শিক্ষকের প্রহারে অন্ধত্ব বরণ

Print

উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রকে টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড কলেজ শিক্ষকের বেত্রাঘাতে একটি চোখ অন্ধ হতে চলেছে। হতভাগ্য ওই কলেজ ছাত্রের নাম মিরাজ হোসেন শাওন (১৮)। বর্তমানে সে টঙ্গী কলেজ রোডের আউচপাড়ার অভিযান ১৪১ নম্বর বাসায় চোখের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ডাক্তাররা বলছে, শাওনের ডান চোখ আর কখনোই দৃষ্টি শক্তি ফিরে নাও পেতে পারে। নির্দয় ওই শিক্ষকের পক্ষে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতবৃন্দ এবং স্কুল কর্তৃপক্ষসহ সকল মহল সাফাই গাইছে। টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের ভেতরের রাস্তা ব্যবহার করে এপার থেকে ওপারে যাওয়ার ‘অপরাধে’ তার উপর এই নির্মম অত্যাচার চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
টঙ্গী স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত শিক্ষকের দাবী, শাওন স্কুল চলাকালে দারোয়ানদের বাধা উপেক্ষা করে স্কুলের ভিতরের রাস্তা দিয়ে জোরপূর্বক প্রবেশ করতে চায়। শিক্ষকরা বলছে ওই ছাত্র নাকি গণপিটুনির শিকার হয়ে রক্তাক্ত জখম হয়। গত বুধবার (১৫ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে ‘উত্তরা স্কুল এন্ড কলেজের’ ড্রেস পড়া অবস্থায় কলেজে যাওয়ার পথে ‘টঙ্গী স্কুল এন্ড কলেজ’ ক্যাম্পাসের ভিতরে মারধরের এ ঘটনাটি ঘটে। এর প্রতিবাদে উত্তরা স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্ররা ঘটনার পর দিন প্রতিবাদ জানাতে টঙ্গীতে আসলে টঙ্গী স্কুলের ছাত্র ও পুলিশ মিলে তাদের ধাওয়া করে বিদায় করে দেয়।

মেধাবী ছাত্র শাওন গত বছর টঙ্গী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাশ করে উত্তরা স্কুলে ভর্তি হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে সিসি টিভির ফুটেজ চেক করার দাবী জানিয়েছেন শাওনের বাবা মোতালেব।
আহত ছাত্রের মা বিলকিস সুলতানা জানান, তার ছেলে মিরাজ হোসেন শাওন ‘টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ’ থেকে গত বছর এসএসসি পাস করার পর ‘উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজে’ ভর্তি হয়। বুধবার (১৫ মার্চ) সকালে শাওন তাদের টঙ্গী কলেজ রোডের বাড়ি থেকে উত্তরায় কলেজে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে তার বন্ধুর কাছ থেকে নোটশিট নেওয়ার জন্য পাইলট স্কুল অতিক্রম করে হাসান সরকার রোডে যাচ্ছিল। সে পাইলট স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরের রাস্তায় প্রবেশ করতেই পেছন দিক থেকে স্কুলের দারোয়ানরা তাকে টেনে ধরে এবং স্কুলের রাস্তা দিয়ে যেতে নিষেধ করে। এসময় শাওন দারোয়ানদের অনুরোধ জানিয়ে বলে, ‘কলেজের সময় হয়েছে ঘুরে গেলে সময় নষ্ট হবে, দয়া করে আমাকে যেতে দিন’। এসময় পাইলট স্কুলের শিক্ষক শাহাবুদ্দিন সজীব শাওনকে কিলঘুষি ও লাথি মারে। পরে তাকে টেনে-হিঁচড়ে স্কুল ক্যাম্পাসের ভিতরে অধ্যক্ষের অফিসের সামনে নিয়ে যায়। সেখানে শিক্ষক সজীব অধ্যক্ষের সামনেই তাকে মোটা বেত দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। বেত্রাঘাতে শাওনের ডান চোখ দিয়ে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। হাউমাউ করে কান্না কাটি করতে থাকে শাওন। উপস্থিত শিক্ষকদের ভয়ে সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। এক পর্যায়ে শাওনকে গলা ধাক্কা দিয়ে স্কুল গেট দিয়ে বের করে দেয়া হয়। এসময় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় সিটি চক্ষু হাসপাতালে নেয়। সেখানে তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে তাকে দ্রুত ঢাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পর দিন এই সংবাদ ‘উত্তরা স্কুল এন্ড কলেজে’ পৌঁছালে শাওনের সহপাঠীরা বৃহস্পতিবার টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজের সামনে শিক্ষক শাহাব উদ্দিন সজীবের বিচারের দাবীতে বিক্ষোভ করে। খবর পেয়ে পুলিশ স্কুলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র ও অভিভাবকদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিকে শাওনের মা বিলকিস সুলতানা ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার অভিযুক্ত শিক্ষক সজীবের বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু পুলিশ এখন পর্যন্ত অভিযোগ এফআইআরভুক্ত করেনি।
এদিকে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত শিক্ষক শাহাবুদ্দিন সজীব বলেন, আমি শাওনকে প্রহার করিনি। মারধরের কোন ঘটনাই ঘটেনি। ইভটিজিংয়ের অভিযোগে ছাত্রীদের অভিভাবকরা তার ওপর চড়াও হলে আমি তাকে উদ্ধার করে প্রিন্সিপালের কক্ষে নিয়ে যাই।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় টঙ্গীর আউচপাড়ায় শাওনদের বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে শাওনের কথা বলার এক পর্যায়ে তার পরিবারের সবায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এসময় শাওনের বাবা মোতালেব হোসেন ঘটনার বিচার ও শাওনের সুচিকিৎসার দাবী জানান। শাওনের বোন মুনমুন তার ভাইয়ের এ অবস্থার জন্য টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ও দারোয়ানদের দায়ী করেন। তিনি আরও বলেন, আমার ভাই একজন মেধাবী ছাত্র ও অত্যন্ত নম্র প্রকৃতির ছেলে। শিক্ষক ও দারোয়ানরা নিজেদের বাঁচাতে আমার ভাইয়ের উপর ইভটিজিং এর অভিযোগ আনছে। ঘটনার সময় সে কলেজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। সে ইভটিজার হতে পারে না।
শাওনের চিকিৎসক রাজধানীর বসুন্ধরা আই হসপিটাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. সালেহ আহমেদ জানান, শাওনের ডান চোখের দুই তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তার ওই চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ। ডান চোখের রেটিনায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শেষে শাওন ডান চোখের জ্যোতি ফিরে পাবে কিনা নিশ্চিত করে বলা যাবে। সেজন্য তাকে আরো অন্তত এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের ডাক্তাররা বলছেন, বেত্রাঘাতে শাওনের চোখের লেন্স নষ্ট হয়ে গেছে। মাথা ও চোখে মারধরের কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণে চোখের রেটিনা এবং কর্নিয়ায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
এব্যাপারে টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ অধ্যক্ষ মো. আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, বুধবার (১৫ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্রীদের ছুটি হওয়ার সময় শাওন ছাত্রীদের উত্যাক্ত করার উদ্দেশ্যে স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন দারোয়ান বাধা দিলে সে দারোয়ানদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে মারতে উদ্যত হয়। পরে ছাত্ররা তাকে ধরে নিয়ে বেদম মারধর করে।
এলাকাবাসীর অভিযোহগ, উত্তরা স্কুল এন্ড কলেজের ড্রেস পড়া অবস্থায় একজন ছাত্রকে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে নির্দয়ভাবে প্রহার করে রক্তাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা ব্যথিত হলেও স্কুলের দারোয়ান ও শিক্ষকদের ভয়ে কেউই নির্যাতিতের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেননি। এদিকে শাওনের উপর নির্মম অত্যাচারের প্রতিবাদে তার কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা শাওনের সুষ্ঠু চিকিৎসা ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন।
টঙ্গী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফিরোজ তালুকদার জানান, উভয়পক্ষ থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়েছে। আহত ছাত্র শাওনের মা বিলকিস সুলতানা স্কুলের আলোচিত শিক্ষক সজীব ও দারোয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। অপরদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ আহত ছাত্র শাওনের বিরুদ্ধে ছাত্রী উত্যাক্তের অভিযোগ দিয়েছেন। উভয় অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 103 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ