যে কঠোর বিকল্পের কথাও ভাবছে আওয়ামী লীগ

Print

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে ‘আপত্তিকর’ অংশ স্বেচ্ছায় বাতিল কিংবা রিভিউ আবেদনে এসব অংশ বাতিল হবে এমন সম্মতি চায় শাসক দল। এ জন্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে সমঝোতা না হলে কঠোর বিকল্প চিন্তাও রয়েছে ক্ষমতাসীনদের। এ জন্য আরো সময় নেবে শাসক দল।
আওয়ামী লীগ নেতারা রায়ের পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন অংশ নিয়ে ‘জনমত গঠনে’ প্রতিনিয়ত বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন। দলটির নেতারা মনে করছেন, এ রায়ের আইনি দিক যেমন আছে, এর রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। তাই এর রাজনৈতিক অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ দ্বিমত পোষণ করে আসছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আওয়ামী লীগ শ্রদ্ধা দেখালেও, এর পর্যবেক্ষণ অংশে ঘোর আপত্তি তুলেছে দলটি। এ জন্য প্রধান বিচারপতিকে আরো চাপে রাখার কৌশল হিসেবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতির বিচারিক ‘অসদাচরণ’ ও ‘শপথ ভঙ্গের’ বিষয় নিয়েও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ এক্ষেত্রে আরো সময় নিচ্ছে। এর পাশাপাশি রায়ের পর্যবেক্ষণকে রাজনৈতিক দাবি করে এর বিপক্ষে রাজপথেও এ পর্যবেক্ষণের কিছু অংশের বিপক্ষে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ওলামা লীগ এক মানববন্ধন করবে। আরো বেশকিছু দাবি থাকলেও ওলামা লীগের মানববন্ধনের মূল ফোকাস থাকবে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগ দাবি।
এ সবের পাশাপাশি ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বিএনপিকেও ঘায়েল করার কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের উদ্দেশে বলেন, মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি (ফখরুল) কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া জানাননি। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দেয়ার বিষয়টি বিএনপি মেনে নিয়েছে।
রাজপথের পাশাপাশি আইনিভাবেও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্?হার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের’ কিছু অভিযোগ জোগাড় করছে সরকার। তবে এসব সাংবিধানিক বিষয়ে সরকার হুটহাট কিছু করতে চাচ্ছে না। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ের প্রত্যয়িত অনুলিপির জন্য দরখাস্ত করা হয়েছে। রায়টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। পড়ে দেখা হচ্ছে। রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের জন্য সরকার তৈরি হচ্ছে। আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করি না। কিন্তু রায়কে শ্রদ্ধা করি।’ তিনি বলেন, রায়ের মধ্যে অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয়, আপত্তিকর কথা যেগুলো এসেছে, সেগুলো সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া দেখানো স্বাভাবিক, যতক্ষণ পর্যন্ত উগ্র প্রতিক্রিয়ায়, কোনো ভাষায় আদালত অবমাননা না হয়- প্রতিক্রিয়া দেখানো অন্যায় নয়।
বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে যাতে কোনো জটিল অবস্থা বজায় না থাকে সে জন্য সরকার ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথে এগোনোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের সাক্ষাতের পাঁচ দিনের মাথায় গত বুধবার রাতে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণ ঘিরে তৈরি জটিলতা নিরসন করতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিচার বিভাগ কী কী কারণে নাখোশ তা সরকারপ্রধান অবহিত হয়েছেন। এ অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আওয়ামী লীগের দাবি পূরণ করার সম্ভাব্য মসৃণ পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে মসৃণ পথে দাবি পূরণ না হলে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতিকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য অনুরোধ করবে। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে তদন্তের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেবে সরকার। তখন প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বিষয়টি তদন্ত করার জন্য সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে নির্দেশ দিতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধান বিচারপতির ‘অসদাচরণ’ প্রমাণের জন্য বেশকিছু অভিযোগ সরকার যোগাড় করেছে। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত একজন আসামির পরিবারের সঙ্গে বৈঠক, আবেদনকারীর অনুরোধে আপিল বিভাগের বেঞ্চ পরিবর্তনসহ প্রধান বিচারপতির বিভিন্ন বক্তব্যের অডিও এবং ভিডিও জোগাড় করা হচ্ছে।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, উদ্ভূত বিষয়গুলো নিয়ে যে কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সেখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলবেন। এর পরই নির্ধারিত হবে, আসলে প্রধান বিচারপতি এবং সরকারের টানাপড়েনের পরিণতি কী। তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা আশা করছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির সমঝোতা হতে পারে। তবে ষোড়শ সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে সমঝোতার পথ রুদ্ধ হলে বিকল্প পথের দিকে এগুবে সরকার। সরকারে এখন বিকল্প পথগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 242 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ