রাতে যৌনকর্মী, দিনে ফাস্টফুড ও গাঁজার টাকা নেয় পুলিশ

Print

রাতে যৌনকর্মী এবং দিনে ফাস্টফুড ও গাঁজা বিক্রেতাদের থেকে টাকা নেয় শাহবাগ থানা পুলিশ। সরেজমিনে অনুসন্ধান করে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এক. শাহবাগ মোড় অনেক ব্যস্ত এলাকা। বিভিন্ন কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণও বটে। শাহবাগ ও এর আশেপাশে মানুষের চাহিদা মেটাতে কিছু ভ্রাম্যমাণ পথ খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেগুলো রাস্তায় ভিড় বাড়ায়, জটলা বাধায়। ফলে যানজটও তৈরি হয়। এসব অজুহাত দেখিয়ে তাদের কয়েকবার তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু টাকার বিনিময়ে এসব দোকানকে ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছে পুলিশ। শাহবাগ, টিএসসিসহ আশপাশের এলাকায় এমন শখানেক ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে পজিশন ও দোকান ভেদে প্রতিদিন ৫০, ৭০ এবং ১০০ টাকা নেয় পুলিশ। দোকানদারদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

তবে ব্যবসার স্বার্থে এবং পুলিশের ভয়ে কেউ মিডিয়ায় নাম প্রকাশে রাজি হয়নি। বেশ কয়েকজন দোকানির সাথে আলাপ কালে এসব তথ্য জানার পর সাংবাদিক পরিচয়ে কথা বলতে চাইলে তারা রাজি হননি। বরং উল্টো পুলিশকে টাকা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। পরে অবশ্য এর কারণও জানা গেছে।
তারা বলেন, ভাই এসব লিখলে আমাদের ক্ষতি। প্রথমত পুলিশ ঝামেলা করে। আর মূল সমস্যা হলো আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। কয়দিন পরপর বিভিন্ন কারণে আমাদের তুলে দেয়। তখন আমাদের সংসার চলে না। তাই টাকা দিয়েও আমরা ব্যবসা করতে রাজি।
দুই.
মৎস্যভবন এলাকার উল্টোপাশে বার কাউন্সিল ভবন। ভবনের পাশ ঘেঁষে শাহবাগমুখী পথচারী চলাচলের যে রাস্তা আছে সেটি সকাল থেকে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত থাকে ব্যস্ত পথচারীর পদচারণায় মুখর। সারাদিন গড়িয়ে মধ্যরাতে যখন নগরবাসীর ব্যস্ততা কমে যায় তখন এই ফুটপাতগুলোর চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। মধ্যরাত হওয়ার পর তখন যৌনকর্মী ও হিজড়াদের দখলে চলে যায়। সারিসারিভাবে ফুটপাতের দেয়ালের সাথে অস্থায়ীভাবে ঝুপড়ি তৈরি করে এক শ্রেণীর খদ্দেরদের চাহিদা মিটাতে ব্যস্ত তারা।
কথা হয়, আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী বিজলী (এটা তার ছদ্মনাম হতে পারে) নামে একজনের সাথে।
তিনি কে জানান, তারা অসহায় হয়ে জীবিকার তাগিদে এই কাজে জড়িয়েছেন। পেটের ক্ষুধা নিবারণ, সংসারের খরচ যোগাতে কোনো উপায় না পেয়ে এমন কাজ করি।
কত টাকা পান? এমন প্রশ্নের জবাবে বিজলী বলেন, এই জন্য তারা মাত্র ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। প্রতিরাতে তার মতো প্রায় ৫০ জনের মতো নারী সড়কের পাশে বিভিন্ন স্থানে রাত ১২ টা থেকে ২টা ৩ টা পর্যন্ত থাকেন। এ সময় ৪ বা ৫ জন খদ্দের পান বলেও জানান। এভাবে গড় আয় তিনশ থেকে পাঁচ-সাতশ পর্যন্ত হয়। কিন্তু এর থেকে পুলিশ ১০০ টাকা করে নিয়ে যায়।
কোথাকার পুলিশ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোথাকার পুলিশ তা জানি না। আমাদের কাছ থেকে এই টাকা নিয়ে থানায় দেওয়া হয়। আর বলা থাকে পুলিশের কোনো অভিযানে পড়লে যেন আমরা দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার ভান করি। কিছুক্ষণ পর আমরা আবার ফিরে আসি।
মানুষের বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন কাজের সুযোগ আছে বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইলে বেরিয়ে আসে আরেক করুণ কাহিনী। তিনি বলেন, অভাবের সংসার ছোট বেলায় মানুষের বাসায় কাজ শুরু করি। তখন আমার বয়স ১৪/১৫ হবে। ৫০০ টাকা বেতন আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল ওই বাসায়।
কিন্তু এক রাতে আমার জীবনে নেমে আসে কালোরাত। বাসার গৃহকর্তা ছাড়া সবাই গ্রামের বাড়ি যায়। ওই রাতে বাসায় আমাকে একা পেয়ে গৃহকর্তা ধর্ষণ করেন। অনেক কান্নাকাটি করেও তার কাছ থেকে রেহায় পাইনি। সকালে বাসা থেকে বের হবার সময় তালা লাগিয়ে যেত। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ আমাকে সে ধর্ষণ করেছে।
গৃহকর্ত্রীসহ অন্যরা বাসায় ফিরে আসার আগের দিন আমাকে এক হাজার টাকা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেয়। আর কাউকে কিছু বললে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখায়।
তারপর আমি পরিচিত আরেকজন কাজের মেয়ের মাধ্যমে এক বাসায় আশ্রয় নিই। সেখানে কিছুদিন থেকে আরেক বাসায় কাজে লাগি। সেখানেও বাড়িওয়ালার ছেলে আমাকে এক রাতে ধর্ষণ করেন। তারপর এটা ভাগ্যের সাথে মিশে যায়। পরে একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করে ঘরবাঁধি। কিন্তু ৫/৬ বছর পর সে আবার বিয়ে করে আমাকে এবং আমার সন্তানদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। আমি কোনো কাজ না পেয়ে পরিচিত একজনের মাধ্যমে আবাসিক হোটেলে এ কাজে নামি। এখন বয়স হয়ে গেছে। তাই আবাসিক হোটেলে আমাদের চাহিদা নেই। কিন্তু পেট তো চালাতে হবে। সংসারের খরচ তো যোগাতে হবে। তাই এ ছাড়া উপায় দেখিনি।
তিন.
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ঢাকা বিশবিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন স্থানে গাঁজা সেবন, বেচা-কেনা এটা এখন আর সিক্রেট কিছু নয়। বরং ওপেন বিষয়। এসব এলাকায় রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। পুলিশের ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেট তাদের কারবার পরিচালনা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বকরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ আস্বীকার করেছেন। তবে তিনি মধ্যরাতে যৌনকর্মীরা অস্থায়ী ঝুপড়ি করে দেহব্যবসা করার বিষয়টি স্বীকার করলেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। ওসি বলেন, যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ সজাগ আছে। পুলিশ দেখলে তারা পালিয়ে যায়। টহল পুলিশ কোনো ঝুপড়িঘর দেখলে গুঁড়িয়ে দেয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 163 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ