রাতের রাজধানী আতঙ্কের নগরী

Print


রাত ১টা। মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের সামনের সড়কে বেশ জটলা। এগিয়ে যেতেই দেখা গেল, এক কিশোরকে বেধড়ক পেটাচ্ছে চার তরুণ। কিশোর বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছিল। এক ব্যক্তি এক নৈশপ্রহরীর সহায়তায় ওই কিশোরকে উদ্ধার করে নিয়ে যান স্থানীয় র‌্যাব ক্যাম্পে। কিন্তু গেটে দায়িত্বরত র‌্যাব সদস্যরা জানান, এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। থানায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তারা। র‌্যাব ক্যাম্প থেকে থানার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে লেগুনায় চড়ে ওই চার তরুণের সঙ্গে আরও কয়েকজন চলে আসেন ফের। সড়কের মাঝপথ থেকে ওই ছেলেটিকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় তারা। যাওয়ার আগে ছেলেটি শুধু বলেছিল- শ্যামলী থেকে শিয়া মসজিদ পর্যন্ত লেগুনায় এসেছিল সে। নামার পর তার কাছে থাকা সবকিছু ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ার কারণে তার ওপর চড়াও হয় ওই চার তরুণ। গুরুতর আহত হয়ে পড়েছিল ওই কিশোর। ওই তরুণরা কিশোরটিকে নিয়ে যাওয়ার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এমন ঘটনা প্রতিরাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘটছে। পরিবহন শ্রমিকদের একটি অসাধু চক্র মিলে গড়ে তুলেছে এহেন অপকর্মের জাল। গভীর রাতের ঢাকায় যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে তারা। শুধু তাই নয়, পিটিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনাও ঘটছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লেগুনা ও মিনিবাসের বেশ কিছু শ্রমিক জড়িয়ে পড়েছে এই অপকর্মে। তবে ঘটনার পর কেউ পুলিশের দ্বারস্থ না হওয়ার কারণে এমন অপরাধের বিষয়টি সাধারণত আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, এ ধরনের অপরাধী চক্র সম্পর্কে ছয় মাস ধরে আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে। আমি বলব, শুরুতেই এমন অপরাধ দমন করতে হবে। গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হলে, একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হবে, অন্যদিকে সরকারেরও নজরে আসবে। এদের ঠেকানো না গেলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

ওলিউর রহমান নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, গত ৩ জানুয়ারি রাত দেড়টার দিকে মোহাম্মদপুর থেকে পায়ে হেঁটে ফার্মগেট আসছিলেন তিনি। আসাদগেট মোড়ে এসে দেখেন একটি লেগুনা যাচ্ছে মোহাম্মদপুরের দিকে। সেটির যাত্রীর আসনে দুজন বসা ছিল। ফার্মগেট আসার পর চালকসহ তিনজন মিলে এক হাজার টাকা ভাড়া দাবি করেন তার কাছে। দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার কাছে থাকা আড়াই হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের কাছে এ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ এলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাদের টহল টিম কিন্তু রাতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে থাকে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা এটি। রাত ১টার দিকে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের সামনে এক যাত্রীর সবকিছু কেড়ে নিতে চাইছিল এ রকম একটি চক্র। কিছু দূরে ছিল পুলিশের একটি টহল ভ্যান। পুলিশ বাঁশি বাজালেই ওই যাত্রীকে ছেড়ে পালিয়ে যায় তারা। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমিনুল ইসলাম এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিলেন।

একই বছরের ১ আগস্ট রাত দেড়টার ঘটনাটি এ রকমÑ এক সংবাদকর্মী রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে থেকে মিরপুরগামী একটি বাসে ওঠেন। ভেতরে আগে থেকেই কয়েকজন বসা ছিলেন। বাসটি কিছু দূর যাওয়ার পর ওই সংবাদকর্মীকে মারধর করে কাছে থাকা সাড়ে ৩ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন তারা। একপর্যায়ে সংবাদকর্মী পরিচয় পাওয়ার পর আরও বেশি মারতে থাকে তাকে। এ সময় তারা বলছিল- ‘ওকে মেরে ফেল।’ পরে সারা রাত বিভিন্ন সড়কে ঘুরিয়ে ভোররাতে আবার মৎস্য ভবনের সামনে ফেলে যায় তারা। নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি ওই সংবাদকর্মী।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 264 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ