রাজশাহী বগুড়ায় বৃষ্টি তীব্র হচ্ছে শীত

Print

পৌষের বিদায়লগ্নে এসে দাপট দেখাতে শুরু করেছে শীত। প্রকৃতিতে বইছে উত্তরের হিমেল হাওয়া। তাপমাত্রা নামছে ক্রমশ। শীতের চাদর মুড়ি দিয়ে হিম ঘন কুয়াশা ঢেকে দিচ্ছে প্রভাতের আলোকরশ্মি। ঘাসের ডগায় জমে থাকা কুয়াশার জলবিন্দুর ওপর অস্পষ্ট সূর্যালোক প্রতিবিম্বিত হয়ে অপার সৌন্দর্যের আলপনা তৈরি করে জানান দিচ্ছে— শীত এসেছে। রাতের কুয়াশা পুকুরের জলে বিছিয়ে দিচ্ছে হাল্কা আস্তরণ। শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশা জেঁকে বসেছে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল।

রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় হাড় কাঁপানো শীতের সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। গতকাল ভোর সোয়া ৫টা থেকে থেমে থেমে ৫ ঘণ্টায় রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে দশমিক ৪ মিলিমিটার। বগুড়ায গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে শীতের তীব্রতা ছড়াচ্ছে। বৃষ্টি আর শীতে বগুড়ার ১২টি উপজেলায় জনজীবন প্রায় গৃহবন্দী দশা।
উত্তরের হিমালয় থেকে নেমে আসা ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডায় লালমনিরহাটের দরিদ্র মানুষের করুণ সময় যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে শীত সহ্য করতে না পেরে সদর উপজেলার কালমাটি মাস্টার-পাড়া গ্রামের পচা মাহমুদ (৭০) কোল্ড স্ট্রোকে মারা গেছেন। আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে মোগলহাট ইউনিয়নের জারী ধরলা গ্রামের অমিতন বেওয়া (৬৫), কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের শিয়ালখোয়া গ্রামের তরণী কান্ত (৬৩) মারা যান।
প্রচণ্ড শীতে দিশেহারা উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যরেখার নীচের মানুষ। শীতবস্ত্র কেনার সামর্থ্যহীন এসব শীতার্ত মানুষ তাকিয়ে থাকেন সরকারি অথবা বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতার দিকে। কিন্তু যেটুকু শীতবস্ত্র মিলেছে তা শীতের তুলনায় খুবই নগণ্য। অনেকের ভাগ্যে এখনো মিলেনি শীতবস্ত্র। লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার একেএম ইদ্রিস আলী জানান, তীব্র শীতে অসহায় এখন মানুষ। জেলার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার শীতার্ত মানুষের জন্য এ পর্যন্ত ২৫ হাজার পিচ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘন কুয়াশায় দুপুর পর্যন্ত দেখা মেলেনি সূর্যের। কোনো কোনো জনপদে হাড় কাঁপানো শীতের প্রকোপে কাহিল দশা। প্রায় সারাদেশে রাতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। ঘন কুয়াশায় পদ্মার শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, চাঁদপুর-শরীয়তপুর নৌপথসহ যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুতে পারাপার ব্যাহত হচ্ছে তীব্রভাবে।
শীতে হতদরিদ্র মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে। শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকেই খড়কুটোতে আগুন জ্বালিয়ে শীতের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছে। বহু এলাকায় কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কমে আসায় সকাল দশটা পর্যন্ত যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। একই কারণে দূরপাল্লায় যানবাহন চলাচল করতে বেশি সময় লাগছে। মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চলাচল করছে না। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাড়তি এসব রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম দশা চিকিত্সক ও নার্সদের। শীতে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোখলেছুর রহমান জানান, শীতের কারণে মানুষের নিউমোনিয়া, সর্দ্দি, জ্বর, কাশি, আমাশয় রোগ হচ্ছে। এসব রোগে মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে কায়িক শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ঘর হতে বাইরে যেতে পারছেন না। টাকার অভাবে কিনতে পারছেন না শীতবস্ত্র।
শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি,দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া,চাঁদপুর-শরীয়তপুর নৌপথে রাত গভীর হলেই ফেরি পারাপার বন্ধ রাখতে হচ্ছে কুয়াশার কারণে। তিনটি নৌপথে যানবাহন সারারাত পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকছে। সকালে কুয়াশা কাটতে শুরু করলে আবার পারাপার শুরু হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক গিয়াসউদ্দিন পাটোয়ারী জানান, প্রতি রাতেই ঘন কুয়াশায় পদ্মা ঢাকা পড়ে। সামান্য দূরেও কিছু দেখা যায় না।
হিমালয় থেকে বাংলাদেশে হিমেল হাওয়া আসতে শুরু করার পর গতকাল শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, হিমালয়ে প্রবল তুষারপাতের জেরেই শীত ধীরে ধীরে উত্তরবঙ্গ হয়ে দেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে অন্যান্য অঞ্চলে দাপট দেখাচ্ছে। কনকনে হাওয়া নেমে আসবে মোটামুটি সর্বত্রই। পরিমণ্ডলে ঢুকে পড়েছে উত্তরে বাতাসও। এই শীত কম-বেশি কয়েকদিন থাকবে। রাজধানী ঢাকায় গত ছয় দিনে তাপমাত্রা নেমেছে। ফলে শীত বাড়ছে। হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন জানান, এই শীত কয়েকদিন থাকবে। চলতি জানুয়ারি মাসে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে একটি মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং এক থেকে ২টি মৃদু অথবা মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 48 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ