শাহজালালে ভিসা ছাড়াই বিদেশ যাওয়ার সুযোগ!

Print

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিমানযোগে ভিসা ছাড়াই একাধিক যাত্রীর বিদেশে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে ভিসা চেকিং ফাঁকি দিয়ে জাল ডিউটি পাসধারী যাত্রীরা বিকল্প পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে বিপুল অর্থের বিনিময়ে সিভিল এভিয়েশন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের একটি স্বার্থান্বেষী চক্র এই অবৈধ কাজে সহায়তা করছে, যা দেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
গত ২৭ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দরে ভিসা ছাড়াই দুই বাংলাদেশি হজযাত্রীকে শনাক্ত করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় জেদ্দা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ওই দুই বাংলাদেশিকে প্রায় ১৬ ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে সৌদি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ভিসার ব্যবস্থা করে তাদের টার্মিনাল ছাড়তে হয়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জেদ্দার মৌসুমী হজ অফিসার আনোয়ার হোসেন ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ চার সংস্থা কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।

চিঠি পাওয়ার পর ভিসা ছাড়া দুই হজযাত্রী কীভাবে ইমিগ্রেশন পার হয়ে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে জেদ্দায় পৌঁছলেন, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল জলিল।
বাংলাদেশ হজ মিশন জেদ্দা বিমানবন্দরে কর্মরত আনোয়ার হোসেন চিঠিতে জানান, ২৭ জুলাই ‘শাবান এয়ার ইন্টারন্যাশনালের (লাইসেন্স নম্বর ১৪৫৭) হজযাত্রী নাসিমা আক্তার, (পিআইডি নম্বর-১৪৫৭০৭২) একটি ফ্লাইটে জেদ্দার হজ টার্মিনালে অবতরণ করেন। এছাড়া আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনালের (লাইসেন্স নম্বর ০১৮৪) মালিক আমিনুল হকও হজ ভিসা ছাড়া সৌদি এয়ারলাইন্সের (এসভি ৮০৪) একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবে যান। তারা ভিসা ছাড়াই হজ করতে সৌদি আরবে গেছেন বলে সৌদি ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের আটক করে।
এ বিষয়ে আনোয়ার হোসেন চিঠিতে উল্লেখ করেন, ভিসা ছাড়া আগত ওই দুই বাংলাদেশিকে প্রায় ১৬ ঘণ্টা হজ টার্মিনালে অপেক্ষা করতে হয়। শেষপর্যন্ত সৌদি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ভিসা যোগাড় করে তাদের টার্মিনাল ছাড়তে হয়।
জেদ্দা বিমানবন্দরে ভিসা ছাড়া যাওয়া দুই বাংলাদেশি হজযাত্রী যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সৌদি আরবে গেছেন তারা হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সদস্য। এর মধ্যে একজন একটি এজেন্সির মালিক ও অন্যজন আরেকটি প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট।
এ বিষয়ে হাবের মহাসচিব শাহাদাত হোসেন তসলিম বলেন, বিষয়টি তিনি জেনেছেন। ভিসা ছাড়া কেউ চলে যাওয়া তার কাছে বোধগম্য নয়। ঘটনা জানার পরে তিনি আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনালের মালিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এটা সরাসরি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের ব্যর্থতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেন তিনি।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে আনোয়ার হোসেন আরও বলেছেন, ভিসা ছাড়া দুইজন হজযাত্রী কীভাবে বিমানে উঠলেন তা নিয়ে, জেদ্দা হজ টার্মিনালের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সমালোচনা করেছে। বিষয়টি হজ অফিস জেদ্দার জন্য বিব্রতকর এবং বাংলাদেশের সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার পরিপন্থী। বাংলাদেশ থেকে আসা সকল হজযাত্রীর ভিসাসহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট রয়েছে কিনা, তা ভালোভাবে যাচাই করার অনুরোধ জানান কর্তৃপক্ষকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিমানযোগে পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া যাত্রীর বিদেশে যাওয়ার ঘটনা অনেক পুরনো। ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ওই অসাধু চক্রকে খুঁজে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দেন। যেখানে মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ভিসা ছাড়া বিদেশে যাওয়া এখনো থেমে নেই।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা এভাবে দেশের বাইরে অবাধ গমনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় যে কোনো ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে। একইসঙ্গে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, জঙ্গি, পলাতক আসামিরা ডি-পাস ব্যবহার করে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে।
জানা গেছে, ইমিগ্রেশন চেকিং না হয়ে জাল ডি-পাস ব্যবহারের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার সময় গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন যাত্রীকে কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। আবার ডি-পাস ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় অনেক সময় প্রবেশ করতে না পেরে যাত্রীরা দেশে ফেরত আসছেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্টসহ (সিআইডি) অন্তত ২০টি সংস্থা দায়িত্ব পালন করে। সংস্থার সদস্যদের বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনের জন্য গেটপাস বা কার্ড লাগে। একে ডি-পাস বা ডিউটি পাস বলা হয়। লাল রংয়ের ইংরেজি ‘ডি’ হরফে ও সিভিল এভিয়েশনের লোগো সংবলিত পাসটি ব্যবহার করেন দায়িত্বরত সদস্যরা। ওই কার্ড ব্যবহার করে তারা বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন স্থানে অবাধ বিচরণ করতে পারেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরে কর্মরত সিভিল এভিয়েশন, বাংলাদেশ বিমান ও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহায়তায় ইমিগ্রেশন বাদে জাল ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি যাত্রীবেশে বিদেশে যাচ্ছেন। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় (কেপিআই) দায়িত্বরত সদস্যদের এভাবে অর্থের বিনিময়ে ইমিগ্রেশন বাদে বিদেশ ভ্রমণে সহায়তা করার সুযোগে যে কোনো সময় চিহ্নিত সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও পলাতক আসামিরা বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে। এছাড়াও সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠী বিমানবন্দরে নাশকতামূলক কর্মকা- ঘটাতে পারে।
উল্লেখ্য, এবারে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রীর মধ্যে এ পর্যন্ত ৮৪ হাজার ৮৭০ জনের ভিসা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ হাজার ৩৯ জন সৌদি আরবে পেঁৗছেছেন। এখনো ৭৫ হাজারের বেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। আর এখন ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট নিয়ে বিমানের টিকিটের অপেক্ষায় আছেন ৩২ হাজার ৮৩১ জন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 62 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ