যে কারণে হারলেন জামালপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনে আ‘লীগ সমর্থিত প্রার্থী

Print


জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুর জেলা পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী অ্যাডভোকেট এইচ আর জাহিদ আনোয়ার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার পিতার বিতর্কিত ভূমিকার জন্য তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা এবং আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী তাকে‘রাজাকারপুত্র’ হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী মনোনয়ন দেওয়ার জন্য একক প্রার্থী হিসাবে তার নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড জেলা আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরীকে মনোনয়ন না দিয়ে অ্যাডভোকেট এইচ আর জাহিদ আনোয়ারকে মনোনয়ন প্রদান করে।
স্বাধীনতাযুদ্ধে বিতর্কিত পরিবারের সন্তান হওয়ায় এবং জামালপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় একজন ব্যক্তিকে প্রার্থী করায় সকল মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সংবাদ সম্মেলন করে তাকে ‘রাজাকারপুত্র’ হিসাবে অবাঞ্ছিত ঘোষণাকরে। প্রায়জন প্রতিনিধিসহ আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট লিখিত আবেদন করেন। প্রার্থিতা পরিবর্তন না করায় নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় জেলা আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট এইচ আর জাহিদ আনোয়ারের মধ্যে। তাদের মধ্যে ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে টানা ৪০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন।
জামালপুর জেলা আওয়ামীলীগের নবগঠিত কমিটির প্রথম সভায় তাকে সর্ব সম্মতিক্রমে জেলা পরিষদের প্রার্থী মনোনীত করে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা এই নির্বাচনের ভোটারদের কাছে দিনরাত প্রচারণা চালিয়ে তাকে বিজয়ী করার জন্য কাজ করেন। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে অ্যাডভোকেট এইচ আর জাহিদ আনোয়ার চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। জাহিদ আনোয়ার প্রার্থী হওয়ার পর থেকে কালো টাকার প্রভাবের পাশাপাশি স্বাধীনতাযুদ্ধে বিতর্কিত পরিবারের সন্তান হওয়ার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। ফলে জাহিদ আনোয়ার নির্বাচনের মাঠে সমালোচনার তোপের মুখে পড়েন। প্রার্থী জাহিদ আনোয়ারকে ঠেকাতে জামালপুরের মুক্তিযোদ্ধারা সোচ্চার হয়ে উঠেন। নির্বাচনের আগে বেশ কয়েক বার সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির প্রার্থীর বিরুদ্ধে জনমত গঠনে তৎপর ছিলেন।
নির্বাচনের কয়েক দিন আগে জামালপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম খোকা সংবাদ সম্মেলনে এইচ আর জাহিদ আনোয়ারকে ‘রাজাকারপুত্র’ বলে জন সমক্ষে তোলেধরেন। এ নিয়ে জাহিদ আনোয়ার বেশ সমালোচনায় পড়েন। সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম খোকা লেখক মুনতাসির মামুনের ‘মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র’ বই থেকে উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘১৯৭১ সালের তদানিন্তন জামালপুর মহকুমা শহরের গঠিত শান্তি কমিটির কুখ্যাত ১৩ জনের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এইচ আর জাহিদ আনোয়ারের বাবা কাজেম উদ্দিন আহাম্মেদ।
মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর পক্ষ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভাবে রাজাকার বাহিনীর সংগঠক ও ছিলেন কাজেম উদ্দিন। ব্যক্তিগত জীবনে এইচ আরজাহিদ আনোয়ার কোনোদিনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সম্পৃক্ত ছিলেননা। ১৯৭১ সালে এইচ আরজাহিদ আনোয়ার একজন শিক্ষিত তরুণ হয়েও মুক্তিযুদ্ধে তার কোনো ভূমিকা ছিলনা।’

সর্বশেষ ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিনও প্রভাব শালী ওই ব্যবসায়ী কালো টাকার প্রভাব খাটিয়ে জেলার কয়েকটি কেন্দ্রে নির্বাচনী আচরণ বিধি ও আইন ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে চেয়ারম্যান পদে এইচআর জাহিদ আনোয়ারের ব্যালটেসিল মেরে ভোট নেয়ার চেষ্টা করেন। দু-একটি কেন্দ্রে জাহিদ আনোয়ারের ঘোড়া প্রতীকের ব্যালটে অবৈধভাবে সিল মেরে ভোট নিতে পারলেও জেলার অন্যান্য কেন্দ্র গুলোতে আওয়ামীলীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সুষ্ঠু ভোটের পক্ষে সরব উপস্থিতি এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার অধিকতর সতর্কতার কারণে ও তারা সিল মেরে ভোট নিতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচনে জামালপুর জেলা আওয়ামীলীগের মনোনীত ও পরীক্ষিত আওয়ামীলীগ নেতা জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরীর কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এইচ আর জাহিদ আনোয়ার পরাজিত হন। ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী তার আনারস প্রতীকে ৬০২ ভোট পেয়ে জামালপুর জেলা পষিদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এইচ আর জাহিদ আনোয়ার তার ঘোড়া প্রতীকে পান ৩৭৩ ভোট। এ দিকে জামালপুর জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান জামালপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় সর্বত্র স্বস্থি বিরাজ করছে। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 333 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ