শিক্ষাঙ্গনে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা

Print

দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। তুচ্ছ কারণেও শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৯ জন আত্মহত্যা করছে। এদের মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের সংখ্যাই বেশি। চার বছরে এ সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০১২ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত সারা দেশে মোট প্রায় ৫০ হাজার জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আর্থসামাজিক পরিবেশ, শিাজীবন শেষে চাকরিসংকট, পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা, ঠুনকো আবেগ, ব্যক্তিজীবনে হতাশা, দুশ্চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের অভাবে শিার্থীদের মধ্যে আত্মঘাতী প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, বেশির ভাগ েেত্র বেকারত্ব ও প্রেমঘটিত কারণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন।
সর্বশেষ গত বুধবার আত্মহত্যা করেছেন মহসীনা মেধা নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ছাত্রী। গত বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর নাখালপাড়ায় নিজের বাসার একটি কক্ষে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন। মৃত্যুর আগে মেধা আত্মহত্যার কথা লিখে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এর কিছুক্ষণ পরেই ফেসবুক আইডিটি তিনি ডিএক্টিভেট করে দেন বলে জানিয়েছেন তার কয়েক বন্ধু। পোস্টটি দেখে বন্ধুরা নানা মাধ্যমে চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেননি। পরদিন মেধার আত্মহত্যার বিষয়টি জানতে পারেন বন্ধুরা।
এদিকে গত সেপ্টেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিকদের আবাসিক ভবন থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘরে টেবিলে ওপর রাখা চিরকুট থেকে ধারণা পাওয়া যায়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৯৭ সালে শিক হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন আকতার জাহান। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই তার বিয়ে হয়। স্বামী তানভীর আহমেদ একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তাদের সংসারে এক ছেলে রয়েছে। স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব থেকেই জলি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান তার সহকর্মীরা।
উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি এমন একটি সম্মানের পেশায় থাকার পরও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন জলি। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ বা সমস্যা সমাধানের পথে না হেঁটে আত্মহননের পথই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে তার। উদ্বেগের বিষয় হলো এমন উচ্চশিক্ষিত আর সম্মানীয় পেশার মানুষের আত্মহত্যার ঘটনা ইদানিং বেড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে অধ্যায়নরতরা অল্পতেই হতাশ হয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ।
অন্যদিকে গত নভেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বাসায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনাকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসন। যদিও তার পরিবার এ ঘটনাকে হত্যাকা- অভিযোগ করে মামলা করেছে। সদালাপি, পরোপকারী ও নেতৃত্ব গুণাবলীসম্পন্ন দিয়াজের আত্মহত্যাকে মেনে নিতে পারছে না পরিবার, আত্মীয়, সহপাঠী ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৪ ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সূর্যসেন হলের ছাত্র হুমায়ুন কবির হলের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। একই বছরের ২০ অক্টোবর রোকেয়া হলের ছাত্রী উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিল্পী রানী সরকার প্রেমঘটিত কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। ২০০৬ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র আক্তার হোসেন চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। একই বছরের ২৮ জুলাই রোকেয়া হলের ছাত্রী সাজিদা আক্তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যা করেন। ২০০৭ সালের ২৫ জুন গলায় রশি দিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করেন আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী জোহরা খাতুন প্রজ্ঞা। ওই বছরেই চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেরা খাতুন পাপড়ি নামে এক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে মারা যান। আবার ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিার্থী ও ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান ইকবাল সজীব চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ২০১৪ সালে একই ভাবে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মাহবুব শাহিন। মৃত্যুর আগে তিনি ফেসবুকে ব্যক্তিজীবন নিয়ে হতাশার কথা উল্লেখ করে স্ট্যাটাস দেন। এরপর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় ঢাবিছাত্র ও উদীয়মান সংগীতশিল্পী নাঈম ইবনে পিয়াস রেজা আত্মহত্যা করেন। রাজধানীর ভাষানটেকে নিজ ঘরে প্রেমিকার ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। তারপর ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ মেধাবী শিক্ষার্থী তারেক আজিজ চাকরি না পেয়ে হতাশায় আত্মহত্যা করেন। সবশেষ নতুন বছরের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অপু সরকার নামে এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার দিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ই এগিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অহরহ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ফল বিপর্যয়সহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক ও শিক্ষার্থীরা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালে কেবল মার্চ মাসেই মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে তিন শিার্থী আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার চেষ্টা চালান দুজন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ছয় বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫-এর অধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
২০১১ সালের ৯ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৩৫তম ব্যাচের ছাত্রী মারজিয়া জান্নাত সুমির আত্মহত্যা আলোড়ন তোলে দেশজুড়ে। জাহানারা ইমাম হলের ৩২৩ নম্বর কে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন সুমি। স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া সুমির এ আত্মহত্যার পর লম্পট প্রেমিক সুমনের শাস্তির দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়। গত ছয় বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়েও বেশ কিছু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে বেকারত্বের কারণে সোহান নামে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও বেশ আলোচিত হয়। তার লাশ মেলে টেকনাফের নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপে। বন্ধুদের কাছে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে যান তিনি। সালাম-বরকত হলে তার কে পাওয়া চিরকুটে তিনি নিজের মৃত্যুর জন্য বিভাগের সেশনজটকে দায়ী করেন। এ ছাড়াও তার জন্মদিন ২৫ জুলাইকে মৃত্যুদিন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও আত্মহত্যার দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। একই চিত্র জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর থেকে মুক্ত নন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। গত পাঁচ বছরের আত্মহত্যার হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।
এক সমীায় দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ দশমিক ৮ ভাগ ছাত্র-ছাত্রী কম-বেশি মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। তারা আত্মহত্যার ঝুঁকিমুক্ত নন। আর এ ধরনের মানসিক রোগ মোকাবিলায় কাউন্সেলিংয়ের প্রতি জোর দেওয়ার আহ্বান জানান মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এএম আমজাদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিার্থীর আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা তার মানসিক অস্থিরতা এবং আবেগতাড়িত হওয়ার ফল। দেশের প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং-সেবা চালু করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতার মাত্রা কমে গেছে। এ ছাড়া আর্থিক অনটন, মাদকসেবন, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে আত্মহত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এটি রোধ করতে সামাজিক এবং পারিবারিক সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামালউদ্দিন বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থার নানাবিধ চাপ বেড়ে যাওয়া, মূল্যবোধের অবয়, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে বর্তমানে আত্মহত্যার মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আত্মবিশ্বাস হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় জায়গা। একটি শিশু সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বেড়ে ওঠার সময় যে পরিবেশ পায়, সেই পরিবেশে যদি তার আত্মমর্যাদা ঠিকভাবে বেড়ে না ওঠে; নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক সঠিক ধারণা তৈরি না হয় তবে পরবর্তী সময়ে জীবন চলার পথে তার সামনের বাধাগুলো সে আর সামাল দিতে পারে না। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুণ হওয়ার ভয় কিংবা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ভয়ের কারণে সে তখন পারিপার্শ্বিক চাপ সহ্য করতে পারে না। মনের এমন একটি পর্যায়েই আত্মহত্যা করাকে সে সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 820 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ