শিক্ষকরাই বোঝেন না সৃজনশীল পদ্ধতি

Print

গাইডবই নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রায় এক দশক আগে প্রবর্তিত হওয়া সৃজনশীল পদ্ধতি এখনও বোঝে উঠতে পারেননি দেশের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষক। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) নতুন একটি জরিপে পাওয়া গেছে এই ভয়াবহ চিত্র। শিক্ষাবিদরা বলছেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তড়িঘড়ি করে এই পদ্ধতি প্রবর্তন করার ফলেই এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা পদ্ধতিতে যেকোনো পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা না গেলে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব হবে না বলেও মত দিয়েছেন তারা।
সম্প্রতি মাউশি পরিচালিত এই জরিপে বলা হয়, দেশের ৫২.০৫ শতাংশ শিক্ষক এখনও সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন না। এসব শিক্ষকদের একটি বড় অংশ প্রশ্নপত্র তৈরিতে শিক্ষক সমিতি এবং অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করলেও শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত পাঠদানে ব্যর্থ হন।

২০০৮ সালে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দুটি বিষয়ে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় সৃজনশীল পদ্ধতির বিষয়ের সংখ্যা। সেসময়ই অভিযোগ ওঠে, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই পদ্ধতি প্রবর্তন করা হচ্ছে এবং শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দশক পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদক বলেন, ‘এই বুঝতে না পারা শিক্ষকের অধীনে যে শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছেন তাদের পরিস্থিতি তো ভয়াবহ।’ এই ‘বিষবৃক্ষের ফল’ যেন ভবিষ্যতে আর প্রভাব ফেলতে না পারে এজন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মত দেন তিনি।
পরিস্থিতি উত্তরণে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কায়কোবাদ। একই সঙ্গে ভালো প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও শিক্ষায় অবদান রাখতে শিক্ষকদের প্রণোদনা দেওয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নব্যাংক তৈরির চিন্তা করছে জানিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘এটার মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করলে একটি ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।’
শিক্ষা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া দেশে অনেক নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে এমন অভিযোগ করে কম্পিউটার প্রকৌশল বিষয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘নির্ভুল পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নেও বড় সমস্যা থেকে গেছে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও নির্ভুল পাঠ্যপুস্তক বই প্রণয়ন করা যায়নি এটা খুবই দুঃখজনক। এই ব্যর্থতার দায় থেকে আমাদের আমাদের রেহাই পেতে হবে।’
এ ছাড়া ঘন ঘন বই পরিবর্তনের পিছনে অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে দাবি করে এই শিক্ষক বলেন, ‘এটা আমাদের বন্ধ করতে হবে’। এ ছাড়া শিক্ষা চ্যানেল প্রণয়ন করে স্কুলে টিভি রুম করে শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে বলেও মনে করেন এই শিক্ষক।
তবে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করেন আরেক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মমতাজউদ্দিন পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের পাঠদান মান উত্তীর্ণ হতে পারছে না।’
শিক্ষকদের জন্য ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘এই ডিগ্রির মাধ্যমে শিক্ষকেরা পাঠদান পদ্ধতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন। ফলে এটা করা গেলে পরিস্থিতির উত্তরণ হতে পারে।’
প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার প্রবর্তিত গাইডবইয়ের ওপর নির্ভর করছেন শিক্ষকেরা এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তড়িঘড়ি করে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন এই নির্ভরতা বাড়িয়েছে’।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণ সম্ভব নয় এমন মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির মতো আধুনিক একটি শিক্ষা পদ্ধতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা দেখাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি’। এ পরিস্থিতি থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে না পারলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যত জীবনে নানামুখী সমস্যায় ভুগতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান অবশ্য দাবি করছেন, মাঠ পর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করতে জরিপ পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এখন সমস্যা চিহিন্ত হয়েছে সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 262 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ