিজীবী মেয়েরা বাইরে মেলামেশা করে বলে বহুগামিতার প্রবণতা বেশি”

চাকরি করলেই যে কাউকে বাইরের মানুষের সাথে মেলামেশার জন্যে বহুগামি হতে হবে এমনটা নয়। বহুগামিতার প্রবণতা থাকলে মানুষ ঘরে বসেও বহুগামি হতে পারে। এই ধারণা থেকে জন্ম নেয়া অপবাদের ভয়ে কর্মক্ষেত্রে হওয়া অনেক যৌণ হয়রানি মেয়েরা তার সঙ্গীর সাথে শেয়ার করতে পারেন না।

“চাকরিজীবী মেয়েদের পোশাক ঠিক থাকে না”

চাকরিজীবী মেয়েরা তাদের কর্মক্ষেত্রে ছুটে চলার জন্যেই নিজেদের জন্যে সুবিধাজনক পোশাকে বিশ্বাসী। একজন সাংবাদিক কিংবা আলোকচিত্রী যদি তার ছুটে চলার সুবিধার্থে ওড়না বাদ দিয়ে চলাফেরা করেন সেটাকে পরিবারের বউ হিসেবে অন্যান্যদের জন্যে খুব লজ্জাজনক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু তার কর্মক্ষেত্রে যদি সেটাই সুবিধা হয় তবে অবশ্যেই  সে তার সুবিধাকেই প্রাধান্য দেবে।

চাকরিজীবী মেয়েদের করণীয়

বিয়ের আগেই ‘চাকরি করা যাবে না’ এই মর্মে চুক্তি দেয়া মানুষগুলোর সাথে আত্মীয়তা না করাই ভালো। আপনার ইচ্ছে অনিচ্ছেগুলোকে সম্মান করা তো দূরে থাক শোনার আগেই শর্ত দিয়ে বসে থাকেন যারা তাদের কাছ থেক দূরে থাকাই মঙ্গল। আর আপনিই ভেবে দেখুন তো শর্ত দিয়ে সম্পর্ক টেকে?

মেয়েরা অন্যের সিদ্ধান্তে নয় নিজের সিদ্ধান্তকে হ্যা বলবেন। সঙ্গী বলছেন, মা বলছেন, শাশুড়ি বলেছেন “চাকরি করার দরকার নেই” তাই করলাম না এই সিদ্ধান্তে মেয়েরা হ্যা বলবে না। কারণ যে মুহূর্তে তার জীবন অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে সেই মুহূর্তে সে কাউকে সাথে নাও পেতে পারেন। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত গুলোকে নিজের নেয়ার স্বার্থেই তার চাকরি করাটা তার দরকার।
মেয়েরা সন্তানলালনের জন্যে চাকরি ছাড়বেন না বরং সন্তানের বাবাকে বলবেন প্যারেন্টিং এবং সাংসারিক সামগ্রিক দায়িত্ব ভাগ করে নিতে। যাতে তার উপরে চাপ কম পড়ে।

চাকরিজীবী মায়েদের সময় জ্ঞান খুব বেশি এবং সব কাজ সময় ধরে করার অভ্যেস থাকে। বাচ্চাকে তিনি গৃহিণী মায়েদের মত অত সময় দিতে পারেন না কিন্তু কোয়ালিটি টাইম ঠিকমত দিলে বাচ্চার বিকাশে কোন রকম অসুবিধা হবার অবকাশ থাকে না।

মেয়েরা চাকরি করবেন নিজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার জন্যে। মা বাবার সম্পত্তি বরের চাকরি আপনাকে একটা নিশ্চিন্ত জীবন দেবে সব সময়ের জন্যে এটা ভুলেও ভাববেন না। মা বাবার সম্পদের মুখাপেক্ষী জীবন ত্যাগ করা উচিৎ। বিয়ে হচ্ছে একটা সাময়িক চুক্তি। এই চুক্তি ভেঙে ফেলা যায় মুহূর্তেই। যে মুহূর্তে আপনার সঙ্গীর আপনাকে ভালো লাগবে না সে মুহূর্ত থেকে আপনার ঘরে বিদায়ের সুর বাজছে। আপনিও মিসেস অমুক থেকে মিস অমুক হয়ে যাচ্ছেন কিংবা (অনেক ক্ষেত্রেই প্রতারণার ফলে) হতে বাধ্য হচ্ছেন। তখন আপনাকে দেখবে কে? তাই সময় থাকতে নিজেই নিজের জন্যে তৈরি হন।

আমাদের সামাজিক অবস্থা এখনো ডিভোর্সি মেয়েদের হীন চোখে দেখতে বাধ্য করে সেখানে নিজের পরিচয়হীন হীন্মন্যতাকে সাথে নিয়ে আপনি মা বাবার ঘাড়ে চড়ে বসলে বলাবাহুল্য তারা আপনাকে খুব ভালো চোখে নাও দেখতে পারে। সাথে বাচ্চা থাকলে তো অবস্থা লারেলাপ্পা। ভেবে দেখেছেন অবস্থাটা তখন কী হবে?

মেয়েরা কেবল মাত্র টাকার জন্যে চাকরি করে না। করে তার নিজস্ব পরিচয়ের জন্যেও। অমুকের মেয়ে, অমুকের স্ত্রী, অমুকের মা হবার আগেও তার একটা নিজস্ব পরিচয় থাকা আবশ্যক। এই নিজস্বতা তার বাকি পরিচয়গুলোকে ম্লান করে দেয় না বরং উজ্জ্বল করে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 243 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ