শব্দদূষণে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

Print


দিন দিন বেড়েই চলেছে শব্দদূষণের মাত্রা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্য বিভাগীয় শহরেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দদূষণ। ফলে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে মানুষের শ্রবণশক্তি। উচ্চমাত্রার শব্দ শ্রবণশক্তি কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শরীরের রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, হৃদযন্ত্রের কম্পন বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া শব্দদূষণের কারণে হজম শক্তি কমে, মাংসপেশির খিঁচুনি সৃষ্টি হয় এবং শিশুদের বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, শব্দদূষণজনিত রোগে সারাবিশ্বে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এ রোগে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ম্যালেরিয়া ও এইডস রোগে মৃত্যুর চেয়েও বেশি বলে জানায় সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রাণ গোপাল দত্ত আমাদের সময়কে জানান, শব্দদূষণের কারণে প্রথমত মানুষের শ্রবণ শক্তি লোপ পায়। কানের কোষগুলো দুর্বল হয়ে যায়। অনেক সময় মানুষ বধির হয়ে যায়। এ ছাড়া রক্তচাপ বাড়ে। শিশু ও বৃদ্ধদের হৃদযন্ত্রে বড় ধরনের সমস্যা হয়। এমনকি হৃদযন্ত্র দুর্বল মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।

তবে এ রোগে আক্রান্তদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, শব্দদূষণের কারণে শ্রুতিপ্রতিবন্ধীদের উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করা সম্ভব।

এদিকে শব্দদূষণের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে দেশব্যাপী কাজ শুরু করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে ৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি বিভাগে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, গাড়িচালক প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গাড়ি চালকদের প্রশিক্ষণ এবং স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে শব্দদূষণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, একজন মানুষের জন্য স্বাভাবিকভাবে সহনীয় শব্দের মাত্রা হলো ৪৫ ডেসিবল। অথচ রাজধানী ঢাকায় শব্দের মাত্রা ১৩১ ডেসিবল। ফার্মগেটে বর্তমানে শব্দের মাত্রা ১৩১ ডেসিবল। আর সর্বনিম্ন ৬০-৭০ ডেসিবল। এ ছাড়া ঢাকার অন্যান্য স্থানে ১২০ থেকে ১২৫ ডেসিবল মাত্রায় শব্দদূষণ হচ্ছে। বিভাগীয় শহরগুলোতেও শব্দের মাত্রা ১২০ থেকে ১২৫ ডেসিবল।

বিভাগীয় শহরগুলোর শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করতে জরিপ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত পাঁচটি শহরের শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে এ তথ্য প্রকাশ করবে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইছল আলম ম-ল জানান, দেশের বড় বড় নগরীগুলো শব্দদূষণের শিকার। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর শব্দদূষণ সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি আরও জানান, সরকার এর ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সবাইকে সক্রিয় করতে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা করেছে। পাশাপাশি এ উদ্যোগকে বাস্তবায়ন করতে ৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

কর্মসূচি পরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে এখন আর সহনীয় শব্দের মাত্রা নেই। ঢাকা শহরের পাশাপাশি বিভাগীয় শহরগুলোর অবস্থাও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, অনেক বাসাবাড়ি তৈরি করতেও বিভিন্ন ধরনের মেশিন ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ইট ভাঙা, সিমেন্ট বালু মেশানোর মেশিন। এসব মেশিন শব্দের সৃষ্টি করে। ফলে মানুষ খুবই সমস্যায় পড়েন।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, বন ধ্বংস ও নগরায়ণ, শিল্প ও প্রযুক্তির প্রসার, যান্ত্রিক যানবাহনের ব্যবহার শব্দদূষণের মূল কারণ। শব্দদূষণ শুধু নাগরিক জীবনের সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে গ্রামে, অফিস-আদালতে, হাট-বাজারে, হাসপাতালে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে যাচ্ছে। শব্দদূষণের কারণে শিক্ষার্থীদের মেধায় বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অসুস্থ মেধাশূন্য প্রজন্ম।

আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের (আশা) মতে, স্বাভাবিক শব্দের মাত্রা হওয়া উচিত ২৫ ডেসিবল। হালকা ২৬-৪০ ডেসিবল, মধ্যমপন্থি ৪১-৫৫ ডেসিবল, মধ্যমপন্থি তীব্র ৫৬-৭০ ডেসিবল, তীব্র ৭১-৯১ ডেসিবল আর অসহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৯১ ডেসিবল। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে ২০ ডেসিবল, হালকা মাত্রা ২১-৪০ ডেসিবল, তীব্র মাত্রা হচ্ছে ৭১-৯০ ডেসিবল। আর অসহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৯১-১২০ ডেসিবল। এ হিসেবে বাংলাদেশের সব বিভাগীয় শহর খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। কারণ প্রত্যেক বিভাগী শহরেই শব্দদূষণের মাত্রা ১২০ ডেসিবল কিংবা তারও বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১১ সালের পর থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বিশ্বের বেশ কয়েকটি শহরে শব্দদূষণের মাত্রা বেড়েছে। যা শহরবাসীর জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির, এমনকি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 116 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ