রাষ্ট্রপতি কী সিদ্ধান্ত দেবেন

Print

নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির সংলাপের মধ্য দিয়ে ইতিবাচক আবহ সৃষ্টি হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। সে ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে তাদের প্রস্তাব ও সুপারিশ সম্পর্কে অবহিত হলেন। এখন একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের অপেক্ষা, যার জন্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সারাদেশের মানুষ তাকিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রপতির দিকে। কী সিদ্ধান্ত দেবেন রাষ্ট্রপতি, সেটা দেখার অপেক্ষায় সবাই।
বিএনপির সঙ্গে আলোচনা দিয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর শুরু হয় রাষ্ট্রপতির সংলাপ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে গত ২৫ দিনে নিবন্ধিত বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির সংলাপ হয়েছে। তবে নিবন্ধিত আরও কিছু দলের সঙ্গে এই সময়ের
মধ্যে আলোচনা হয়নি। তাদেরও সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে গতকাল রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। এরই মধ্যে সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলো ইসি পুনর্গঠনে তাদের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছে। সেগুলো বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আওয়ামী লীগ তা মেনে নেবে। বিএনপি নেতারা বলেছেন, তারা রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সংলাপে আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ দল নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপিসহ কয়েকটি দল সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা গতকাল সংবিধানের বিধান অনুযায়ী এখনই নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন করতে রাজি বলে রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রস্তাবে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সম্ভব হলে এখনই একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন অথবা অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে।
আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করবেন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮-এ বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করিবেন।’ এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির দিকেই তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক দলগুলো। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, সবার সঙ্গে আলোচনার পর বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে তিনি বিবেচনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।
বিদায়ী ইসি গঠনের সময়ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ ২৩টি রাজনৈতিক দলের মতামত নেন। তখন সার্চ কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল নতুন কমিশনের জন্য তাদের পছন্দের ব্যক্তির নামের তালিকা দিলেও বিএনপি কোনো নাম দেয়নি। ওই কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে সুপারিশ জমা দেয়, তাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চার কমিশনার নিয়ে পাঁচ পদের জন্য ১০টি নাম আসে। সেখান থেকেই পাঁচজনকে বেছে নেন রাষ্ট্রপতি। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে নামের সুপারিশ তৈরি করতে চার সদস্যের সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটি গঠন করা হয়। অবশ্য পরে ওই সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত বিদায়ী নির্বাচন কমিশন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক হয়েছে। তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন ইসি নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক হতে দিতে চায় না সরকার।
এবার সংলাপের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গতকাল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনাকালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চার দফা প্রস্তাব ও ১১টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম দিনের সংলাপে বিএনপি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার হতে পারেন এমন ১০ সদস্যের নাম প্রস্তাবের পাশাপাশি সার্চ কমিটিতে কারা থাকবেন, তাদের নামও রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছে। ইসিতে একজন নারী সদস্য নিয়োগেরও প্রস্তাব দিয়েছে তারা। সার্চ কমিটির জন্য ৫ ও নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য ৫ জন করে মোট ১০ জন সাবেক বিচারপতি ও শিক্ষাবিদের নামের তালিকাসংবলিত একটি বন্ধ খাম রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরই মধ্যে বিএনপি নির্বাচনকালীন একটি ‘সহায়ক সরকার’ গঠনের দাবিও তুলেছে।
ইসি গঠনের আইন প্রণয়নসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরে। ১৪ দলের আরেক শরিক বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টি সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত আইন তৈরি ও সে অনুযায়ী সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেছে।
সংলাপে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছে। চলমান দশম জাতীয় সংসদেই ইসি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আইন প্রণয়নসহ ১৭ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। তবে বর্তমান সংসদের অধীনে নতুন ইসি গঠনের আইন করার বিষয়ে বিরোধিতা করেছে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। ইসি গঠনে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণসহ তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া, নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নিবন্ধিত সব দলের একজন করে প্রতিনিধি এবং অনিবন্ধিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দলের ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে সার্চ বা সিলেক্ট কমিটি গঠনসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া জাসদ (আম্বিয়া-প্রধান), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), তরীকত ফেডারেশন, ইসলামী ঐক্যজোট, ন্যাপ, গণতন্ত্রী পার্টি, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলনসহ আরও কয়েকটি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে ইসি গঠনে সার্চ কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 112 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ