রাজশাহীর বাতাস ঢাকার চেয়ে বিষাক্ত

Print

শিল্পায়ন ও নগরায়ণ— উন্নয়নের এ দুই অনুষঙ্গ বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ বলে পরিচিত। সে হিসেবে ঢাকার বাতাসকেই সবচেয়ে দূষিত বলে ধরে নেয়া হয়। যদিও সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুর মান পরীক্ষা করে তারা দেখেছে, বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ঢাকার চেয়ে রাজশাহীর বাতাসেই বেশি। অথচ শিল্প ও নগরায়ণ বিবেচনায় পশ্চাত্পদ শহরগুলোর একটি রাজশাহী।
যেসব উপকরণে বাতাস বিষাক্ত হয়, সালফার ডাই-অক্সাইড তার অন্যতম। রাজশাহীর বাতাসে উপাদানটি বেশি থাকার কারণ হিসেবে কয়লাকেই মূলত দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বড়পুকুরিয়ার কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র থেকে সৃষ্ট সালফার ডাই-অক্সাইড ওই অঞ্চলের বাতাসে মিশছে। ইটভাটায় পোড়ানো কয়লা থেকেও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে উপাদানটি। রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হওয়ার কারণে বাতাসেই তা ভেসে থাকছে।

বায়ুর মান পরীক্ষায় নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (সিএএসই) প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল— আটটি শহরে ১১টি কনটিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন (সিএএমএস) স্থাপন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে চারটি রয়েছে ঢাকায়। স্টেশনগুলো থেকে পাঠানো তথ্য রাজধানীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। এর ভিত্তিতে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে অধিদপ্তর।
সংস্থাটির মাসভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চে রাজশাহীর বাতাসে ঘনমিটারপ্রতি সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম। একই সময়ে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় এর পরিমাণ রেকর্ড করা হয় ২৮ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম। তার আগে যেসব মাসের উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেখানেও একই চিত্র দেখা যায়। গত বছরের নভেম্বরে রাজশাহীর বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ রেকর্ড করা হয় প্রতি ঘনমিটারে সর্বোচ্চ ৭০ মাইক্রোগ্রামের বেশি। একই সময়ে ঢাকার দারুস সালাম এলাকায় এর পরিমাণ হিসাব করা হয় প্রতি ঘনমিটারে ৬০ মাইক্রোগ্রাম।
মাসভিত্তিকের পাশাপাশি বছরওয়ারি প্রতিবেদনও প্রকাশ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বছরভিত্তিক প্রতিবেদনের সর্বশেষ তথ্য রয়েছে ২০১৫ সালের। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ওই বছর রাজশাহীর বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল প্রতি ঘনমিটারে গড়ে ৩৬ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রাম। সে বছর ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় এর পরিমাণ পাওয়া যায় প্রতি ঘনমিটারে ৬ দশমিক ৬৩ ও দারুসসালাম এলাকায় ৭ দশমিক ৮৯ মাইক্রোগ্রাম। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে গড়ে ৮ দশমিক শূন্য ৮, গাজীপুরে ১১ দশমিক ৪, চট্টগ্রামে ১২ দশমিক ৭ ও বরিশালে ৪ দশমিক ৮৩ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাই-অক্সাইড রেকর্ড করা হয়।
জানতে চাইলে সিএএসই প্রকল্পের পরিচালক ড. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, পার্শ্ববর্তী জেলা, বিশেষ করে দিনাজপুরের কয়লা খনি থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া রাজশাহী শহরে সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাসের প্রধান উত্স। অনেক ইটভাটাও রয়েছে উত্তরবঙ্গে, যেগুলোয় জ্বালানি হিসেবে কয়লা পোড়ানো হচ্ছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন শিল্পের ধূলিকণার কারণেও এ অঞ্চলে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি। গবেষণায় দেখা যায়, শত শত মাইল দূরের ধূলিকণাও শহরের বায়ুতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি এসব অঞ্চলের মানুষ জ্বালানি হিসেবে এখনো কাঠ ব্যবহার করে।
উত্তরবঙ্গ ঘুরে জানা যায়, রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত ইটভাটার সংখ্যা ১৮৭। এর মধ্যে ১২০টি ইটভাটা পুরনো প্রযুক্তির। হাইব্রিড প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ৬০টি। প্রযুক্তি ভিন্ন হলেও সব ইটভাটায়ই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় কয়লা। উত্পাদনের ক্ষমতাভেদে একেকটি ইটভাটায় ৬০০ থেকে দুই হাজার টন পর্যন্ত কয়লা ব্যবহার হয়। শহরের মধ্যে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চলাচল করলেও শহরের বাইরে এখনো ডিজেলচালিত যানবাহন চলাচল করছে। বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাওয়ার এটিও একটি কারণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা মানুষের শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। অ্যাজমায় আক্রান্ত বয়স্ক ও শিশুরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজশাহীর বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত বিপুল সংখ্যক রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. সঞ্জিত কুমার সাহার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানকার হাসপাতালগুলোয় শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও হাঁপানি নিয়ে চিকিত্সার জন্য আসে অনেকে। তবে এসব সমস্যা যে বায়ুদূষণের কারণে হচ্ছে, সে-সম্পর্কিত কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা, ডায়াবেটিস ও ধূমপান— এ তিন কারণে প্রতি বছর যত মানুষ মারা যায়, তার চেয়ে বেশি মারা যায় বায়ুদূষণের কারণে। বায়ুদূষণের ফলে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) হতে পারে। সারা বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ সিওপিডি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোহাহেরুল হক বলেন, বায়ুদূষণের কারণে ফুসফুস ও শ্বাসনালির সব ধরনের সংক্রামক রোগ হতে পারে। অ্যাজমা, হাঁপানি ছাড়াও উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোক এমনকি ক্যান্সার পর্যন্তও হতে পারে বায়ুদূষণের কারণে।
সালফার ডাই-অক্সাইড ছাড়াও শহরগুলো পরিবেষ্টনকারী বাতাসে অক্সাইডস অব নাইট্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড, ওজন, পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ১০ ও পিএম ২ দশমিক ৫ পরিমাপ করে পরিবেশ অধিদপ্তর। বাংলাদেশের জলবায়ু, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে মার্চ-মে, জুন-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর-নভেম্বর ও ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি— চারটি সময়ে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যামবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ডসের (বিএনএএকিউএস) ভিত্তিতে নির্ণীত বায়ুমানের তুলনা করা হয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 55 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ